কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স বিজ্ঞানের একটি শাখা, যেখানে কোনো যন্ত্রে মানুষের বুদ্ধিমত্তা ও চিন্তাশক্তিকে কম্পিউটার দিয়ে অনুকৃত ও প্রতিস্থাপিত করার চেষ্টা ও গবেষণা করা হয়। যেমন রোবট, কোনো প্রাণী বা মানুষ আদলে বানানো যন্ত্র যা কম্পিউটার নিয়ন্ত্রিত একটি স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা, যা মানুষ যেভাবে কাজ করে ঠিক সেই ভাবেই কাজ করতে পারে। এই যন্ত্রগুলোর মানুষের মতো উন্নত চিন্তা বা অনুভূতির সংবেদন তৈরি ও প্রকাশ করার ক্ষমতা নেই। কম্পিউটারের মাধ্যমে নির্দিষ্ট যা প্রোগ্রাম দেয়া হচ্ছে এর বাইরে যেতে পারে না রোবট। একইভাবে মানুষের মতো সে অনুমান ও ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় কাজে লাগিয়ে সিদ্ধান্তেও আসতে পারে না। বিজ্ঞানের আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স শাখায় বর্তমানে রোবটকে আরো কীভাবে মানব মস্তিষ্কের কাছাকাছি নিয়ে যাওয়া যায় এসব নিয়েই গবেষণা চলছে।
সুই-সুতো বানানোর কারখানা থেকে হেল্পলাইনের ভয়েস, সবক্ষেত্রে ব্যবহার হচ্ছে কম্পিউটার নিয়ন্ত্রিত রোবট। রোবট শব্দটির উৎপত্তি চেক শব্দ ‘রোবোটা’ থেকে, এর অর্থ ফোরসড্ লেবার বা মানুষের দাসত্ব কিংবা একঘেয়েমি খাটুনি বা পরিশ্রম করতে পারে এমন যন্ত্র। মঙ্গল গ্রহ থেকে মার্স রোভারের নিয়মিত তথ্য পাঠানো, সমুদ্রগভীরে গিয়ে গবেষণা, কারখানায় ১০০ জনের কাজ একাই করে দেয়া অক্লান্ত কর্মী এটি।
গুগলের আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স কোম্পানি ‘ডিপমাইন্ড’ যৌথভাবে কাজ করছে ব্রিটেনের ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিসের সাথে। তারা একটি সফটওয়্যার ডেভেলপ করছে যেটি লক্ষণ দেখে ক্যান্সার নির্ণয় ও চোখের রোগ আরো নিখুঁতভাবে ধরতে সক্ষম হবে। পাশাপাশি হার্টের রোগ ও আলঝেইমারের উপসর্গ ও অবস্থা বলে দেবে অন্য একটি সফটওয়্যার। গ্লোবাল শিপিং ও ই-কমার্স লেনদেনের মতো জটিল বিষয়গুলোও সে সামলাচ্ছে বিশ্বস্ততার সঙ্গে। খুব বেশিদিন দূরে নেই, যেদিন যানবাহন চালনা, শেয়ার মার্কেটের দেখভাল, ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ, হিসাব সামলানোর মতো জটিল-সময়সাপেক্ষ কাজগুলোও পুরোপুরি চলে যাবে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স জিম্মায়।
কিন্তু প্রশ্ন উঠেছে বিশ্ববাসীর সার্বিক উন্নয়নে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সুপ্রভাব না কুপ্রভাব পড়বে। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশ্বায়ন ও উন্নয়ন বিভাগের অধ্যাপক ইয়ান গোল্ডিন বলেছেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স) কারণে ভবিষ্যতে চাকরি হারাতে পারে বিশ্বের লাখো মানুষ। এর ফলে আফ্রিকার মতো উন্নয়নশীল অঞ্চলগুলোর প্রবৃদ্ধি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
তিনি বলেন, আমি আমার ক্যারিয়ারের পুরোটাই আন্তর্জাতিক উন্নয়নের পেছনে ব্যয় করেছি। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় উন্নয়নশীল দেশগুলোর ওপর প্রযুক্তির ক্ষতিকর প্রভাব নিয়ে পরীক্ষা চালাতে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে আমি একটি গবেষণা দল প্রতিষ্ঠা করেছি। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে প্রশ্নটির সামনে আমরা পড়েছি তা হলো, আফ্রিকার মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা হুমকি হিসেবে কাজ করবে, নাকি নতুন সুযোগ সৃষ্টি করবে।
আশাবাদীরা বলছেন, উন্নয়নশীল অর্থনীতিগুলো উৎপাদনশীলতা বাড়াতে দ্রুত অগ্রসরমাণ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে ব্যবহার করতে পারে। তবে গোল্ডিন বলছেন, এ বিষয়ে আমি ক্রমে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ছি যে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রথাগত প্রবৃদ্ধিকে বাধাগ্রস্ত করবে। নি¤œ মজুরির কাজের ক্ষেত্রে মানুষের পরিবর্তে রোবটের ব্যবহারের কারণেই এমনটা ঘটবে।
বেইজিংভিত্তিক ভেঞ্চার ক্যাপিটালিস্ট কাই-ফু লি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় বিনিয়োগ করেছেন। তিনি বলেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে বর্তমান শতকের অগ্রগতিতে সবচেয়ে বৈপ্লবিক প্রযুক্তি হিসেবে দেখা হচ্ছে। মেশিন লার্নিং ও রোবোটিকসের মতো এটিও দ্রুতবেগে এগিয়ে চলেছে।
এরই মধ্যে নানা ধরনের কাজ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে করিয়ে নেয়া সম্ভব হচ্ছে। যেসব কাজ নির্দিষ্ট নিয়মভিত্তিক ও পুনরাবৃত্তিমূলক এবং যেসব কাজে খুব বেশি দক্ষতা বা অনুভূতির প্রয়োজন পড়ে না, সেগুলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে করিয়ে নেয়া যাচ্ছে। উন্নত অর্থনীতিগুলোয় সম্প্রতি গাড়ি ও এ ধরনের শিল্পে অর্ধেকের বেশি কাজ রোবটের মাধ্যমে করানো হচ্ছে। কলসেন্টারগুলোয় স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা এরই মধ্যে উচ্চ গ্রাহক সন্তুষ্টি অর্জন করেছে। ফলে অনেক দেশে চাকরির একটি প্রধান উৎস হুমকির মুখে পড়েছে।
একই সঙ্গে ব্যাংকিং, স্বাস্থ্য, ইন্স্যুরেন্স ও অ্যাকাউন্টিং খাতের ব্যাক-অফিস প্রশাসনিক কার্যক্রমেও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সমর্থিত ব্যবস্থা বড় ধরনের ভূমিকা রাখছে। এসব ক্ষেত্রেও চাকরির সুযোগ কমে এসেছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় এসব খাতের অনেক কাজ ভারত, ভিয়েতনাম, দক্ষিণ আফ্রিকা ও মরক্কোর মতো উন্নয়নশীল দেশগুলো থেকে আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে করিয়ে নেয়া হচ্ছে।
গোল্ডিনের নেতৃত্বে অক্সফোর্ডের দলটির গবেষণায় দেখা যায়, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কারণে আগামী কয়েক দশকে ইউরোপের ৪০ শতাংশ এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় অর্ধেক চাকরি হুমকির মুখে পড়বে। উন্নয়নশীল দেশগুলোয় এ হার আরো বাড়বে।
অনেকে বলছেন, রোবটের কারণে চাকরির ক্ষেত্র কমে এলেও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে সমপরিমাণ নতুন চাকরি সৃষ্টি হবে এবং এ বিষয়ে বেশি দুশ্চিন্তা করা উচিত নয়। কিন্তু এ বিষয়ে গোল্ডিন বলেন, আমার ধারণা নতুন সৃষ্ট চাকরিগুলো উন্নত বিশ্বের কিছু নির্দিষ্ট অঞ্চলেই সীমাবদ্ধ থাকবে। উন্নয়নশীল দেশগুলোয় এ ধরনের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে না।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সবচেয়ে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে দরিদ্র দেশগুলোয়। এসব দেশে অপেক্ষাকৃত কম মজুরির শ্রমশক্তি ব্যবহার করা হয়। সেখানকার বেশির ভাগ কর্মসংস্থান হুমকির মধ্যে রয়েছে। সম্পূরক প্রযুক্তির উন্নয়নের সাথে সাথে এ চ্যালেঞ্জ আরো বেড়ে চলেছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে থ্রিডি প্রিন্টিং যুক্ত হওয়ার ফলে উন্নত দেশের ভোক্তারা নিজেরাই পোশাক, জুতা, ডিভাইস ও অন্যান্য পণ্য তৈরি করতে পারবেন। এ ধরনের উৎপাদন ব্যবস্থার উত্থানের ফলে উন্নয়নশীল দেশগুলোয় আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে পণ্য উৎপাদনের যে ধারা চালু হয়েছিল, তা বন্ধ হয়ে যেতে পারে।
সংরক্ষণবাদ রাজনীতির কারণে এ ধরনের উৎপাদন প্রক্রিয়া কীভাবে ত্বরান্বিত হবে, সে বিষয়ে গুরুত্বারোপ করেন জাতিসঙ্ঘের আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) মহাসচিব গাই রাইডার। তিনি বলেন, উন্নত দেশগুলোয় উৎপাদন প্রক্রিয়া নিজ দেশে ফিরিয়ে আনার চাহিদা কখনোই প্রবল ছিল না। কিন্তু কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও রোবোটিক প্রক্রিয়ার উত্থানের সাথে সাথে উন্নয়নশীল বিশ্ব থেকে উৎপাদন প্রক্রিয়া উন্নত দেশগুলোয় স্থানান্তরিত হবে।
সূত্র : বিবিসি, গার্ডিয়ান ও অন্যান্য
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স বিজ্ঞানের একটি শাখা, যেখানে কোনো যন্ত্রে মানুষের বুদ্ধিমত্তা ও চিন্তাশক্তিকে কম্পিউটার দিয়ে অনুকৃত ও প্রতিস্থাপিত করার চেষ্টা ও গবেষণা করা...
