আমার মেয়ে জন্মগ্রহণ করেছে এক মাস হলো। তার জন্মের পর থেকে আমার মনে একটা আতঙ্ক কাজ করছে, সে স্বাভাবিকভাবে বেড়ে উঠতে পারবে কি? আমার এ আতঙ্কের অন্যতম কারণ হচ্ছেÑ খাদ্যে ভেজাল। আইন বা নৈতিকতা কোনোটাই খাদ্যে ভেজাল মেশানোকে রোধ করতে পারছে না।
সম্প্রতি ভ্রাম্যমাণ আদালত কাওরান বাজারে কার্বাইড মিশ্রিত ৪৮৬ কাঁদি কলা, ৪০০ মণ আম ধ্বংস করেছে। মেয়াদোত্তীর্ণ পণ্য বিক্রি ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশের দায়ে ‘স্বপ্ন’র একটি শাখাকে ১০ লাখ টাকা জরিমানা করেছে এই আদালত। মাছ, গোশত, তরকারি থেকে শুরু করে তৈরী খাবার, ফলমূল এমনকি শিশুখাদ্যে পর্যন্ত ভেজাল।
আমার মনে হয়, আমাদের দেশ ছাড়া পৃথিবীতে এমন কোনো দেশ পাওয়া যাবে না, যারা খাদ্যে বিষাক্ত রাসায়নিক দ্রব্য মেশায়। খাবারের জন্য যে সব দেশে জনগণ হাহাকার করে, সে সব দেশের ব্যবসায়ীরাও বোধহয় এমন আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত নেয় না। শুধু সামান্য কয়েকটি টাকার লোভে আমরা আমাদের সন্তানদের নিশ্চিত মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিচ্ছি।
দুধে পানি মেশানোর কথা বহুকাল আগে থেকেই শুনছি। এখন পানি মেশানো ছাড়াও গরুর শরীরে পিটুইটারি ইনজেকশন দিয়ে দুধের পরিমাণ বাড়ানো হয়। শাকসবজি কপার সালফেট পানিতে ডুবিয়ে রাখা হয় টাটকা বা তাজা দেখানোর জন্য। মওসুমি ফল আম, লিচু, জামে দেয়া হয় কার্বাইড ও ফরমালিন। গাছে ফল থাকতেই ছিটানো হয় হরমোন ও কীটনাশক। সিরিঞ্জ দিয়ে তরমুজের ভেতরে দেয়া হচ্ছে তরল পটাশিয়াম পারম্যাংগানেট। এর ফলে তরমুজের ভেতরটা থাকে লাল টকটকে। ক্যালসিয়াম কারবাইড দিয়ে পাকানো হচ্ছে কলা। এ ছাড়া দীর্ঘ সময় ধরে সংরক্ষণের জন্য মাছে দেয়া হয় ফরমালিন। কফি পাউডারের সাথে তেঁতুলের বিচির গুঁড়া, মসলায় ইটের গুঁড়া, হলুদে লেড ক্রোমেট বা লেড আয়োডাইড মেশানো হয়। মুড়িকে ধবধবে সাদা এবং আকারে বড় করার জন্য বিষাক্ত হাইড্রোজ ও ইউরিয়া সার মেশানো হচ্ছে। দীর্ঘক্ষণ মচমচে রাখার জন্য জিলাপি, চানাচুর তৈরিতে ব্যবহৃত হচ্ছে পোড়া মবিল। আকর্ষণীয় করার জন্য কাপড় ও চামড়ায় ব্যবহৃত রঙ হচ্ছে সস্তা মানের আইসক্রিম, বিস্কুট, সেমাই, নুডলসÑ এমনকি মিষ্টি তৈরিতে। এ দিকে, বেশির ভাগ ফলের রস তৈরি হচ্ছে ফল ছাড়াই, একে কেমিক্যালের রস বলাই যুক্তিযুক্ত। শোনা যাচ্ছে, বিদেশ থেকে মানসম্মত খাবার আনার নামে মেয়াদোত্তীর্ণ খাবার এনে নতুন স্টিকার লাগিয়ে বিক্রি করা হয়।
বাজার থেকে কোনো ফল কিনে বাসায় রেখে দিলে কয়েকদিনের মধ্যে পচে নষ্ট হওয়ার কথা থাকলেও তা হচ্ছে না। দোকানে দেখা যায় আম ও অন্যান্য ফল শুকিয়ে কুঁচকে যায়, তবুও কোনো এক জাদুর গুণে তা পচে না। এ সবই ফরমালিনের ‘কারিশমা’। জাতীয় অর্থনীতিকেও মন্থর করে দিতে পারে ব্যক্তি পর্যায়ের এ পুষ্টিহীনতা এবং উদ্ভূত কর্মদক্ষতার অভাব। তাই বিষয়টি জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে পরিণত হয়েছে।
আমাদের স্লো পয়জনিংয়ের মাধ্যমে মারা হচ্ছে। বলা উচিত গণহত্যা করা হচ্ছে! এত ঠাণ্ডা মাথায় সবার চোখের সামনে পাইকারিহারে খতম করার নজির বোধহয় বিশ্বে আর কোথাও নেই। আমাদের দেশে আমরা খাদ্য খাই না, বরং বিষ খাই। একজন খুনি কাউকে বিষ খাইয়ে মেরে ফেললে যত বড় অপরাধ হয়, এভাবে একটি জনগোষ্ঠীকে বিষ খাওয়ানো কত বড় অপরাধ হতে পারে, একবার চিন্তা করে দেখুন।
আসলে কোনটা যে ভেজাল আর কোনটা যে ভেজালমুক্ত ভালো খাবার, তার পার্থক্য করাটাই কঠিন। এখন প্রশ্ন হচ্ছেÑ এ থেকে পরিত্রাণের কি কোনো উপায় নেই? নাকি অস্বাভাবিক মৃত্যুই পরিত্রাণের উপায়? এ দায়িত্ব সরকারকেই নিতে হবে। যদিও সরকারের একা পক্ষে এটা সম্ভব নয়। যা প্রয়োজন সেটা হলোÑ সবার সচেতনতা এবং আন্তরিক উদ্যোগ। হ
লেখক : জনসংযোগ কর্মকর্তা (দায়িত্বপ্রাপ্ত)
শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা
mbashir1986@yahoo.com
আমার মেয়ে জন্মগ্রহণ করেছে এক মাস হলো। তার জন্মের পর থেকে আমার মনে একটা আতঙ্ক কাজ করছে, সে স্বাভাবিকভাবে বেড়ে উঠতে পারবে কি? আমার এ...
