বাংলাদেশের জটিল রাজনৈতিক পরিক্রমায় আওয়ামী লীগ ও বিএনপি পরস্পরবিরোধী প্রধান শক্তি হিসেবে নিজেদের স্বকীয়তা প্রমাণ করে চলেছে। বাংলাদেশে আরো রাজনৈতিক দল থাকলেও এই প্রধান দু’টি দলের ভূমিকার ওপর নির্ভর করে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গন কোন দিকে প্রবাহিত হবে। প্রধান দুই রাজনৈতিক বলয়ের বাইরে কিছু দল থাকলেও সেসব দলের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড, সভা-সেমিনারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ।
রাজনৈতিক অঙ্গনে ভালো-মন্দ থাকা অস্বাভাবিক কিছু নয়। আমরা যেন এটা মেনে নিয়েছি! কিন্তু রাষ্ট্রের গঠনকাঠামো তথা জাতিরাষ্ট্রের মৌলিক বিষয়গুলোয় সাংঘর্ষিক অবস্থা কাম্য নয়। কিন্তু স্বাধীনতার পর থেকেই জাতিরাষ্ট্রের মৌলিক বিষয়গুলোর সাংঘর্ষিক অবস্থা আমাদের বর্তমান বিশৃঙ্খল সমাজ ব্যবস্থায় পৌঁছে দিয়েছে।
আসন্ন একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনটি সুষ্ঠু হবে কি না, তা নিয়ে কোনো স্তরের মানুষই নিশ্চিত হতে পারছেন না। কোনো ধরনের ছাড় দেয়ার মানসিকতায় পরিহার করে শাসকগোষ্ঠী নির্বাচনের প্রচার-প্রচারণা শুরু করে দিয়েছে। অন্য দিকে, প্রধান বিরোধী দল বিএনপির ওপর চলছে মামলার খড়গ ও শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিতেও পুলিশের গ্রেফতার অভিযান। ৫ জানুয়ারি নির্বাচনের আগের দিন প্রধানমন্ত্রী জাতির উদ্দেশে দেয়া ভাষণে বলেছিলেন, ‘এটি সংবিধান তথা নিয়ম রক্ষার নির্বাচন। পরে আলাপ আলোচনার মাধ্যমে সবার অংশগ্রহণে আরেকটি নির্বাচন হবে।’ বর্তমান শাসকগোষ্ঠী বেমালুম সেই বক্তব্য ভুলে গিয়ে পাঁচ বছর অতিক্রম করার শেষ পর্যায়ে রয়েছে। কিন্তু একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন তথা তার ফলাফল নিয়ে বর্তমান শাসকগোষ্ঠীর নেতাদের বক্তব্য জাতি রাষ্ট্রের জন্য এক অশনি সঙ্কেত। আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক বলেছেন, ‘শেখ হাসিনা যতদিন সুস্থ আছেন ততদিন ক্ষমতায় থাকবেন। বিএনপি ২০১৮, ২০২৪ সালে তো নয়ই ২০২৯ সালেও ক্ষমতায় আসতে পারবে না। এরপরে চিন্তা করতে পারে।’ চমৎকার! হানিফ সাহেব। যারা ১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক চেতনা ধ্বংস করে, ১৫ আগস্ট জাতির মহান নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সাহেবকে সপরিবারে হত্যার পর যেসব আওয়ামী লীগ নেতা ক্ষমতা দখল করলেন, ৫ জানুয়ারি একতরফা নির্বাচন করে রাষ্ট্র্রের গণতান্ত্রিক চেতনা ভেঙে দেয়ার সুযোগ্য উত্তরসূরি হিসেবে বাংলাদেশের মানুষ আপনাদের কাছ থেকে এর চেয়ে বেশি কিছু আশা করা ঠিক হবে না!
৫ জানুয়ারি নির্বাচনে একটা জটিল বার্তা পেয়েছে বর্তমান শাসকগোষ্ঠী। ৫ শতাংশ মানুষ সেই নির্বাচনে ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছে ও ১৫৪ জন সংসদ সদস্য বিনা ভোটে নির্বাচিত হয়েছেন। তাই আপাতদৃষ্টিতে মনে হচ্ছে, অবাধ সুষ্ঠু নির্বাচন হলে বর্তমান শাসকগোষ্ঠীর বেহাল দশা হবে। তাই একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে শাসকগোষ্ঠী কোনো রকম ঝুঁকি না নিয়ে নির্বাচনের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপিকে পরোক্ষভাবে নির্বাচন থেকে দূরে রাখার কৌশল নিয়েছে। তারই ধারাবাহিকতায় সরকার সুকৌশলে আদালতকে ব্যবহার করে খালেদা জিয়াকে বন্দী করেছে।
সুষ্ঠু নির্বাচন ও খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবিতে বিএনপি শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিতে রাষ্ট্রীয় বাহিনী যেভাবে বাধা দিচ্ছে ও নেতাকর্মীদের গ্রেফতার করছে তা নিঃসন্দেহে গণতন্ত্র ও জাতীয় সংসদ নির্বাচনের জন্যে অশনি সঙ্কেত। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, পুলিশ সর্বময় ক্ষমতায় অধিকারী। সরকার পুলিশ বাহিনীকে নিয়ন্ত্রণ করার কথা। কিন্তু সম্প্রতি দেখা গেল, বিএনপির নেতৃবৃন্দ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে যায় তাদের সমাবেশের অনুমতির জন্য। মন্ত্রী সাহেব বললেন, পুলিশের সাথে কথা বলে জানানো হবে। চমৎকার! পুলিশ বাহিনী আপনার অধীনে, না আপনি পুলিশ বাহিনীর অধীনে!
৫ জানুয়ারি নির্বাচনের বর্ষপূর্তির আন্দোলনের সময় বিএনপি কঠোর কর্মসূচি পালন করে। জানমালের ক্ষয়ক্ষতি হয় ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নাজুক অবস্থায় পতিত হয়। এক শ্রেণীর মানুষ ও মিডিয়া প্রচার শুরু করল, বিএনপি সহিংস আন্দোলন পরিচালনা করছে। কিন্তু এসব আন্দোলনই যদি আওয়ামী লীগ পরিচালনা করত তাহলে সে সব মানুষ ও মিডিয়া প্রচার করত সফল আন্দোলন পরিচালিত হচ্ছে। লজ্জা হয় না সে সব মানুষ ও মিডিয়ার। আবার ৫ জানুয়ারি মতো ভোটারবিহীন নির্বাচন যদি বিএনপি করত তাহলে এক শ্রেণীর সুশীলসমাজ কোমড় বেঁধে আন্দোলনে নেমে পড়ত। তারা বলত, দেশ ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু এখন তারা কিছুই বলছেন না।
১৯৭১-১৯৭৫ সালের মধ্যে রাজনীতিকে সঙ্কুচিত করার জন্য যেসব নীতিমালা করা হয়েছিল, আওয়ামী লীগের তৎকালীন নেতৃবৃন্দ জিয়াউর রহমানের কাছে দাবি করেছিল সেগুলো বাতিল করার জন্য। আজ আওয়ামী লীগ যে গণতন্ত্রের চর্চা করছে লেখক ও গবেষক সৈয়দ আবুল মকসুদ এটাকে বলেছেন, ‘বাংলাদেশের গণতন্ত্র সাঁড়াশি আক্রমণের মুখে পড়েছে’। গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে শাসকগোষ্ঠীর জয়ের সম্ভাবনা ক্ষীণ বলে আদালতকে ব্যবহার করে নির্বাচন স্থগিত করার ঘটনা মনে হচ্ছে। সরকার, আওয়ামী লীগ, বিচার বিভাগ, নির্বাচন কমিশন, প্রশাসন ও পুলিশ বাহিনী একটি রসুনের বিভিন্ন গলা। এদের অধীনে কিভাবে সংসদ নির্বাচন সুষ্ঠু হতে পারে! নির্বাচন স্থগিতের পর বিএনপির মেয়র প্রার্থীর বাসায় পুলিশ ঘেরাওয়ের মাধ্যমে প্রমাণিত হয়েছে পুলিশ দলীয়করণের সর্বশ্রেষ্ঠ পর্যায়ে পৌঁছেছে। নিরপেক্ষ সরকারে ছাড়া আর কোনো জাতীয় নির্বাচন সম্ভব নয়। তাই বলতে হয়Ñ দুর্ভাগ্য বিএনপির, সৌভাগ্য আওয়ামী লীগের, যে এখনো তারা ক্ষমতায় আছে। হ
Mahmuduljnu71@gmail.com
বাংলাদেশের জটিল রাজনৈতিক পরিক্রমায় আওয়ামী লীগ ও বিএনপি পরস্পরবিরোধী প্রধান শক্তি হিসেবে নিজেদের স্বকীয়তা প্রমাণ করে চলেছে। বাংলাদেশে আরো রাজনৈতিক দল থাকলেও এই প্রধান দু’টি...
