১৯৬৯ শুরু। গণ-অভ্যুত্থান ভূমিষ্ঠের পথে। ৬৬ ছয় দফা মিলিয়ে ছাত্রদের ১১ দফা। কিন্তু লৌহমানব আইয়ুব খান এক পায়ে অনড়। যে করেই হোক শেখ মুজিবকে ফাঁসিতে ঝুলাবে। তাই তড়িঘড়ি করে চলছে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার কাজ। অন্য দিকে সারা দেশে ছাত্ররা রাজপথে। ‘শপথ নিলাম শপথ নিলাম মুজিব তোমায় মুক্ত করব, শপথ নিলাম শপথ নিলাম মাগো তোমায় মুক্ত করব’Ñ জ্বালাময়ী স্লোগানে উত্তাল দেশ। পথ না পেয়ে সেনাবাহিনীকে পথে নামিয়ে দিলো আইয়ুব। জারি করল সান্ধ্য আইন। এবার মুখোশ পুরোপুরি খুলে গেল। ‘শাসক নই, বন্ধু’Ñ পায়ে পিষ্ট হলো চতুর আইয়ুবের সেই স্লোগান। ২০ জানুয়ারি হত্যা করা হলো ছাত্রনেতা আসাদুজ্জামানকে। আন্দোলনের আগুনে ঘি ঢেলে দিলো শাসক। সেনাদের জারি করা সান্ধ্য আইন, ১৪৪ ধারা ভাঙার সিদ্ধান্তে ছাত্ররা। রাজপথে নেমে গেল বন্দী মুজিবকে মুক্তির নেশায়; কিন্তু পাকিস্তানি সেনাদের বেয়নটের ভয় ছাত্রদের পিতা শিক্ষকদের ঘরে বসে থাকতে দেয়নি। তাই সন্তানতুল্য ছাত্রদের নিরাপত্তা তাগিদে মাঠে নেমে পড়লেন অনেক শিক্ষকও। নামলেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে তখনকার রসায়নের শিক্ষক শামসুজ্জোহা স্যারও। উদ্দেশ্য মুুক্তি পাগল ছাত্রদের বেয়নটের আঘাত থেকে রক্ষা করা; কিন্তু ছাত্রদের রক্ষা করতে গিয়ে তাকেই জীবন দিতে হয়েছিল বেয়নটের আঘাতে। নিজেকে শিক্ষক পরিচয় দিয়ে রক্ষা মেলেনি তার পাকিস্তানি সেনাদের থেকে। বেয়নট দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে হত্যা করা হয়েছিল শহীদ শামসুজ্জোহা স্যারকে। শহীদ শামসুজ্জোহা স্যারকে বলা হয় মুক্তিযুদ্ধের প্রথম শহীদ বুদ্ধিজীবী। তার জন্য রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে করা হয়েছে ‘স্ফুলিঙ্গ’ নামে একটি মূরাল। করা হয়েছে একটি ছাত্রাবাসের নামকরণ। সম্প্রতি দেশে হয়ে গেল কোটা সংস্কারের জন্য ছাত্র আন্দোলন। ছাত্রদের এই আন্দোলন দেশে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। বিশেষ করে সারা দেশে ছাত্রদের রাজপথে অবস্থান, ছাত্রদের ওপর পুলিশি আক্রমণ, মন্ত্রীর রাজাকার তত্ত্ব, সর্বশেষ প্রধানমন্ত্রীর কোটা বাতিলের ঘোষণা। ছাত্রদের এই কোটা আন্দোলনে ছাত্র সংগঠনগুলোর ছিল বেশ জোরালো সমর্থন। সারা দেশে অনেক ছাত্রলীগ নেতা পদে থেকেই আন্দোলন করেছেন, অনেকে করেছেন পদত্যাগ করে আন্দোলন; কিন্তু শুরুতে ঢাবিতে ছাত্রলীগ কর্মীদের ছিল অনেকটা ভুল বুঝাবুঝির সিদ্ধান্ত। যদিও পরে আন্দোলনে পুরোপুরি সমর্থন দিয়েছে সরকারি দলের এই ছাত্র সংগঠনটি। এর জন্য প্রশংসাও পেয়েছে তারা। বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, বাংলাদেশের ইতিহাস ছাত্রলীগের ইতিহাস। কোটা আন্দোলন সমর্থনের মাধ্যমে এটি আবার প্রমাণিত হলো। যেমনটা প্রমাণিত হয়েছিল ঊনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থানে। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো, সন্তানতুল্য ছাত্রদের পুলিশের নির্যাতন থেকে বাঁচাতে গিয়ে চাকরিচ্যুত হয়েছেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নাছির স্যার। নাছির স্যারের দাবি ছিল সন্তানতুল্য ছাত্রদের নিরাপত্তা দিতে হবে। দিতে হবে তাদের সম্মান। দাবিটা ঊনসত্তরের শহীদ শামসুজ্জোহা স্যারেরও ছিল। পাকিস্তানিরা শামসুজ্জোহা স্যারকে হত্যা করে বর্বরতার পরিচয় দিয়েছিল। দিয়েছিল অসভ্য জাতির পরিচয়। বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে। স্বাধীনতা অর্জনের সহযোদ্ধা শিক্ষকেরাও। বাঙালি সভ্য জাতি। নাছির স্যারকে সসম্মানে তার পদে বহাল রাখা হোক। সেটা বাঙালির স্বাধীনতার রক্ষার্থে, সভ্যতার প্রকাশে।হ
লেখক : শিক্ষার্থী, ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজ, কুমিল্লা।
১৯৬৯ শুরু। গণ-অভ্যুত্থান ভূমিষ্ঠের পথে। ৬৬ ছয় দফা মিলিয়ে ছাত্রদের ১১ দফা। কিন্তু লৌহমানব আইয়ুব খান এক পায়ে অনড়। যে করেই হোক শেখ মুজিবকে ফাঁসিতে...
