জন্মের পর থেকে একটা শিশু যখন বুঝতে শেখে, জানতে শেখে এবং তার মুখে কথা যখন ধীরে ধীরে ফুটতে শুরু করে, তখনই সে বুঝে যে, তাকে প্রতিযোগিতার মাধ্যমেই টিকে থাকতে হবে। আর প্রতিযোগিতার কুরুচিপূর্ণ পরিবেশ তাকে স্বার্থপরতায় আবদ্ধ করে, পারস্পরিক বিরোধ-দ্রোহে উদ্বুদ্ধ করে এবং মনে ঘৃণা-বিদ্বেষের জন্ম দেয়।
আমাদের চার পাশে লক্ষ করলেই বুঝতে পারি, প্রতিযোগিতার কী এক নিদারুণ তীব্রতা। বেঁচে থাকার জন্য প্রতিযোগিতা, অর্থলাভের প্রতিযোগিতা, ক্ষমতা, প্রভাব ও প্রতিপত্তির জন্য প্রতিযোগিতা, সম্মান, সুনাম ও গৌরবের জন্য প্রতিযোগিতা, যেভাবে হোক এগিয়ে যাওয়ার প্রতিযোগিতা। মোটকথা, চার পাশে বেলাগাম প্রতিযোগিতার চরম অসুস্থ চর্চা চলছে। সর্বোপরি যেন সবক্ষেত্রে প্রতিযোগিতার জন্যই বেঁচে থাকতে হচ্ছে আমাদের।
আমরা কেনো নিজেদের এসব নোংরা প্রতিযোগিতায় লিপ্ত করছি? কেন অন্যকে ছাড়িয়ে যাওয়ার জন্য এত মাতামাতি আমাদের মধ্যে? বলতে গেলে, মূলত স্বার্থ, আত্মকেন্দ্রিক চিন্তাভাবনাই আমাদের মন-মানসিকতাকে বিকৃত করে দিচ্ছে। নিজেকে কেন্দ্র করে ব্যতিব্যস্ত থাকার ফলে আমরা অন্যের ব্যাপারগুলোকে আমলে নেই না। ফলে আমাদের মনে-মগজে প্রতিযোগিতার তীব্রতা আরো প্রকট হচ্ছে। আমরা নিজের অহংবোধ কথিত ব্যক্তিত্ব অন্যের মধ্যে জাহির করতে প্রতিযোগিতা করি।
প্রতিযোগিতার এই তীব্র মনোভাবে যেমন নীতি নৈতিকতা ভোঁতা হয়ে গেছে, তেমনি সমাজে অপরাধের প্রবণতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। কেউ কারো জন্য সামান্য ত্যাগও স্বীকার করতে রাজি নই। নিজের স্বার্থসিদ্ধি, উন্নতি এবং সফলতার জন্য, যেনতেন প্রকারে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য যেকোনো অন্যায় কাজে লিপ্ত হতে কেউ এখন বিন্দুমাত্র কুণ্ঠিত হয় না, কেবল নিজেকে প্রাধান্য দেয়ার দরুণ মানুষ অতি নগণ্য বিষয়গুলোতেও আজ বিবাদে জড়াচ্ছে। তুচ্ছ ও ঠুনকো ব্যাপারেও সঙ্ঘাত, হানাহানি, দ্বন্দ্ব-কলহ ও বাদানুবাদ সৃষ্টি হচ্ছে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে খুন নিতান্ত ‘সুলভ’ পর্যায়ে চলে এসেছে। তার ওপর আইন যখন এসব দমনে ব্যর্থ, তখন অন্যায় মাথাচাড়া দিয়ে উঠবেই।
এই অসুস্থ চর্চা কতটা প্রকট হচ্ছে দিন দিন, তা ধারণার বাইরে। একটা উদাহরণ দেয়া যাক। গত কিছু দিন মিডিয়ার কল্যাণে আমরা জানতে পারি, দু’টি বাসের বেপরোয়া ভাব ও উন্মুত্ত প্রতিযোগিতার কারণে তাদের মধ্যে সংঘর্ষে রাজীব নামে এক ছাত্রের হাত শরীর থেকে আলাদা হয়ে যায়। পরিশেষে মৃত্যুর কাছে হেরে গিয়ে পৃথিবী থেকে বিদায় নেয়। রাজীবের এই চলে যাওয়া আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে, কতটা নিকৃষ্ট পরিবেশে আমরা বসবাস করছি। যেখানে নিতান্ত ব্যক্তি দম্ভ প্রদর্শনার্থে নির্দোষ কাউকে জীবন দিতে হয়। এরকম অহরহ ঘটেই চলেছে চার পাশে। এসব অসুস্থ ঘটনার ব্যাখ্যা কী হতে পারে?
প্রতিযোগিতার এই হীন প্রবৃত্তি এখন সর্বজনীন হয়ে উঠেছে। একটি রাষ্ট্র কিভাবে অন্য রাষ্ট্র থেকে এগিয়ে যেতে পারে, অন্য রাষ্ট্রের কোনো দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়ে কিভাবে সাফল্যের চরম শিখরে পৌঁছতে পারে, কিভাবে অন্যদের কাছে নিজের প্রভাব ও ক্ষমতা প্রদর্শন করতে পারে তার নীতিহীন কুৎসিত প্রতিযোগিতা এখন বৈশ্বিকভাবেই চলছে।
এই মনোভাব থেকে উত্তরণের উপায় কী? প্রথমত, অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছেÑ আমাদের চেতনা, বোধ ও বুদ্ধিবৃত্তিকে জাগ্রত করতে হবে। তাহলে অন্যের জন্য সহানুভূতি, সহমর্মিতা এবং সমব্যথা তৈরি হবে। এতে আমাদের মধ্য থেকে অনৈতিক প্রতিযোগিতার অসুস্থ মনোভাব নির্বাসিত হবে।
তা ছাড়া, পাওয়ার লিপ্সা, উদগ্র আকাক্সক্ষা, লক্ষ্যে পৌঁছার চরম স্পৃহা ও প্রত্যাশা পূরণে তীব্র ক্ষুধা ইত্যাদি মানুষকে উন্মত্ত, ব্যগ্র ও অধীর করে তোলে। পাওয়ার ইচ্ছা, প্রত্যাশা ও লক্ষ্য পূরণ অবশ্যই ভালো। কিন্তু অন্তঃসারশূন্য আগ্রহ ও উদ্দীপনা বিকৃতমস্তিষ্ক তৈরি করে। আর শূন্যগর্ভ দ্বারা যেকোনো কাজই সম্ভব। তাই মন-মানসিকতার দিক থেকে সুসঙ্গত ও সভ্য হতে হবে। আমাদের চিন্তাভাবনা, বিচার-বিবেচনা ও অনুভূতিতে পারস্পরিক বোঝাপড়ার বোধশক্তি তৈরি করতে হবে।
মানুষ সামাজিক জীব, তাই প্রকৃতির এই গতিপথে আমাদের শৃঙ্খলাবদ্ধ জীবনযাপনই সর্বাধিক যৌক্তিক। সুতরাং আমরা অসুস্থ ও নোংরা কার্যকলাপের প্রতিযোগিতা বন্ধ করে সুস্থ, স্বাভাবিক ও যথার্থ জীবনযাপনে উদ্বুদ্ধ হবো সেটাই প্রত্যাশা করতে হবে। দম্ভ, অহঙ্কার, স্বার্থপরতা, ক্ষমতা, শক্তি ও প্রতিপত্তির বহিঃপ্রকাশ নয়, বরং মানুষ হিসেবে নিজের, পরিবারের, সমাজের ও রাষ্ট্রের প্রতি কর্তব্য পালনই হোক আমাদের মূলনীতি।হ
লেখক : শিক্ষার্থী, ইংরেজি বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।