কিছু পণ্যের দাম কমবে বলে বাজেট প্রস্তাবে ঘোষিত হলো। বাজারে গিয়ে দেখা গেল সম্পূর্ণ উল্টো চিত্র। যেসব পণ্যের দাম কমবে বলে বাজেটে প্রস্তাব ছিল, বাস্তবে দেখা গেল বাজেট পাসের আগেই সে সব পণ্যের দাম বেড়ে গেছে। এর সাথে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে বাড়িভাড়াও। ফলে সাধারণ মানুষের ভাগ্যের উন্নয়নে বাজেট কোনো ভূমিকা রাখতে না পারায়, তারা বাজেট ভাবনায় প্রতিবছরই শঙ্কিত, আনন্দিত নয়। বাজেট ঘোষণার পাশাপাশি বাজারে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখার উপায় খোঁজা ও তদারকি নিশ্চিত করাটা খুব জরুরি নয় কি? দুর্ভাগ্য এ জাতির; বিষয়টি যাদের দেখার দায়িত্ব, তারাই দেখছেন না। প্রতিবছর বাজেটকে কেন্দ্র করে এসব অন্যায় ও অস্বাভাবিক তৎপরতা নতুন কিছু নয়। এই যে পরিকল্পনাহীনতার অভিযোগ, এই অভিযোগ কেন বছরের পর বছর ধরে চলবে? কেন এই অভিযোগ দূর করার জন্য কোনো উদ্যোগ সরকার নিতে চায় না?
সার্বিক বিবেচনায় দরিদ্র ও নিম্ন গড় আয়ের মানুষের জন্য বাজেট যেন নতুন করে উদ্বেগ, আতঙ্ক, হতাশা এবং গলার কাঁটার সাথে ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’। বর্তমানে মাথাপিছু আয় যতটা বেড়েছে, তার চেয়ে ব্যয় বেড়েছে দুই-তিন গুণ। এতে সাধারণ মানুষকে ঋণগ্রস্ত হয়ে পারিবারিক বাজেট সামাল দিতে হচ্ছে। মধ্যবিত্ত আর গরিবেরা ক্রমবর্ধমান কষ্টে দিন যাপন করছে।
ইতঃপূর্বে শিক্ষক ও সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বৃদ্ধির সাথে বাজার দরও বেড়েছে। এতে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত জনগণ বেহাল অবস্থায় দিন কাটাতে বাধ্য হচ্ছে। আবারো বোনাস ও বেতন বৃদ্ধির সম্ভাবনাকে বলা যায়, তেলা মাথায় আরো তেল দেয়া! দেশ যখন উন্নয়নশীল দেশের পথে যাত্রা করেছে, তখন আমরা সত্যিকার গণমুখী বাজেট প্রত্যাশা করি। টেকসই উন্নয়ন করতে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়াতে হবে, কমিয়ে আনতে হবে সমাজের বৈষম্য। দেশের একটা গোষ্ঠী যদি ধারণার বেশি আয় করে, আরেকটা গোষ্ঠী প্রয়োজনের কম আয় করে, তখনই বৈষম্যের সৃষ্টি হয়। রাজধানীর গুলশান-বনানীতে যে অর্থনীতি, বাংলাদেশের জাতীয় অর্থনীতির চিত্র সেটি নয়। বাজেটসহ অর্থনীতিতে নিম্ন ও মধ্যবিত্তের সামর্থ্যরে সাথে সঙ্গতি থাকতে হবে। মনে রাখতে হবে, অর্থনীতির শক্তি কৃষক, শ্রমিকসহ গ্রামেরও নিম্নবিত্ত মানুষ, শুধু সরকারি চাকরিজীবীরাই নন।
এ জন্য বাজেট প্রণয়নে প্রধানত গরিবের কথা মাথায় রাখতে হবে। গরিবের জীবনযাপনের প্রয়োজনীয় পণ্যের যেন দাম না বাড়ানো হয়, এটা সর্বসাধারণের দাবি। খেটে খাওয়া মেহনতি মানুষের জন্য সুবিচারমূলক বাজেট নিশ্চিত করা চাই। সীমিত আয়ের মানুষের যাতে কষ্ট না হয়, সেদিকে আন্তরিক দৃষ্টি দিতে হবে। ইতোমধ্যে দেশ অনেক এগিয়েছে ঠিক, কিন্তু তা অনেকটা ব্যক্তির উন্নয়ন। এর লাগাম টানতে পারলে দেশ আরো এগিয়ে যাবে সমষ্টির উন্নয়নের ভিত্তিতে। এমন বাজেট আমরা চাই না, যা সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের জন্য অশান্তি ও দুর্ভোগ বয়ে আনবে।
বাংলাদেশের বেশির ভাগ মানুষ নিম্নবিত্ত আর মধ্যবিত্ত। তাই বাজেটে নিত্যপণ্যের মূল্য গরিব তথা সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে রাখা জরুরি। মোটা কাপড়, মোটা চাল, ডাল, আটা, লবণ, চিনি, পেঁয়াজ, ভোজ্যতেল প্রভৃতির দাম নাগালের মধ্যে থাকলেই সর্বসাধারণ সন্তুষ্ট। গরিব মানুষ যাতে কম ভিজিটে ডাক্তার দেখাতে পারে, জীবনরক্ষাকারী ওষুধ যাতে কম মূল্যে কিনতে পারে, সে জন্য ওষুধপত্রের ওপর যেন ভ্যাট না রাখা হয়। অথচ করের ভার বেশির ভাগই নিম্নবিত্ত মানুষের ওপর পড়ে থাকে। কেননা তারা আয়ের একটি বড় অংশ অতিপ্রয়োজনীয় পণ্যের জন্য ব্যবহার করে। পণ্যের ওপর আরোপিত করের হার, গরিবের আয়ের আনুপাতিক হারের তুলনায় অনেক বেশি। সাধারণ মানুষের জন্য সরকারি স্বাস্থ্যসেবা আরো অনেক সহজ করতে হবে। জনগণ খেয়েপরে স্বাচ্ছন্দ্যে থাকতে চায়, তাই বাজেট হওয়া চাই দরিদ্রবান্ধব।
কৃষক শ্রম ও টাকা খরচ করে ফসল উৎপাদন করে। তারা যেন তাদের পরিশ্রম ও কষ্টের ন্যায্যমূল্য পায়, এ বিষয়ে বাজেটে ব্যবস্থা থাকা জরুরি। এবারের বাজেটে কৃষি খাতে যথাযথ নজর দিতে হবে। আর কৃষকদের দিতে হবে সহজ শর্তে ঋণ।
মানবসম্পদই আমাদের মূল সম্পদ, এ উন্নয়নে সবিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। বাংলাদেশের বিশাল জনসংখ্যাকে বরাবরই বোঝা হিসেবে দেখা হয়ে থাকে। কিন্তু কর্মমুখী শিক্ষা ও প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ পেলে এ বিশাল জনসংখ্যাকে আমরা জনসম্পদে পরিণত করতে পারি। এত সুলভ জনশক্তিকে কাজে লাগাতে পারলে অর্থনীতিতে ব্যাপক প্রভাব পড়ত।
প্রজাতন্ত্রের সাধারণ মানুষ যেন মোটা ভাত, মোটা কাপড় থেকে বঞ্চিত না হয়। এসব মানুষ বাঁচার জন্য প্রতিনিয়ত কঠিন সংগ্রামে ব্যস্ত। নিত্যনতুন গাড়ি আমদানির বাজেট নয়, সাধারণ মানুষের নিত্যপণ্যের মূল্য কমানোর বাজেট চাই। সাধারণ মানুষ রাষ্ট্রের কাছে তার মৌলিক অধিকারগুলো চায়। এটা তার সাংবিধানিক পাওনা।হ
abunoman1972@gmail.com