মাত্র এক দশক আগেও ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময় হতো ঈদ কার্ডের মাধ্যমে। রঙচঙে আকর্ষণীয় ডিজাইনের ঈদকার্ডে বাছাই করা পদ্যের ছন্দে পাওয়া যেত আন্তরিকতার ছোঁয়া। ঈদ আনন্দের সাথে জড়িয়ে ছিল কার্ড আদান-প্রদানের সংস্কৃতি। শহর ও গ্রামÑ সবখানেই ছিল এর রমরমা ব্যবসা। ‘অতি উল্লাসে আগমন প্রতি নীড়ে হবে ঈদ আয়োজন,’ ভেদাভেদ নাই বন্ধু এদিন, অন্তরে এসো বন্ধু তুমি আমাদেরই এ কুটিরে’, ‘ঈদের দিন আমাদের বাসায় আসবে কিন্তু ভাই’, ‘ভালো আছি ভালো থেকো, ঈদ মোবারক ইতি তোমার...’। একসময় এভাবে এমন হাজারো কথায় উৎসবপ্রিয় মানুষের উষ্ণ অভিনন্দন ছড়িয়ে পড়ত কার্ডে কার্ডে। কেনাকাটার নানা অনুষঙ্গে ঈদকার্ড ছিল জরুরি। কিন্তু দিন অনেক পাল্টে গেছে। এখন ঈদের কেনাকাটায় চাঁদরাতে মেসেজ পাঠানোর জন্য কেনা হচ্ছে মুঠোফোনের কার্ড। বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভার্চুয়াল নিমন্ত্রণপত্র পাঠানো হচ্ছে ঘরে বসেই।
এভাবেই আধুনিক যুগে আমরা ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময় করা শুরু করেছি। একসময় ঈদকার্ডের খুব প্রচলন ছিল। ছোট-বড় সবাই এর মাধ্যমে শুভেচ্ছা পৌঁছে দিত স্বজনদের কাছে। কে কতগুলো ঈদকার্ড পেলাম, কার কার্ডটি বেশি সুন্দরÑ এসব নিয়েও চলত গুঞ্জন। খুব বেশি দিন আগের কথা নয়; ৫-১০ বছর আগেও মহল্লার কিশোর ছেলেপুলেদেরও দেখতাম, ঈদ এলে এলাকার রাস্তায় সুবিধামতো জায়গায় সুতা-দড়ি টানিয়ে একটি টেবিল পেতে নানাবর্ণের ঈদকার্ড বিক্রি করছে। নানা প্রজাতির ফুল, পাখি, প্রজাপতি, প্রাকৃতিক দৃশ্য, মসজিদ, মক্কা শরিফের ছবিসংবলিত কার্ডগুলোর গায়ে বড় করে লেখা থাকত ‘ঈদ মোবারক’। কোনো কোনো কার্ডের আকর্ষণ বাড়ানোর জন্য কার্ডজুড়ে দেয়া হতো সোনালি আর রুপালি জরি। স্কুল-কলেজপড়ুয়ারা হুমড়ি খেয়ে পড়ত দোকানগুলোতে। বন্ধুদের জন্য কিনে নিত পছন্দের ঈদকার্ড। যতœ করে সেই ঈদকার্ডের ভেতরেও লেখা হতো বন্ধুর জন্য ভালোবাসার কথা। আবার প্রিয়জনের কাছ থেকে এরকম ঈদকার্ড না পেলে জমে উঠত অভিমান। ওদের এই উৎসাহে ব্যাপক ভাটা পড়েছে। চমৎকার ডিজাইন, নান্দনিক কারুকার্যÑ সব মিলিয়ে বাঙালিয়ানা ভাবটা ফুটে উঠত বলে ঈদকার্ডের প্রতি ক্রেতাদের আকর্ষণ কাজ করত। এখন যে কার্প নেই, ঠিক তা নয়। তবে ঈদকার্ডের জোয়ার নেই। যন্ত্র সভ্যতা সব কেড়ে নিয়েছে। হাতের মুঠোর থাকা মোবাইলফোনের মাধ্যমে খুদেবার্তা দিয়ে ঈদ উদযাপনে রঙিন জানালা খুলে দেয়া হচ্ছে। এ জানালা দিয়ে কত ভালোবাসা, কত স্মৃতি এসে ঢুকে পড়ে এই অন্তরটাতেÑ এই তো ঈদের আনন্দ।
সামাজিক যোগাযোগের বিভিন্ন মাধ্যমের প্রভাবে আজ বিলুপ্তপ্রায় ঈদকার্ডে শুভেচ্ছা বিনিময়ের ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতি। ঈদকার্ডের ব্যবহার গত কয়েক বছরে এতটাই কমে গেছে যে, কয়েক বছরের মধ্যেই ঈদকার্ডের চির অবসান ঘটার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। আগামী প্রজন্ম হয়তো ঈদকার্ড চোখেই দেখবে না কখনো এবং হয়তো ঐতিহ্যবাহী ঈদকার্ডের কথা জানবে বই পড়ে। ঈদকার্ড বিক্রির আর আদান-প্রদানের সেই সোনালি দিনগুলো এখন ধূসর অতীত। তবুও আমাদের শ্রদ্ধেয় দুই নেত্রী শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়ার মধ্যে ঈদকার্ডে শুভেচ্ছা বিনিময়ের প্রচলন রয়ে গেছে। এর মধ্য দিয়ে প্রকাশ পায় সামাজিকতা এবং আমাদের সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য।
মহামিলনের বার্তা ছড়িয়ে আসে এই ঈদ। শুভেচ্ছা বিনিময়ের ধরন ঈদকার্ডেই হোক আর মোবাইলফোন কিংবা অন্য কোনো মাধ্যমে হোকÑ ঈদ এক বর্ণাঢ্য উৎসব। এই উৎসবে যারা প্রিয়জনদের কাছে ফিরে যাচ্ছেন, গ্রামের বাড়িতে কিংবা শৈশবে কাটানো জেলা শহরে যাবেন, তাদের প্রতি অনুরোধ-আপনার সন্ত—ানদের ঈদের আনন্দে চিনিয়ে দিন আপনার সেই স্কুল, কলেজ, খেলার মাঠ কিংবা সাঁতার শেখার সেই পুকুর। ওদের খুলে বলুন আপনার বেড়ে ওঠার সেই স্মৃতিময় দিনগুলোর কথা। তাহলে নতুন প্রজন্ম ঐতিহ্যের সঙ্গে পরিচিত হতে পারবে। একই সঙ্গে, একটা ঈদকার্ড উপহার দিন প্রিয়জনদের। ঈদ হোক নব নব আয়োজনে আরো রঙিন। ঈদ মোবারক।হ