মৃত্যু জীবনের এক অমোঘ নিয়তি। অদৃশ্য এ বাঁধন থেকে কেউ মুক্তি পায়নি। তবে মানুষের মৃত্যু আসে নানা রূপে বিচিত্র পথে। গুম, খুন, অপহরণ এবং কথিত বন্ধুকযুদ্ধ ও সড়ক দুর্ঘটনাসহ নানা কারণে অপমৃত্যু যেন স্বাভাবিক বিষয়ে পরিণত হয়েছে। প্রতিটি মৃত্যু কাউকে না কাউকে ব্যথিত করে। তবে কিছু মানুষের অকাল মৃত্যুর খবরে হৃদয় ক্ষতবিক্ষত হয়। নিকট অতীতে চাঁদপুরের হাজীগঞ্জ উপজেলার রান্ধুনিমুড়া গ্রামের চার শিশু পানিতে ডুবে মারা গেছে। স্বাভাবিক মৃত্যু যেখানে মেনে নেয়া ভার, সেখানে পানিতে ডুবে কিংবা সেলফি তুলতে গিয়ে নিহত হওয়া কত যে কষ্টের তা ভুক্তভোগী পরিবার ছাড়া অন্য কেউ অনুধাবন করতে পারবে না। সড়ক ও নৌদুর্ঘটনার কথা লিখলে ইতি টানা যাবে না। যে সময় নিবন্ধনটি লিখছি, সে সময়ও উন্নয়নের মহাসড়কের এই দেশে একদিনে ৪০ জন মানুষ সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন। আর লেখাটি যখন প্রকাশিত হবে, তখনো হয়তো সড়কে মৃত্যুর বিভীষিকা আমাদের তাড়িয়ে বেড়াবে। ঈদের আগে ও পরে কয়েকটি মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটেছে। আমরা যখন ঈদ উৎসব পালন করার জন্য প্রস্তুত, ঠিক সেই সময় ১২ জুন মঙ্গলবার রাঙ্গামাটির দুর্গম নানিয়ারচর উপজেলায় পাহাড়ধসে ১১ জন নিহত হয়েছেন। ঈদের দিন নৌকায় চড়ে বেড়াতে গিয়ে গাজীপুরে পানিতে ডুবে ভাইবোনসহ চার শিশু মারা গেছে। নরসিংদীতে শিশুসন্তান ও স্ত্রীকে নিয়ে একটি রেলসেতুর ওপরে সেলফি তুলতে গিয়ে ট্রেনের ধাক্কায় হাফিজ মিয়া নামে এক ব্যক্তির পরিবার যে মর্মান্তিক পরিণতির শিকার হয়েছে, তা কোনোভাবেই অনিবার্য ছিল না। তবে এ ধরনের অপমৃত্যু একটু সতর্ক হলেই এড়ানো যেত। ১৯ জুন সোমবার সন্ধ্যায় নরসিংদীর রায়পুরা উপজেলার আমিরগঞ্জ রেলব্রিজে মর্মান্তিক এ ঘটনা ঘটে। সৌভাগ্যক্রমে তার স্ত্রী বেঁচে গেলেও স্বামী-সন্তানদের হারিয়ে তিনি যে জীবনের মুখোমুখি হলেন তার ভবিষ্যৎ কী? একটু অসচেতনতা মানুষের জীবনে কী করুণ পরিণতি ডেকে আনতে পারে এই দুর্ঘটনা তার একটি দৃষ্টান্ত।
ডিজিটাল এই জামানায় কোথাও গিয়ে ফেসবুকে চেক-ইনের সাথে একটা সেলফি তুলে আপলোড না করলে অনেকের পেটের ভাত হজম হয় না। অথচ এই সেলফি এখন মৃত্যুফাঁদে পরিণত হয়েছে। সেলফি তোলা অন্যায় নয়! তবে একটু সাবধানতার পরিচয় দিতে পারলে অপমৃত্যুর হাত থেকে নিজের জীবনকে রক্ষা করা যাবে। ফেসবুকে বেশি লাইক বা কমেন্টস পাওয়ার আশায় জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সেলফি তোলা থেকে সবারই বিরত থাকা উচিত। কেননা, অতিরিক্ত অ্যাডভেঞ্চার দেখাতে গিয়ে প্রাণহানির ঘটনা ঘটছে। সেলফি তোলার হিড়িক শুধু বাংলাদেশে তা কিন্তু নয়! বিশ্বব্যাপী সেলফি তোলার প্রবণতা বেড়েছে। আকর্ষণীয় ছবি তুলে সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট করে লাইক আর কমেন্টস বাড়ানোর তাগিদে মানুষ সেলফি তুলে। আর এই সেলফি তুলতে গিয়ে কখনো ট্রেনের ছাদে কিংবা বিপজ্জনক স্থানে মর্মান্তিক দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছেন।
এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ভারতে সবচেয়ে বেশি মানুষ সেলফি তুলতে গিয়ে প্রাণ হারিয়েছেন। তবে ভারতের পরই দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে পাকিস্তান। এখন পর্যন্ত ৭৬টি সেলফি মৃত্যু নিয়ে শীর্ষে রয়েছে ভারত। দ্বিতীয় স্থানে থাকা পাকিস্তানে সেলফি তুলতে গিয়ে ৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে সেলফি তুলতে গিয়ে মৃত্যু হয়েছে আটজনের। আর বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল দেশ চীনে সেলফি তুলতে গিয়ে চারজনের মৃত্যু হয়েছে। মার্কিন কার্নেগি মেলন ইউনিভার্সিটি ও দিল্লির ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির ‘সেলফি ডেথ’ শীর্ষক এক যৌথ গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সেলফি তুলতে গিয়ে গত দু’বছরে সারা বিশ্বে যত মানুষ মারা গেছে তার চেয়ে বেশি মানুষ মারা গেছে ভারতে। ২০১৪ সালের মার্চে প্রথম সেলফি মৃত্যুর ঘটনা ঘটে। ওই বছর ১৫ জন, ২০১৫ সালে ৩৯ জন এবং ২০১৬ সালের প্রথম আট মাসে ৭৩ জন সেলফি তুলতে গিয়ে মারা গেছেন। গত ১৪ মে ২০১৮ ভারতের বেঙ্গালুরুর বানেরঘাটা বায়োলজিক্যাল পার্কে হাতির সাথে সেলফি তুলতে গিয়ে মৃত্যু হয়েছে এক যুবকের। গত ৪ জুন ২০১৭ থাইল্যান্ডে জাতীয় উদ্যানে এক ফরাসি নারী পর্যটক কুমিরের সাথে সেলফি তুলতে গিয়ে মৃত্যু হয়েছে। গত ৮ এপ্রিল নর্দার্ন ক্যালিফোর্নিয়া ব্রিজ থেকে সেলফি তুলতে গিয়ে তরুণ-তরুণীর মৃত্যু হয়। গত ১৪ ডিসেম্বর ২০১৭ চীনের চ্যাংশা শহরে সেলফি তুলতে গিয়ে ৬২ তলা ভবন থেকে পড়ে নির্মমভাবে মৃত্যু হয়েছে উয়ু ইয়ংনিং নামে এক ব্যক্তির। গত ১ জুলাই ২০১৭ নাইজেরিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের টেকনোলজির চার ছাত্র বিশ্ববিদ্যালয়ের নিকটবর্তী নদীতে সেলফি তুলতে গিয়ে দুইজন নিহত হয়েছে। ভারতে সেলফির জন্য কিছু এলাকাকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। ১১ আগস্ট ২০১৬ সালে ২২ বছরের এক ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ছাত্র এবং ২৭ বছরের এক তরুণী আইনজীবী সেলফি তুলতে গিয়ে পাহাড় থেকে পড়ে মারা গেছেন। তবে ভারত সরকার এই সেলফি তোলার বিপদ নিয়ে নড়েচড়ে বসেছে। সারা দেশের পর্যটনকেন্দ্রগুলেতে সেলফি ডেঞ্জার জোন বা সেলফির জন্য বিপজ্জনক এলাকা খুঁজে বের করতে রাজ্য সরকারগুলোকে নির্দেশ দিয়েছে কেন্দ্রীয় পর্যটন মন্ত্রণালয়। মনোবিজ্ঞানীদের মতে, সেলফি তুলে সামাজিক মাধ্যমে পোস্ট করাটা একটা মনোরোগ। যদিও তা নিয়ে যথেষ্ট গবেষণা এখনো হয়নি। তবে অনেকের মতে, এটা একটা নেশার মতোÑ বন্ধু বা পরিচিতদের কাছে বিখ্যাত হয়ে ওঠার শর্টকাট পদ্ধতি।
দুর্ঘটনা আকস্মিক হলেও তা প্রতিদিন ঘটে না এমন কথা এখন আর শোনা যায় না। প্রায় প্রতিদিনই দেশের কোথাও না কোথাও দুর্ঘটনায় মানুষের অকাল মৃত্যু হচ্ছে। মনে হচ্ছে, এই দেশের সন্তানতুল্য নাগরিকদের জীবন দুর্ঘটনার মধ্য দিয়ে নিঃশেষ হয়ে যাবে। এই দুর্ঘটনার দায় সরকার এড়াতে পারে না। তবু ক্ষমতাসীন দলের নৌ-পরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খান বলেছেন, উপমহাদেশের তুলনায় বাংলাদেশে নাকি দুর্ঘটনার হার সবচেয়ে কম। অথচ এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনায় গড়ে দৈনিক আটজনেরও বেশি মানুষ প্রাণ হারাচ্ছেন। বাংলাদেশ দুর্ঘটনার দেশে পরিণত হোক এটা কেউ হয়তো চাইবে না। কিন্তু ৫৬ হাজার বর্গমাইলের এই দেশে অনেক অপমৃত্যুর ঘটনা ঘটে সাধারণত কাণ্ডজ্ঞানের অভাব থেকে, অপরিণামদর্শী দুঃসাহস ও নির্বুদ্ধিতাপ্রসূত খামখেয়ালি থেকে। প্রায়ই দেখা যায়, বাস-ট্রাকের চালকেরা চলন্ত অবস্থায় মোবাইল ফোনে কথা বলেন। ফলে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বেড়ে যায়। এ ক্ষেত্রে মোটরসাইকেল সবচেয়ে বিপজ্জনক। এসব অপমৃত্য জীবনের দুঃখ বয়ে আনে। যানবাহন চালানোর সময় মোবাইল ফোন ব্যবহার করা ট্রাফিক আইনে নিষিদ্ধ হলেও এক শ্রেণীর অবিবেচক মানুষ আইন ভঙ্গ করছে। অথচ আইন ভঙ্গের কারণে খোদ নিজের জীবনই নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে। শুধু তা-ই নয়, অন্য অনেকের জীবনও এভাবে ধ্বংস হতে পারে। আইন করে এসব অপমৃত্যু ঠেকানো সম্ভব নয়। তবে নিজেদের সাধারণ কাণ্ডজ্ঞান ও সচেতনতার সতর্কতা বাড়ানো প্রয়োজন। হ
