গ্রামীণ অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণ কর্মসূচির আওতায় টিআর এবং কাজের বিনিময়ে টাকা (কাবিটার) কর্মসূচির আওতায় নামে-বেনামে ভুয়া প্রকল্প দেখিয়ে লাখ লাখ টাকা তছরুপের অভিযোগ উঠেছে বিভিন্নস্থানে। অবকাঠামো রাস্তাঘাট, শিক্ষা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে মাটি ভরাট ও সংস্কার, ক্লাব-সংগঠন, হাটবাজার উন্নয়নের নামে প্রকল্প দেখিয়ে ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের বরাদ্দকৃত লাখ লাখ টাকা লোপাট হলেও দেখার যেন কেউ নেই।
জামালপুর জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, ২০১৭-১৮ অর্থবছরের ইসলামপুর আসনের এমপি ফরিদুল হক খান দুলালের নামে টিআর কর্মসূচির আওতায় প্রথমপর্যায়ে ৭২টি প্রকল্পের বিপরীতে ৪৮ লাখ ৬৯ হাজার ২০৩ টাকা এবং কাবিটার প্রথমপর্যায়ে ১৮টি প্রকল্পের বিপরীতে ৫৭ লাখ ৬২ হাজার ৯৯৮ টাকা বরাদ্দ আসে। প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নের জন্য গত ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহে সংশ্লিষ্ট উপজেলার পিআইও, ইউএনও, জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা এবং জেলা প্রশাসক যৌথ স্বাক্ষরে অনুমোদন করেছেন। এ ছাড়া একই অর্থবছরের টিআরের কর্মসূচির আওতায় দ্বিতীয় পর্যায়ে ১০৫টি প্রকল্পের বিপরীতে ৪৮ লাখ ৬৯ হাজার ২০৩ টাকা এবং কাবিটার দ্বিতীয়পর্যায়ে ১২টি প্রকল্পের বিপরীতে ১৪৭.৩৮৬ টন চাল বরাদ্দ আসে ওই এমপি নামে। তার প্রস্তাবিত প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নের জন্য গত এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে উপজেলার পিআইও, ইউএনও, জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা এবং জেলা প্রশাসকের যৌথ স্বাক্ষরে অনুমোদন দেয়া হয়।
অনেক প্রকল্পের বরাদ্দের খবর সংশ্লিষ্ট এলাকাবাসী জানে না। যেসব স্থানে কাজ হয়েছে, তা নামমাত্র। নীতিমালা অনুযায়ী প্রতিটি প্রকল্পের শুরু ও শেষ প্রান্তে কাজের ধরন, বরাদ্দ ও প্রকল্প কমিটির নাম সংবলিত সাইনবোর্ড থাকার কথা থাকলেও কোথাও এটা নেই। তাই কোন প্রকল্পের কত বরাদ্দ, কে কমিটির সভাপতি, জানে না এলাকাবাসী, এমনকি স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরাও।
কাবিটা কর্মসূচির আওতায় প্রথমপর্যায়ে ১ নং প্রকল্পের নাম দেয়া হয় কুলকান্দি হার্ড পয়েন্ট থেকে পাথর্শী সীমানা পর্যন্ত বাঁধ কাম রাস্তা নির্মাণ। ৬ লাখ টাকা বরাদ্দের এ প্রকল্পের সভাপতি কুলকান্দি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান। অভিযোগ রয়েছে, এর বাস্তবায়নও যথাযথভাবে হয়নি। ৩ নং প্রকল্প দেয়া হয় বেলগাছা মধ্যপাড়া থেকে সাধুর বাড়ি হয়ে পূর্বে জাহল বন্দের রাস্তার শেষ পর্যন্ত রাস্তা মেরামত। ৩ লাখ টাকার এ প্রকল্পটির কাজ করা হয়েছে মাত্র তিন ভাগের এক ভাগ। একই পরিমাণ অর্থ বরাদ্দ দেয়া হয় দক্ষিণ চিনাডুলী মরহুম বাহার আকন্দ সাহেবের পশ্চিম পাশের পাকা রাস্তা থেকে খালেক মিয়ার দোকান হয়ে দেওয়ানপাড়া বালিকা দাখিল মাদরাসা পর্যন্ত রাস্তা মেরামতের ৬ নং প্রকল্পে। এ প্রকল্পের সভাপতি দেয়া হয় চিনাডুলী ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি। তার দাবি বিধিমতো কাজ করা হয়েছে। এ ছাড়া সমপরিমাণ অর্থ বরাদ্দ দেয়া হয় ১১ নং প্রকল্প পচাবহলা ডিসিসিআর রাস্তা খালেকের বাড়ি থেকে কেরামতের বাড়ি হয়ে বারেকের বাড়ি পর্যন্ত রাস্তা উন্নয়ন এবং ১২ নং প্রকল্প পাঁচবাড়িয়া মরহুম আসাদুজ্জামানের বাড়ি থেকে পাঁচবাড়িয়া কাচিহারা ঈদগাহ মাঠ পর্যন্ত রাস্তা ও কাচিহারা ঈদগাহ মাঠে মাটি ভরাট। প্রকল্প দু’টির কাজ করা হয়েছে বরাদ্দের অর্ধেকেরও কম।
টিআরের প্রথমপর্যায়ে ২ লাখ টাকা বরাদ্দ দিয়ে কাচিহারা কমিউনিটি ক্লিনিকের সম্মুখে মাটি ভরাট করতে প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। ৮ নং এ প্রকল্পটির নামমাত্র কাজ করা হয়েছে। ৯ নং প্রকল্প দেয়া হয় পচাবহলা জামেদ আলী দাখিল মাদরাসা থেকে লেবু মিয়ার বাড়ি পর্যন্ত রাস্তা মেরামত। ৪০ হাজার টাকার এ প্রকল্পেরও কাজ করা হয়েছে নামমাত্র। এ ছাড়া অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায়নি ৪০ হাজার টাকার হারে বরাদ্দের গাইবান্ধা ইউনিয়নের নাপিতেরচর শাহপাড়া মোহাম্মদ আলীর বাড়ির সামনে গর্ত ভরাট ও রাস্তা সংস্কার নামে ৩৩ নং প্রকল্প এবং মরাকান্দি পোড়াবাড়ী গ্রামে ফরহাদের বাড়ি থেকে ছালামের বাড়ি পর্যন্ত রাস্তা মেরামতের নামে ৩৭ নং প্রকল্পসহ অনেক প্রকল্পের।
কাবিটা কর্মসূচির আওতায় দ্বিতীয়পর্যায়ে ১ নং প্রকল্পের নাম দেয়া হয় কুলকান্দি হার্ড পয়েন্ট থেকে পাথর্শী সীমানা পর্যন্ত বাকি অংশ বাঁধ নির্মাণ। ১৬ টন চালের প্রকল্পটির কাজ করা হয়েছে মাত্র অর্ধেক। ২ নং প্রকল্প দেয়া হয় বেলগাছা ইউনিয়নের বরুল হাসমতের বাড়ির পেছনের রাস্তা থেকে ইদ্রিস মাস্টারের বাড়ি পর্যন্ত রাস্তা মেরামত। ১০ টন চালের বিপরীতে এ প্রকল্পটির সভাপতি স্থানীয় আওয়ামী লীগের এক নেতা। প্রকল্পটির সমদয় বরাদ্দ উত্তোলন করলেও কাজ করা হয়েছে মাত্র আংশিক। ১০ টন চালের বিপরীতে ৩ নং প্রকল্পে ইসলামপুর গুঠাইল পাকা রাস্তা থেকে ফৈলামারী মিন্টু মিয়ার বাড়ি হয়ে ফৈলামারী ঈদগাহ মাঠ পর্যন্ত রাস্তা উন্নয়নে করা হয়েছে অনিয়ম। এ প্রকল্পের সভাপতি একজন স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা। ১০ টন চালের বিপরীতে ৪ নং প্রকল্প দেয়া হয় সাপধরী মো: জহুরুল ইসলামের বাড়ি থেকে চেঙ্গানিয়া ও আকন্দপাড়া সংযোগ রাস্তা পর্যন্ত উন্নয়ন। এর সভাপতি সাপধরী ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি। একই পরিমাণ চালের বরাদ্দে ৫ নং প্রকল্প দেয়া হয় কাজলা মোল্লা বাড়ি থেকে হরিণধরা বাঁধ পর্যন্ত রাস্তা মেরামত। এরও সভাপতি স্থানীয় আওয়ামী নেতা। এ দু’টি প্রকল্পেও আশানুরূপ কাজ করা হয়নি। কাজ সমাপ্ত করা হয়নি ১২ টন চালের বিপরীতে ৬ নং প্রকল্প পচাবহলা পাকা রাস্তার হালিমের দোকান থেকে বক্করের বাড়ি হয়ে খোরশেদের বাড়ি পর্যন্ত রাস্তা মেরামতের। ১০.৩৮৬ টন চালের বিপরীতে ৭ নং প্রকল্প কাচিহারা নিম্নমাধ্যমিক বিদ্যালয় সংস্কার ও উন্নয়ন, ১০ টন চালের বিপরীতে ৮ নং প্রকল্প গঙ্গাপাড়া চৌধুরী বাড়ির কমিউনিটি ক্লিনিকের মাঠে মাটি ভরাট, ১০ টন চালের বিপরীতে ১১ নং প্রকল্প ইসলামপুর নেকজাহান মডেল হাইস্কুলের মাঠ উন্নয়ন ও ২৫ টন চালের বিপরীতে ১২ নং প্রকল্প ইসলামপুর উত্তর দরিয়াবাদ গোরস্থান উন্নয়নের নামে নামমাত্র কাজ করার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। হ
লেখক : দৈনিক সংবাদের সাবেক সহসম্পাদক