পৃথিবীর নিকৃষ্ট শহরের তালিকায় ঢাকা আবারো দ্বিতীয় অবস্থানে। এ নিয়ে দ্বিতীয়বারের মতো বসবাসের অযোগ্যতার পরিমাপে রানার্স-আপের মর্যাদা অর্জন করল বাংলাদেশের রাজধানী। বিশ্বের ১৪০ রাষ্ট্রের এই পরিসংখ্যানে ঢাকা শহর ১৩৯তম অবস্থানে। যুক্তরাজ্যের ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের প্রকাশিত একটি তালিকায় বেরিয়ে এসেছে এমন অশুভ তথ্য। তালিকার সর্বশেষ অবস্থানে বসবাসের সবচেয়ে অযোগ্য শহরের তকমা জুটেছে যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের রাজধানী দামেস্কের। অর্থাৎ বসবাসের অযোগ্যতায় ঢাকা শহরের পরে একমাত্র শহর দামেস্ক। সিরিয়া একটি যুদ্ধ বিধ্বস্ত দেশ; সেখানে গৃহয্দ্ধু লেগেই রয়েছে, সে হিসেবে দামেস্কের এমন অবস্থান হতেই পারে। কিন্তু বাংলাদেশের রাজধানীর সে ধরনের সমস্যা না থাকলেও দ্বিতীয় শীর্ষ অযোগ্য নগরীতে পরিণত হওয়ার বিষয়টি লজ্জা, উদ্বেগ ও হতাশার কারণ এবং দুর্ভাগ্যজনক। অবকাঠামোগত অবস্থা, রাজনীতি ও সামাজিক স্থিতিশীলতা, সংস্কৃতি, পরিবেশ এবং স্বাস্থ্যসেবাপ্রাপ্তির বিষয় বিবেচনা করা হয়েছে এ প্রতিবেদনে। সার্বিকভাবে ঢাকার অর্জিত পয়েন্ট ১০০ এর মধ্যে মাত্র ৩৮। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তালিকায় সবচেয়ে নিচে থাকা নগরীগুলোতে নাগরিক জীবনের অনেক সুবিধাই পাওয়া যায় না। এদিকে, সবচেয়ে ভালো নগরীর মর্যাদা অর্জন করেছে অস্ট্রিয়ার রাজধানী ভিয়েনা।
মানুষের ভারে প্রায় কুঁজো হয়ে পড়েছে এ ঢাকা নগরী। সব ধরনের সরকারি অফিস আদালত এবং বেসরকারি বড় বড় অফিসের প্রাণ কেন্দ্র ঢাকাতে। কলকারখানা গড়ে উঠেছে এ শহরের বড় অংশজুড়ে। বিশেষ করে, বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক কর্মসংস্থান সৃষ্টিকারী, গার্মেন্ট ফ্যাক্টরিগুলোর অবস্থান চোখে পড়ার মতো। ঢাকা শহরের ‘কাঁচা টাকা’ এবং নানা ধরনের পেশা গ্রামীণ মানুষকে বারবার হাতছানি দিয়ে যায়। তাইতো তারা ভাগ্যের খোঁজে পাড়ি জমায় রাজধানী শহরে। এ ছাড়া অসংখ্য বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ এবং স্কুল ব্যাঙের ছাতার মতো এর অলিতে-গলিতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে।
বিভিন্ন জরিপে ঢাকা শহর বসবাসের যোগ্যতার তালিকায় এত নি¤েœ চলে আসার পেছনে নানাবিধ কারণের মধ্যে আরো রয়েছে দূষণ, জলাবদ্ধতা, যানজট ইত্যাদি। ডাস্টবিন থাকা সত্ত্বেও যত্রতত্র ময়লা-আবর্জনা ও অব্যবহৃত জিনিসপত্র ফেলে সুন্দর পরিবেশকে আমরা ভাগাড়ে পরিণত করছি। শব্দদূষণের মাত্রা প্রকট রূপ নিয়েছে। এতে শহরের মানুষজন শ্রুতি সমস্যায় ভুগছে। এক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি সমস্যায় ভোগে শিশু ও বয়স্ক ব্যক্তিরা। পানি নিষ্কাশনের নেই সুষ্ঠু ব্যবস্থা। পর্যাপ্ত সংখ্যক খাল এবং ড্রেনের অভাব রয়েছে। একটু বৃষ্টি হলেই তলিয়ে যায় ঢাকার নি¤œাঞ্চলগুলো। ওয়াসার এ নিয়ে কোনো মাথাব্যথা নেই। বর্ষা মওসুমে ঢাকার বিভিন্ন সড়কে খোঁড়াখুঁড়ির প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে যায় যা বাড়িয়ে তোলে জনদুর্ভোগের মাত্রা। প্রায় সময় সড়ক সংস্কারের নামে চলে খোঁড়াখুঁড়ির রমরমা ব্যবসা। যানজটের কারণে হেঁটে এগোনোও কষ্টকর।
পরিকল্পিত নগরায়ন এবং অবকাঠামোগত উন্নয়নে নেই কোনো সুচিন্তিত নিয়ম কানুন। যে যেখানে ইচ্ছা নতুন নতুন ভবন গড়ে তুলছে। কেউ তোয়াক্কা করছে না রাজউক প্রণীত নিয়ম-কানুনের। মাঝে মধ্যে দেখা যায়, খাল ও নালা ভরাট করে তৈরি করা হচ্ছে আকাশচুম্বী ভবন। বিভিন্ন সরকারি অফিস-আদালতের পাশে গড়ে উঠছে বস্তি। কলকারখানা ও গার্মেন্ট ফ্যাক্টরির বর্জ্য পতিত হয় নদীগুলোতে।
এক গবেষণায় দেখা গেছে, পিএম ২.৫ মাইক্রোনের চেয়ে ছোট কণার কারণে বাংলাদেশের মানুষের গড় আয়ু স্বাভাবিকের চেয়ে প্রায় ১.৯ বছর কমে গেছে। বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত নগরীতে এ ঘটনা ঘটছে। বছর দেড়েক আগে বিবিসির এক রিপোর্টে প্রকাশিত হয়েছিল, ঢাকার বায়ুদূষণ এমন বিপর্যস্ত অবস্থা তৈরি করেছে যে, ৯ থেকে ১৪ বছরের শিশুদের ফুসফুসের কার্যকারিতা কমে যাচ্ছে। বাড়ছে হাঁপানি ও নিউমোনিয়ার প্রকোপ। বড়দের তুলনায় ছোটদের এ রোগ হওয়ার কারণ বেশি। ছোটদের ওপর গবেষণা করা হয়েছেÑ এমন একটি রিপোর্টে দেখা যায়, বর্তমানে দেশে ৮৫ ভাগ মানুষ শ্বাসকষ্ট বা অ্যাজমায় ভুগছে। ৭৫ লাখ মানুষ ব্রঙ্কাইটিস এবং সিওপিডিতে আক্রান্ত বায়ুতে ধুলাদূষণের কারণে।
এসব সমস্যা থেকে মুক্তি পেতে পরিকল্পিত কর্মসূচি নিতে হবে। এই রাজধানীকে রাজধানীর মর্যাদা দিতে সর্বাগ্রে প্রয়োজন এ শহরের সব শিল্পকারখানাকে পর্যায়ক্রমে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে সরিয়ে নিয়ে যাওয়া। ব্যাপকহারে বৃক্ষরোপণ করা উচিত। গবেষকদের মতে, শহরাঞ্চলে বৃক্ষরোপণের কাজ এক শতাংশ হলেও বায়ুদূষণ কমিয়ে আনতে পারে। সবুজ গাছপালা পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় দারুণ ভূমিকা পালন করে। ঢাকার ভেতরে ও বাইরে যে খাল ও নদীগুলো রয়েছে তা সংস্কার করে প্রবহমান রাখতে হবে। সুন্দর একটি শহর উপহার দিতে চাইলে প্রত্যেকে পরিবেশ রক্ষায় কাজ করে যেতে হবে। সর্বোপরি, দেশের প্রতিটি শহরের যথাযথ বিকাশ ও উন্নয়নের লক্ষ্যে সেখানকার পরিবেশ, জনসংখ্যা, বসবাসকারীদের রুচি, পছন্দ ও জীবনাচারের সাথে সঙ্গতি রেখে কার্যকর ও বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা, উন্নত আধুনিক কৌশল ও নগরব্যবস্থাপনা নীতি-গ্রহণ একান্ত প্রয়োজন। হ
লেখক : শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
ferdaws.khan214@gmail.com