‘সমকামিতা’ বলতে সমলিঙ্গের ব্যক্তির প্রতি রোমান্টিক আকর্ষণ, যৌন আকর্ষণ অথবা যৌন আচরণকে বোঝায়। যৌন অভিমুখিতা হিসেবে ‘সমকামিতা’ বলতে বোঝায় মূলত সমলিঙ্গের ব্যক্তির প্রতি আবেগপূর্ণ ও রোমান্টিক যৌন আকর্ষণের একটি স্থায়ী ধরন।
এবার সমকামিতা নিয়ে ঐতিহাসিক রায় দিয়েছেন ভারতের শীর্ষ আদালত। ৫ সেপ্টেম্বর সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি দীপক মিশ্রের নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের বেঞ্চ এটাকে বৈধতা দিয়ে রায় প্রকাশ করেন। এ যাবৎ ভারতে সমকামিতাকে অপরাধ বলে গণ্য করা হতো। ভারতীয় দণ্ডবিধির ৩৭৭ ধারা অনুযায়ী যদি একই লিঙ্গের মানুষ যৌনসম্পর্কে লিপ্ত হয়, তাহলে তাদের যাবজ্জীবন বা ১০ বছর পর্যন্ত জেল-জরিমানা হতে পারে। ১৮৬০ সালে ব্রিটিশ আমলে তৈরি হয়েছিল এ আইন। ২০০৯ সালে দিল্লি হাইকোর্ট রায় দিয়েছিল, ভারতীয় দণ্ডবিধির ৩৭৭ নম্বর ধারা সংবিধানের মৌলিক অধিকারকে খর্ব করছে। এবার শীর্ষ আদালত সেই সুরে জানিয়ে দিলেন, ৩৭৭ ধারায় সমকামিতার অধিকার খর্ব করা অযৌক্তিক ও অপ্রাসঙ্গিক এবং দুইজন সমলিঙ্গের মানুষ যদি ব্যক্তিগত পরিসরে যৌন সম্পর্কে লিপ্ত হয়, তাহলে তা কোনো অপরাধ নয়।
সারা পৃথিবীতে সমকামিতা, বিকৃত যৌনাচার, সমমৈথুন, পশুমৈথুন নিয়ে আন্দোলন চলছে, পক্ষে-বিপক্ষে যুক্তিতর্ক চলছে, চলতে থাকবে। বাংলাদেশ দণ্ডবিধির ৩৭৭ ধারায় বলা হয়েছে, যে ব্যক্তি স্বেচ্ছাকৃতভাবে কোনো পুরুষ, নারী বা জন্তুর সহিত প্রাকৃতিক নিয়মের বিরুদ্ধে যৌনসহবাস করে সেই ব্যক্তি যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে বা যেকোনো বর্ণনার কারাদণ্ডে যার মেয়াদ ১০ বছর পর্যন্ত হতে পারে, দণ্ড এবং তদুপরি অর্থদণ্ডেও দণ্ডনীয় হবে।
এ ধারায় সম্মতিক্রমে অস্বাভাবিক বা বিকৃত যৌনাচার করলেও অপরাধ হবে। এখানে সম্মতির কোনো মূল্য নেই। কেউ স্ত্রীর সাথে সহবাসের সময় যোনিপথ ব্যতীত অন্য কোনোভাবে যৌনক্রিয়া করলে এ ধারার আওতাধীন অপরাধ হবে।
সংবিধানের ১৯(১) অনুচ্ছেদে অনুযায়ী, রাষ্ট্র সব নাগরিকের জন্য সুযোগের সমতা নিশ্চিত করতে বাধ্য এবং ২৬ (১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, সংবিধানের মৌলিক অধিকারের সাথে অসামঞ্জস্যপূর্ণ সব প্রচলিত আইন আপনা আপনি বাতিল বলে গণ্য হবে। একই সাথে, ২৬ (২) অনুচ্ছেদ মোতাবেক, রাষ্ট্র সংবিধানের মৌলিক অধিকারের সাথে অসামঞ্জস্য কোনো আইন প্রণয়ন করবে না এবং অনুরূপ কোনো আইন প্রণীত হলে, তা বাতিল হয়ে যাবে। তা ছাড়া, ২৭ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সব নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান এবং আইনের সমান আশ্রয় লাভের অধিকারী বলে ঘোষণা করা হয়েছে।
আমাদের সংবিধানে সব ধরনের বৈষম্যহীন ও উল্লিখিত অধিকার সুস্পষ্টভাবে ঘোষিত হলেও বাস্তবে আমরা তার প্রতিফলন দেখি না। বিশেষত যৌন প্রবৃত্তিগত সংখ্যালঘু ব্যক্তি সর্বদা পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র, শিক্ষা ও কর্মক্ষেত্রে এমনকি দেশের প্রচলিত আইন দ্বারাও তাদের প্রতি বৈষম্য করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
আমাদের দেশে প্রচলিত আইনে দুইজন পুরুষ ও মহিলা ইচ্ছার বিরুদ্ধে, সম্মতি ব্যতীত, ভয় দেখিয়ে বা প্রলোভনের দ্বারা সম্মতি আদায়ের মাধ্যমে অথবা অপ্রাপ্তবয়স্ক কোনো মহিলাকে তার সম্মতিসহ বা সম্মতি ব্যতীত যৌনসহবাস করা হলে তা শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য হয়। কিন্তু প্রাপ্তবয়স্ক দুইজন পুরুষ ও মহিলা কোনো প্রকার প্রলোভন ও ভয়ভীতি ছাড়া স্বেচ্ছায় জনগণের অগোচরে বেশ্যাবৃত্তির উদ্দেশ্য ব্যতীত যৌনসহবাস করলে তা অপরাধ নয়।
সর্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণাপত্রের ১ ধারায় সব মানুষ স্বাধীন এবং সমমর্যাদা ও অধিকার নিয়ে জন্মগ্রহণ করে বলে ঘোষণা করা হয়েছে। ফলে লেসবিয়ান, গে, বাইসেক্সুয়াল, ট্রান্সজেন্ডারসহ (এলজিবিটি) সব মানুষ আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন অনুযায়ী জীবনের অধিকার, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও সুরক্ষা পাওয়ার অধিকার, স্বেচ্ছাচারী আটক, গ্রেফতার ও নির্যাতিত না হওয়ার অধিকার, মত প্রকাশ, সংগঠন করা ও শান্তিপূর্ণ সমাবেশের অধিকারসহ একজন মানুষ হিসেবে প্রাপ্য সহজাত সব অধিকার পূর্ণরূপে উপভোগ করার অধিকারী।
বাংলাদেশে সমকামিতার কোনো বৈধতা নেই। তবে প্রায়ই পত্রিকায় প্রকাশিত খবর থেকে জানা যায়, ঢাকায় বিলাসবহুল বাসা ভাড়া নিয়ে এক শ্রেণীর পুরুষ অন্য পুরুষের সাথে যৌনসম্পর্ক স্থাপন করছে। একইভাবে নারীরাও সমকামী সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ছে।
২০১৩ সালে দুই সমকামী নারীর বিয়ে নিয়ে সারা দেশে তোলপাড় শুরু হয়েছিল। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ নিয়ে চলে ব্যাপক সমালোচনা। এর রেশ কাটতে না কাটতেই আরো একটি ঘটনা নজরে আসে। দুই যুবকের সমকামী সম্পর্ক নিয়ে চারদিকে শুরু হয় তোলপাড়। তারা রাজধানীর জোয়ার সাহারা এলাকার একটি ফ্ল্যাটে বসবাস করতেন। নিষিদ্ধ একটি সংগঠন তাদের প্রাণনাশের হুমকি দেয়। তারপর বেরিয়ে আসে থলের বিড়াল। আইনি প্রতিবন্ধকতা থাকায় দেশে ঠিক কতজন সমকামী রয়েছে তা জানা সম্ভব হয় না। তবে সমকামীদের পক্ষেও কোনো কোনো সংগঠন কথা বলছে। নিজেদের অধিকার আদায়ে তারা বিভিন্ন ফোরামে কথা বলছে। আর সমকামিতার বিপক্ষে সোচ্চার প্রধানত ইসলামি দলগুলো। তাদের মতে এ ধরনের সম্পর্ক শুধু অনৈতিকই নয়; প্রচলিত সামাজিক সম্পর্ক ভেঙে দেয়ার চক্রান্তও।
অনেক দেশেই সমকামী বিয়ে বৈধ। জানা গেছে, ২০০৩ সালে বেলজিয়াম, ২০০৫ সালে স্পেনে, ২০০৯ সালে নরওয়ে, একই বছর সুইডেন, ২০১০ সালে পর্তুগাল, একই সময়ে আইসল্যান্ড, ২০১২ সালে ডেনমার্ক ও সর্বশেষ ২০১৪ সালে ফিনল্যান্ডে সমকামী বিয়ের বৈধতা দেয়া হয়েছে। জানা গেছে, নেদারল্যান্ডস, ব্রিটেন, ফ্রান্স, লুক্সেমবার্গ, আয়ারল্যান্ড, দক্ষিণ আফ্রিকা, আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল, যুক্তরাষ্ট্র ও নিউজিল্যান্ডসহ অন্তত ২০টি দেশে ওদের অধিকার সুরক্ষায় আইন আছে। তবে সমকামী বিয়ের বৈধতার তালিকায় এশিয়ার কোনো দেশ নেই। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে সমকামিতা বৈধতা দিলো। আমরা অনেক কিছুতেই ওদের অনুসরণ-অনুকরণ করিÑ প্রয়োজন না হলেও। দূর ভবিষ্যতে কি কোনো অশুভ সঙ্কেত এ জাতির জন্য অপেক্ষা করছে? হ
লেখক : বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী
Email:seraj.pramanik@gmail.com,
