বুড়িগঙ্গা নদীর দূষণ রোধসহ পরিকল্পিতভাবে চামড়া শিল্পনগরী গড়ে তোলার জন্য প্রায় দেড় বছর আগে রাজধানীর হাজারীবাগ থেকে ট্যানারি সরিয়ে সাভারের হেমায়েতপুরে নেয়া হয়েছে। পরিকল্পিত, টেকসই ও আধুনিকভাবে সাভারের চামড়া শিল্পনগরী গড়ে ওঠার কথা ছিল। কিন্তু সাভারের চামড়া শিল্পনগরী এলাকা ও এর আশপাশের পরিবেশ আগের মতো (হাজারীবাগ থাকাকালে যেমন হতো) একইভাবে দূষিত হচ্ছে। ট্যানারির দূষিত বর্জ্যে আগেও যেভাবে নদী দূষণ (বুড়িগঙ্গা) হতো, এখনো সেভাবে নদী দূষণ হচ্ছে। বুড়িগঙ্গার সেই দুর্ভাগ্য চেপেছে এখন ধলেশ^রী নদীর ওপর। কঠিন ও তরল বর্জ্য পরিশোধনের ক্ষেত্রে সাভারের চামড়া শিল্পনগরীতে ‘হ-য-ব-র-ল’ অবস্থা বিরাজ করছে। কেন্দ্রীয় বর্জ্য পরিশোধনের (সিইটিপি) নির্মাণকাজ এখনো পুরোপুরি শেষ হয়নি। কঠিন বর্জ্য ফেলার জন্য ডাম্পিং ইয়ার্ড নির্মাণ করা হয়নি। ফলে উৎপাদিত কঠিন বর্জ্য (পশুর কান, লেজ, শিং, হাড়, লোম, চামড়ার কাটপিস, গোশতের ঝিল্লি ইত্যাদি) ডাম্পিং ইয়ার্ডের ভাগাড়ে ফেলা হচ্ছে। মাঝে মধ্যে বর্জ্যরে ভারে ও বৃষ্টিপাতে ভাগাড়ের বাঁধ দুর্বল হয়ে যাওয়ার ফলে দেয়াল ভেঙে বর্জ্য নদীতে গিয়ে পড়ছে। এ ছাড়া শিল্পনগরের তরল বর্জ্য ‘সিইটিপিতে’ পৌঁছানোর আগেই বিভিন্ন জায়গার পাইপলাইন উপচে বর্জ্য নালায় গিয়ে পড়ছে। এসব বর্জ্যরে শেষ ঠিকানা হচ্ছে নদী। ‘সিইটিপিতে’ যথাযথভাবে রাসায়নিক প্রয়োগ না করার ফলে বর্জ্য পুরোপুরি পরিশোধিত হচ্ছে না। ফলে ‘সিইটিপি’ থেকে বর্জ্যমিশ্রিত যে পানি নদীতে ফেলা হচ্ছে তাতে ক্ষতিকর উপাদান থেকে যাচ্ছে। অপর দিকে, ক্রোমিয়াম রিকভারি ইউনিট চালু না করায় ক্রোমিয়ামযুক্ত কঠিন বর্জ্য ভাগাড়ে ও এর আশপাশে থেকে যাচ্ছে। ফলে পানির সাথে মিশে তা নদীতে গিয়ে পড়ছে। তরল বর্জ্যরে ক্ষেত্রে পরিশোধনের পরও তাতে বিভিন্ন রোগ সৃষ্টিকারী রাসায়নিক ও ক্রোমিয়াম যেমন থাকছে, তেমনি বায়োকেমিক্যাল অক্সিজেন ডিমান্ডও (বিওডি) ঠিক রাখা যাচ্ছে না। নিয়ম মেনে ‘সিইটিপি’ চালু না রাখায় ট্যানারির বর্জ্য নদীতে গিয়ে পড়ছে। পরিবেশ অধিদফতরসহ পরিবেশসংক্রান্ত মহলের পরীক্ষা-নিরীক্ষা অনুযায়ী, বর্জ্য শোধনের পর যে পানি ধলেশ^রীতে ফেলা হচ্ছে তাতে নির্ধারিত মাত্রার চেয়ে বেশি ক্রোমিয়াম, ক্ষার, রাসায়নিক পদার্থ, লবণসহ বিভিন্ন ধরনের ক্ষতিকর রাসায়নিক উপাদান থাকছে। ফলে নদীর পানি মারাত্মকভাবে দূষিত হচ্ছে। দূষণের কারণে ধলেশ^রীর পানিতে অক্সিজেনের মাত্রা শূন্যের কোটায় নেমে এসেছে। বিষাক্ত বর্জ্যে নদীর পানির রঙ পাল্টে গেছে। মাছের মড়ক দেখা দিয়েছে। বর্জ্যরে বিষক্রিয়ায় আশপাশের আবাদি জমির ফলনও অনেক কমেছে। ফলে মাছ ও জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়েছে। আশপাশের পরিবেশ ও প্রাণিকুলের জন্য ধলেশ^রীর পানি অত্যন্ত ক্ষতিকর হয়ে উঠছে।
অথচ ট্যানারির তরল বর্জ্য এমনভাবে পরিশোধন করে নদীতে ফেলার কথা, যাতে নদীর কোনো দূষণ কিংবা ক্ষতি হবে না। নদী আমাদের জীবন ও জীবিকার সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। এ অবস্থা চলতে থাকলে অচিরেই ধলেশ^রীর দূষণ বুড়িগঙ্গাকেও ছাড়িয়ে যাবে। কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে কোনো কার্যকর পরিকল্পনা না থাকায়, ট্যানারির পাশের একটি অংশ আবর্জনার ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে। এ ছাড়া চামড়া শিল্পনগরীতে নিয়োজিত শ্রমিকদের নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্যঝুঁকিকে অনেক সময় গুরুত্ব দেয়া হয় না। ট্যানারি শিল্পে কাজ করা শ্রমিকরা সবচেয়ে বেশি স্বাস্থ্যঝুঁকিতে থাকেন। এ শিল্পে শ্রমিকদের নিরাপত্তার ব্যাপারে মালিকপক্ষ সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নিতে হবে। ট্যানারির দূষণ নিয়ে বহু বছর ধরে আলোচনা হচ্ছে। পরিবেশ দূষণ, নদনদীর দূষণ এবং শ্রমিকদের স্বাস্থ্যগত নিরাপত্তার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর ক্ষেত্রে আগেও যে অবস্থা ছিল, সাভারের ট্যানারি শিল্পনগরীর অবস্থা তার থেকে খুব একটা উন্নতি হয়নি। মালিকপক্ষ, শিল্প মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট কেউ এর দায় এড়াতে পারে না।
চামড়া শিল্প এ দেশের অন্যতম বৃহৎ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী শিল্প। এতকাল পরও যদি এ শিল্পে পরিকল্পিত ও আধুনিক ব্যবস্থাপনার ছোঁয়া না লাগে, তাহলে বিদেশী কোম্পানিগুলো বিনিয়োগ ও ক্রয়ের ক্ষেত্রে বিভিন্ন শর্ত আরোপ করাই শুধু নয়, মুখ ফিরিয়েও নিতে পারে। সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলোÑ ট্যানারির ‘টেকসই বর্জ্য ব্যবস্থাপনা’। এ ক্ষেত্রে উন্নত দেশের ট্যানারির সুষ্ঠু, আধুনিক ও টেকসই ব্যবস্থাপনার দিকে নজর দেয়া যেতে পারে। এ ছাড়া বিকল্প চিন্তা হিসেবে ট্যানারির সলিড বা কঠিন বর্জ্য পুনঃপ্রক্রিয়া বা পুনর্ব্যবহার (রিসাইক্লিং) করে তা থেকে বিদ্যুৎ, আঠা ও সার উৎপাদন করা যেতে পারে। ট্যানারির কঠিন বর্জ্য দিয়ে বিভিন্ন উন্নত দেশে বিভিন্নভাবে রিসাইক্লিং প্রক্রিয়ার বাই-প্রোডাক্ট হিসেবে অনেক কিছু উৎপাদন করা হচ্ছে। এতে করে পরিবেশ দূষণ থেকেও রক্ষা পাচ্ছে। হ
sadonsarker2005@gmail.com
