পত্রিকার পাতা খুললেই চোখে পড়ে, প্রতিদিন নারীরা গণপরিবহনে যৌন নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। যাত্রীকল্যাণ সমিতির প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ১৩ মাসে দেশের গণপরিবহনে ২১ জন নারী ধর্ষণ ও যৌন হয়রানির শিকার হয়েছেন। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর মতে দেশে পুরুষের সংখ্যা আট কোটি ১৯ লাখ ১০ হাজার, নারীর সংখ্যা আট কোটি ১৭ লাখ ৪০ হাজার। অর্থাৎ, নারী-পুরুষের অনুপাত প্রায় সমান। তবু কেন নারীরা সুরক্ষিত নয় এ সমাজে! ব্যস্ত নগরীর যান্ত্রিক জীবনে প্রতিদিনই নারী নির্যাতনের মতো ঘটনা ঘটছে যা একটি স্বাধীন দেশের ভাবমর্যাদা বিনষ্ট করছে। এই দেশে গণপরিবহনগুলোতে ৯৪ শতাংশ নারী যাত্রীই মৌখিক, শারীরিক ও যৌন নিপীড়নের শিকার হন। এটি সবার জন্য লজ্জার ব্যাপার।
নিপীড়িতদের বেশির ভাগ প্রতিবাদ করেন না আরো হয়রানির ভয়ে। ব্র্যাকের সড়ক নিরাপত্তা কর্মসূচির ‘নারীর জন্য যৌন হয়রানি ও দুর্ঘটনামুক্ত সড়ক’ শীর্ষক গবেষণায় এসব তথ্য উঠে এসেছে। এর প্রতিবেদনে বলা হয়, গণপরিবহনে নারীর সুরক্ষায় দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান সবচেয়ে নিচে। অথচ দেশের ক্ষমতায় আছেন যিনি একজন নারী! বর্তমানে নারীরা সক্রিয় অংশগ্রহণ করছে বিভিন্ন পেশায়। রাজধানী ঢাকায় বেশির ভাগ নারীকে কাজের জন্য গণপরিবহনে যাতায়াত করতে হয়। বিভিন্ন অফিস, আদালত ও স্কুল-কলেজে যাওয়ার জন্য গণপরিবহনই প্রধান মাধ্যম। মহানগরী ঢাকায় গণপরিবহনের সংখ্যা খুব কম থাকায় প্রতিনিয়ত ভোগান্তি পোহাতে হয়Ñ বিশেষ করে নারী যাত্রীদের।
এক জরিপে জানা গেছে, রাজধানী ঢাকা শহরে বছরে নতুন করে প্রায় ছয় লাখ ১২ হাজার লোক যুক্ত হচ্ছে। প্রতি মাসে প্রায় ৫১ হাজার আর প্রতিদিন প্রায় এক হাজার ৭০০ লোক মফস্বল থেকে এসে ঢাকায় স্থায়ীভাবে বসতি গড়ছে। সরকারি হিসেবে ঢাকায় বর্তমান জনসংখ্যা এক কোটি ৬৫ লাখ। প্রতি বর্গকিলোমিটারে ৪৫ হাজারেরও বেশি মানুষ। অথচ সে অনুপাতে ঢাকায় গণপরিবহনের সংখ্যা নেহায়েত অপ্রতুল। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) তথ্য মতে, জনসংখ্যার অনুপাতে রাজধানীতে প্রায় আট হাজার বাস-মিনিবাসের প্রয়োজন। বর্তমানে চলছে মাত্র সাড়ে তিন হাজার। গত ১০ বছরে ১৬৬টি রুটে পাঁচ হাজার ৪১৯টি বাস-মিনিবাস চলাচলের অনুমতি দেয়া হলেও প্রায় অর্ধেকই এখন ঢাকার রাস্তায় নেই। রাজধানীতে ৯২টি কোম্পানির প্রায় বাস চলাচল করছে। ১৬৬টি রুটের মধ্যে ১১২ রুটে কোনো বাস নেই। ১২টি রুটে চলছে মাত্র একটি কোম্পানির বাস। গণপরিবহনের এই অপ্রতুলতা নারীর যৌন নির্যাতনের অন্যতম কারণ। সঠিক সময়ে স্কুল-কলেজ অথবা কর্মক্ষেত্রে পৌঁছানোর জন্য নারীরা বাসে পুরুষের সাথে গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে যেতে বাধ্য হচ্ছেন। তখন যৌন হেনস্তা ও নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। নারীদের জন্য আলাদা গণপরিবহনের ব্যবস্থা করা উচিত। নারী ক্ষমতায়নের জন্য পুরস্কার পেয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বাংলাদেশে নারী উন্নয়নে অনেক পদক্ষেপ নিয়েছেন তিনি। তবে নারী সুরক্ষার জন্য নারীবান্ধব গণপরিবহনের উপযুক্ত ব্যবস্থা করা সময়ের দাবি।
গণপরিবহনে নারীর যৌন নির্যাতনের দায়ভার থেকে পুরুষের এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। তাই সচেতন হতে হবে আমাদের সবাইকে। পুরুষের সম্মিলিত উদ্যোগই পারবে গণপরিবহনে নারীদের নিরাপদ রাখতে। গণপরিবহনের সংখ্যা পর্যাপ্ত হলেও এই সমস্যা কিছুটা কমতো। সরকারের এ বিষয়ে নজর দেয়া জরুরি। হ