দেশের সরকারি খাদ্যগুদামগুলোয় এ মুহূর্তে গত এক দশকের মধ্যে খাদ্যের সর্বোচ্চ মজুদ রয়েছে। খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে সরকারি গুদামে মজুদ খাদ্যকে বিশেষ গুরুত্বের সাথে দেখা হয়। খাদ্য অধিদফতরের হিসাব অনুযায়ী, গত সোমবার পর্যন্ত সরকারি গুদামগুলোয় খাদ্য মজুদের পরিমাণ ছিল ১৬ লাখ ২৯ হাজার ৬১৮ টন; যার মধ্যে চাল ১৩ লাখ ৯০ হাজার ১২৪ ও গম চার লাখ ৬৮ হাজার ১৩৪ টন। এ মজুদ গত ১০ বছরের মধ্যে সবচেয়ে বেশি।
চলতি বছরের বোরো মওসুমে সরকারিভাবে ধান-চাল সংগ্রহের হার শতভাগ সম্পন্ন হয়েছে। এর ফলে আগামী বোরো মওসুম পর্যন্ত দেশে বড় ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগ না ঘটলে বিদেশ থেকে চাল আমদানি করতে হবে না। খাদ্য আমদানির জন্য যে অর্থ বরাদ্দ রয়েছে, সেখান থেকে চার লাখ টন চাল এরই মধ্যে অভ্যন্তরীণ বাজার থেকে সংগ্রহ করেছে খাদ্য অধিদফতর। এর ফলে আগামী বোরো ফসল কৃষকের ঘরে ওঠা পর্যন্ত সরকারি সব ক’টি খাদ্য গুদামেই পর্যাপ্ত চাল মজুদ থাকবে। গত বোরো মওসুমে অভ্যন্তরীণ বাজার থেকে চাল আমদানির লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১০ লাখ টন। এ চাল সংগ্রহের পর অতিরিক্ত আরো চার লাখ টন চাল সংগ্রহ করেছে সরকার। গত বছর এই সময়ে সরকারের গুদামে চাল ও গম মিলিয়ে মজুদের পরিমাণ ছিল মাত্র চার লাখ ৬৮ হাজার ১৩৪ টন। এ বছর মজুদের পরিমাণ গত বছরের প্রায় তিন গুণ।
দেশের সরকারি খাদ্যগুদামে পর্যাপ্ত চাল-গম মজুদ থাকা নিঃসন্দেহে স্বস্তিদায়ক ঘটনা। খোলাবাজার নিয়ন্ত্রণে সরকারি মজুদ যেহেতু গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে, সেহেতু আশা করা যায়; আগামী বোরো মওসুমের ফসল ওঠার আগে চাল বা গমের বাজারে স্থিতিশীল পরিস্থিতি বিরাজ করবে। সরকারি গুদামে মজুদ খাদ্যের মান রক্ষায়ও সংশ্লিøষ্টদের সচেতন থাকতে হবে। এ ক্ষেত্রে কোম্পানি কা মাল, দরিয়া মে ঢাল তত্ত্ব যাতে মাথাচাড়া দিয়ে না ওঠে, সে বিষয়ে খাদ্য মন্ত্রণালয়কে চোখ-কান খোলা রাখতে হবে। দেশে সাম্প্রতিক বছরগুলোয় খাদ্য উৎপাদন সন্তোষজনক হারে বাড়ছে। এ উৎপাদন আরো বাড়ানো সম্ভব। তবে তার আগে কৃষক যাতে উৎপাদিত ফসলের ন্যায্যমূল্য পায় তা নিশ্চিত করাও জরুরি।
এখানে আরেকটি বিষয় উল্লেখ্য, দেশে ফসলি জমির পরিমাণ ক্রমেই কমছে। আবাসিক চাহিদা, শিল্পকলকারখানা স্থাপন, মাছ চাষ ও রাস্তাঘাট স্থাপনা তৈরির কারণে ফসলি জমির ওপর চাপ বাড়ছে। গত এক দশকে প্রতি বছর গড়ে ৬৮ হাজার ৭০০ হেক্টর ফসলি জমি কমেছে। জাতিসঙ্ঘ খাদ্য ও কৃষি সংস্থা, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও ইউএস এইডের অর্থায়নে পরিচালিত এক গবেষণা প্রতিবেদনের তথ্য মতে, ১৯৭৬ সালে কৃষিজমির পরিমাণ ছিল ৯৭ লাখ ৬১ হাজার ৪৫০ হেক্টর। ২০০০ সাল পর্যন্ত তিন লাখ ২১ হাজার ৯০৯ হেক্টর কমে দাঁড়ায় ৯৪ লাখ ৩৯ হাজার ৫৪১ হেক্টরে। কিন্তু পরবর্তী মাত্র ১০ বছরে ২০১০ সাল নাগাদ ছয় লাখ ৮৭ হাজার ৬০৪ হেক্টর কমে মোট কৃষিজমির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৮৭ লাখ ৫১ হাজার ৯৩৭ হেক্টর। ১৯৭৬ থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত ২৫ বছরে যে পরিমাণ কৃষিজমি কমেছে, পরের ১০ বছরে কমার পরিমাণ পাঁচগুণ বেশি।
ইউএনডিপির (২০০৩) প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, প্রতি বছর ১ শতাংশ কৃষিজমি হারিয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশ পরিকল্পনা কমিশনের (২০০৯) এক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, প্রতি বছর ১ শতাংশ কৃষিজমি অকৃষি খাতে চলে যাচ্ছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো ও কৃষি তথ্য সার্ভিসের (২০১৫) সূত্র উল্লেখ করে, কৃষি মন্ত্রণালয় তাদের ওয়েব পোর্টালে জানিয়েছে, দেশে মোট আবাদযোগ্য জমি ৮৫০৫২৭৮.১৪ হেক্টর, মোট সেচকৃত জমি ৭১২৪৮৯৫.৪১ হেক্টর, আবাদযোগ্য পতিত জমি ২০৪৩৬৬.১৪ হেক্টর। দেশজুড়ে প্রতিদিন কমছে কৃষিজমি। এ বিষয়ে গণমাধ্যমে প্রকাশিত হচ্ছে নানা খবর ও প্রতিবেদন। দেশজুড়ে পাহাড় থেকে সমতল, বিল থেকে হাওড়, চর থেকে উপকূল, বন থেকে বরেন্দ্র-নানাভাবে কৃষিজমি কমে যাচ্ছে। কৃষিজমি কমার কারণে গ্রামীণ বেকারত্ব বাড়ছে। দেশের মোট দরিদ্রের ৮২ শতাংশ লোক গ্রামে আর ১৮ শতাংশ শহরে বাস করে। এই বৃহত্তম জনগোষ্ঠী কৃষিকাজের ওপর নির্ভর করে জীবন-জীবিকা চালায়। এখন আমাদের বিদেশ থেকে খাদ্য আমদানি করতে হয় না, দেশে পর্যাপ্ত খাদ্য উৎপাদন হওয়ায় এবং এতে বিদেশনির্ভরতা কমছে, আর গ্রামীণ কর্মক্ষেত্র সৃষ্টি হয়েছে।
আরেকটি বিষয় হচ্ছে, দেশে বর্তমানে ইটভাটার বেশির ভাগই অবৈধ। দেশে চাহিদানুযায়ী ইট প্রস্তুত করতে ১২৭ কোটি সিএফটি মাটির দরকার হয়। যার বেশির ভাগই কৃষিজমির উপরি ভাগ থেকে সংগৃহীত। ইট প্রস্তুতখ্যাত দেশের গ্রিন হাউজ গ্যাসের সবচেয়ে বড় উৎস। এ খাতে বছরে ২২ লাখ টন কয়লা ও ১৯ লাখ টন জ্বালানি কাঠ পোড়ানো হয়। যা বছরে ৮৮ লাখ টন গ্রিন হাউজ গ্যাস নিঃসরণ করে। ফসলি জমিতে ইটভাটা চালু করায় এর বিষাক্ত ধোঁয়ায় ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে জমির ফসল। ইট যেহেতু পোড়াতে হয় দীর্ঘক্ষণ ধরে উত্তপ্ত আগুনে, তাই আশপাশের জমির পানি যায় শুকিয়ে এবং ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নামতে থাকে নিচে। আর প্রতি বছর কার্বন ডাই-অক্সাইড নির্গত হয় সাত লাখ টন। বর্তমানে যে হারে বন উজাড় করে ভাটা তৈরি হচ্ছে, তা পরিবেশবিরোধী। কমে যাচ্ছে কৃষিজমি। এ অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য প্রয়োজন ইট তৈরির বিকল্প পথের সন্ধান করতে হবে। ইটভাটায় বায়ুদূষণমুক্ত ইট তৈরির প্রযুক্তি নিশ্চিত করা প্রয়োজন। মাটির ইটের পরিবর্তে বিকল্প ইট তৈরি করতে হবে। সপ্তম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা অনুযায়ী ইট তৈরিতে মাটির ব্যবহার ২০২০ সালের মধ্যে শূন্যের কোটায় নামিয়ে আনার পরিকল্পনা করা হয়েছে। নদী খনন থেকে উঠে আসা বালু দিয়ে ইটের বিকল্প উপকরণ দিয়ে ভবন নির্মাণকাজ করা যেতে পারে। হ
Email: chairman@ifadgroup.com