গণমাধ্যম অফিসগুলোতে ঊর্ধ্বতন সহকর্মীকে ‘স্যার’ ডাকার চল নেই। ডাকা হয়... অমুক ভাই বা অমুক আপা, কিংবা দাদা-দিদি। ঊর্ধ্বতন-অধঃস্তন নির্বিশেষে এসব অফিসে একটা কমরেডারি ভাব থাকে। সুপিরিয়র সেখানে থাকেন, তবে সুপিরিয়রিটি কমপ্লেক্স থাকে না। ঊর্ধ্বতনেরা বড় ভাই বা বোনের মতো সেখানে দেখিয়ে-শুনিয়ে দেন, ভুল সংশোধন করে দেন, আদেশ-নির্দেশ দেন; কিন্তু বসগিরি করেন না।
এ কথাগুলো কিছু দিন আগে পর্যন্তও হয়তো সত্য ছিল; কিন্তু এখন আর নেই। অন্তত আমার প্রায় ৯ বছরের সাংবাদিকতা পেশার সাথে যুক্ত থাকার অভিজ্ঞতা তেমনটাই বলে। আমি মূলত কাজ করেছি সম্প্রচার মাধ্যমে, অর্থাৎ দেশের একটা নামী টিভি চ্যানেলের বার্তা বিভাগে। সেখানে সম্পূর্ণ সততা ও নিষ্ঠার সাথে কাজ করা সত্ত্বেও ঊর্ধ্বতন সাংবাদিক সহকর্মীদের কাছ থেকে যে অশালীন, অভদ্র, অমার্জিত, রূঢ় আচরণ পেয়েছি, তা এককথায় অকল্পনীয়। এসব ঊর্ধ্বতনদের অনেকে পদ-পদবির জোরে ধরাকে সরাজ্ঞান করে, অধঃস্তনদের মানুষ বলেই মনে করতে চান না।
টিভি চ্যানেলটিতে কাজ করার সময় সেখানকার কিছু উচ্চপদস্থ সাংবাদিকের স্বেচ্ছাচার, মিথ্যাচার, হামবড়া ভাবের যেসব ন্যক্কারজনক নমুনা দেখেছি, তা ভোলার নয়। সামান্য ত্রুটি-বিচ্যুতির জন্যও নিম্নপদস্থদের মা-বাপ তুলে অশ্লীল গালাগাল দেয়া ছিল সেখানকার নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার। প্রতিবেদক, বার্তাকক্ষ সম্পাদক, প্রযোজক বহু ছেলেমেয়েকে এ জন্য চোখের পানি ঝরিয়ে বলতে শুনেছি, ‘মা-বাপকে গাল শোনানোর জন্য বিশ^বিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ ডিগ্রি নিয়ে সাংবাদিকতা করতে এসেছি!’
এমন সব উচ্চপদস্থ সাংবাদিকদের দেখেছি, যারা অধস্তনদের জন্য আসা বিদেশে কোনো অনুষ্ঠানে-আয়োজনে যোগদানের আমন্ত্রণপত্র হস্তগত করে নিজেই বিদেশ ভ্রমণ করে এসেছেন, অধস্তনকে বঞ্চিত করেই। অধঃস্তনদের বিজ্ঞাপন কমিশন, ভ্রমণ বিল প্রভৃতির টাকা আত্মসাৎ করতেও অনেক সিনিয়র সাংবাদিককে দেখেছি। আবার এমন অনেক উদাহরণও দেখেছি এবং দেখছি, কর্মরত সাংবাদিক না হয়েও কেউ কেউ সাংবাদিক ইউনিয়নের নির্বাচিত নেতা হচ্ছেন, প্রতিবেদক না হয়েও প্রতিবেদকদের সংগঠনে পদাধিকারী হচ্ছেন।
সরকারে নেয়া নানা পদক্ষেপের কারণে শিক্ষকতা এখন দারিদ্র্যমুক্ত বলা চলে। কিন্তু সাংবাদিকদের অর্থনৈতিক অবস্থা উন্নত করার তেমন কোনো পদক্ষেপ আজ পর্যন্ত নেয়া হয়নি। সদাশয় সরকার অবশ্য বলতে গেলে বছর বছরই সাংবাদিকদের জন্য নতুন নতুন ওয়েজবোর্ড ঘোষণা করছে। কিন্তু এসব ওয়েজবোর্ডের গরু প্রায়ই কেতাবে থাকে, গোয়ালে থাকে না। হাতে গুনা দু-একটা ছাড়া বেশির ভাগ পত্রপত্রিকায় বা টিভি চ্যানেলে এ ওয়েজবোর্ড কখনো বাস্তবায়িত হয় না, যার ফলে সাধারণ সাংবাদিকদের আর্থিক অবস্থারও দৃশ্যমান কোনো উন্নতি হয় না।
কিন্তু সবচেয়ে দুঃখের কথা হলো, সাধারণ সাংবাদিকেরা ওয়েজবোর্ড অনুযায়ী বেতনভাতা না পেলেও, একই অফিসে কাজ করেও অসাধারণ (?) কিছু সাংবাদিক সাধারণত ওয়েজবোর্ডের চেয়ে কয়েক গুণ বেশি বেতন পেয়ে থাকেন। একই অফিসে এভাবে দ্বৈত নীতি অনুসরণ করা হয়, অথচ এ ব্যাপারে বলার কেউ নেই। সাধারণ অফিসে বা প্রতিষ্ঠানে যেভাবে কর্মকর্তা ও সাধারণ কর্মীর দুটো স্তর বজায় রাখা হয়, একইভাবে গণমাধ্যমেও অলিখিতভাবে উচ্চপদস্থ ও নিম্নপদস্থ সাংবাদিকদের দুটো স্তর থাকে। আর্থিক ও অন্যান্য দিক থেকে এ দুটো স্তরের মধ্যে আকাশ-পাতাল পার্থক্য দেখা যায়।
সাংবাদিকতা পেশাকে অন্য পাঁচটা পেশার সাথে তুলনা করা যায় না। গণমাধ্যমকে ‘ফোর্থ স্টেট’ হিসেবে বিবেচনা করা হয় এ জন্য যে, এটি দল-মত নিরপেক্ষ হয়ে থাকে। কিন্তু তত্ত্বগতভাবে এটি সত্য হলেও বাস্তবে কিন্তু গণমাধ্যমগুলোর বেশির ভাগকেই কোনো না কোনো রাজনৈতিক দলের, বিশেষ করে সরকারের বা সরকারি দলের লেজুড়বৃত্তি করতে দেখা যায়। এ জন্য মূলত এসব মাধ্যমের মালিক ও উচ্চপদস্থ সাংবাদিকরাই দায়ী। নিম্নপদস্থ বা সাধারণ সাংবাদিকদের এ ক্ষেত্রে কিছুই বলার বা করার থাকে না, শুধু ঊর্ধ্বতনদের নির্দেশ মেনে পক্ষপাতদুষ্ট সংবাদ পরিবেশন করা ছাড়া।
এখন তো সরকারি বিজ্ঞাপনের কোটা ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা পাওয়ার জন্য সরকারের লেজুড়বৃত্তি করতেই বেশির ভাগ পত্রপত্রিকা ও টিভি চ্যানেলকে দেখা যায়। এভাবে ফোর্থ স্টেটের সংজ্ঞা অবিরাম লঙ্ঘিত হলেও সাধারণ সাংবাদিকদের কিছুই করার থাকে না। কারণ তারা যদি সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের তথাকথিত নীতিমালা লঙ্ঘন করে নিরপেক্ষ সংবাদ পরিবেশন করে, তা হলে তাদের কঠোরতম ভর্ৎসনা ও শাস্তির মুখোমুখি হতে পারে, এমনকি চাকরিও চলে যেতে পারে। হ
লেখক : অনলাইন মাধ্যমে কর্মরত সাংবাদিক