১৯৪৭ সাল আর স্বাধীনতার ৪৭ বছর, ২৪ বছর স্বাধীনতার আগের আর ৪৭ বছর স্বাধীনতার পরের। একটি গল্প পড়তে গিয়ে পড়লাম ‘ইংরেজরা করে গেছে শাসন, পাকবাহিনী করে গেছে শোষণ আর এখন বাঙালি শুধু দিচ্ছে ভাষণ।’ আমার বাবা মুক্তিযুদ্ধের একজন কমান্ডার ছিলেন। দীর্ঘ ৯ মাস তিনি যুদ্ধ করেছেন। কিন্তু এখনকার বাংলাদেশ দেখে বাবা আক্ষেপ করে বলেনÑ এমন দেশটা চাইনি আমরা।
বাবার কথা শুনে আমি বলিÑ স্বাধীনতা এসেছে ৪৭ বছর হয়েছে, মুক্তি আসতে আর কত দিন বাকি? বাবা আমার মুখের দিকে হাঁ করে তাকিয়ে থাকেন। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকে যারাই ক্ষমতায় এসেছেন, তারা নিজেদের পকেট ভারী করেছেন। একটি বাস্তব কথা হলোÑ যারা ক্ষমতায় থাকেন তাদের চেহারা তেলতেলে দেখায়, মানে শীতের দিনে গ্লিসারিন মাখার পর চেহারা যা হয় আর কি। আর যারা বিরোধী দলে থাকেন, তাদের চেহারা ঝরে পড়া ঝরাপাতার মতো খসখসে মনে হয়। প্রশ্ন হতে পারে এটি কেন? আসলে ক্ষমতাই হলো এই তেলতেলে হওয়া না হওয়ার উৎস।
আমি কোনো দলের অন্ধ ভক্ত নই। রাজনৈতিক দলগুলোর ভালোকে ভালো, মন্দকে মন্দ বলতেই ভালোবাসি। একাদশ সংসদ নির্বাচন সামনে বর্তমান। ক্ষমতাসীনেরাই আবার ক্ষমতায় এলে কী হবে? কারণ, পরপর দুইবার ক্ষমতায় এসে তারা পকেট একেবারে ভরে ফেলেছেন, এখন আর ভরার কী আছে?
স্বাধীনতার পর কোনো দলই জনগণের কথা ভাবেনি, ভাবে না। শঙ্কা হয়, কেউ ভাববে না। দেশে উন্নয়ন হয়েছে। এই উন্নয়নের জন্য যারা অবদান রেখেছেন তারা আলোচনায় আসেন না; আলোচনায় আসেন ক্ষমতায় যারা থাকেন তারা। ক্ষমতায় যারা এসেছেন তারা জনগণের ভোটেই এসেছেন, তাই জনগণ তাদের কাছে উন্নয়ন পাওয়ার দাবিদার। আমরা ভাষণ শুনতে শুনতে আজ ক্লান্ত। কথায় আছেÑ কথা কম, কাজ বেশি। তবে বাঙালি আমরা কথা বলি বেশি, কাজ করি কম।
স্বাধীনতার ৪৭ বছরে আজ কোন পথে দেশ? দেশ উন্নতির পথে। তবে সে উন্নতির ধারা কার হাত ধরে আসছে তা জনগণকে জানানোর দায়িত্ব আমাদের সরকারের। যখন যে সরকার ক্ষমতায় আসে তারা সব উন্নতির কৃতিত্ব নিজেরাই নিতে চায়, নিজেদের বলেই চালিয়ে দেয়। ৩০ বছর আগেও ভাবতে পারিনি ঘরে বসে এমন করে এই বিষয়ে লিখব, ই-মেইল করব আর পত্রিকায় লেখা চলে যাবে। এটি দেশের উন্নতির প্রত্যক্ষ প্রমাণ। এটি যেমন ক্ষমতায় থাকার ব্যক্তিরা নিজেদের সাফল্য মনে করেন, তেমনি অধঃপতনগুলোর জন্য তারা নিশ্চয়ই নিজেদের দায় স্বীকার করতে হবে। এই উন্নয়নের লক্ষ্যমাত্রায় পৌঁছতে গিয়ে কার ক্ষতি করা হচ্ছে, কাকে পথে নামিয়ে দেয়া হচ্ছে তা কিন্তু অগোচরে রয়ে যাচ্ছে। ফলে দেশের কোন অংশ লাভবান হচ্ছে, কোন অংশ ধ্বংস হচ্ছে তার হিসাব কোনো দলই কখনোই দেয়নি, দিচ্ছে না।
দেশ কি আসলেই এমন চলার কথা ছিল? ’৪৭-এর আগের সব কিছুর জন্য ইংরেজরা দায়ী, ’৭১-এর আগের সব অপশক্তি বা অপকর্মের জন্য পাকবাহিনী দায়ী, তাহলে স্বাধীনতার পরের এই ৪৭ বছরের সব ‘অ’-এর জন্য আমরা নতুন প্রজন্ম কাকে দায়ী করব? মায়ের কোল থেকে শুরু করে ৭০ বছর বয়সী কেউই নিরাপদ নয়, শুধু নারী বা কন্যাসন্তান হয়েছে বলে। দেশের কোথাও কোথাও গাছ উপড়ে ফেলছে; চুরি করে হাওয়া করে দিচ্ছে। অথচ সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষ কোথাও গাছের একটি পাতা ছিঁড়েই জেল খাটছেন, নির্যাতিত হচ্ছেন, এমনকি প্রাণও হারাচ্ছেন। এই ভিন্ন ব্যবস্থার জন্য আমরা কাকে দায়ী করব, সমাজকে নাকি আমাদের নেতৃত্বে থাকা লোকদের। কেউ ঘুণপোকার মতো খেয়ে ফেলছে না তো আমার দেশকে, ঐতিহ্যকে, আমাদের সংস্কৃতিকে। হ
লেখক : প্রাবন্ধিক