বাংলাদেশে পোলট্রি শিল্পের ব্যবসায় নিয়োজিত বিদেশী কোম্পানিগুলোর দৌরাত্ম্যে বিপাকে পড়েছে দেশীয় পোলট্রি শিল্প। বর্তমানে সাতটি বিদেশী কোম্পানি সরকারের অনুমতি নিয়ে বাংলাদেশে পোলট্রি শিল্প ব্যবসায় চালু করেছে। সুস্পষ্ট নীতিমালা না থাকার সুযোগে বিদেশী বিনিয়োগকারীরা পোলট্রি শিল্পে কর্তৃত্ব ও আধিপত্য বিস্তার করছে। বিদেশী কোম্পানিগুলো ৩ শতাংশ সুদে ব্যাংকঋণে ব্যবসার সুযোগ পেলেও দেশীয় ব্যবসায়ীরা ১২ থেকে ১৩ শতাংশ সুদে ঋণ নিয়ে ব্যবসায় করছেন। তবে ব্যাংকঋণের সুবিধাও পাচ্ছে কেবল বড় বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠান। আর ঋণসুবিধা না পেয়ে অনেক ক্ষুদ্র ও মাঝারি খামার এরই মধ্যে বন্ধ হয়ে গেছে। আরো অনেকগুলো বন্ধ হওয়ার পথে।
বাংলাদেশ পোলট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ সেন্ট্রাল কাউন্সিল (বিপিআইসিসি) বলছে, বাংলাদেশের পোলট্রি ব্যবসার ৪০ শতাংশ ইতোমধ্যে বিদেশী সাতটি কোম্পানির নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে। বিদেশী সাতটি কোম্পানি হলো ভিএইচ গ্রুপ, গোদরেজ, সেগুনা, টাটা, অমৃত গ্রুপ, সিপি এবং নিউ হোপ। কোম্পানিগুলোর কেউ বাচ্চা উৎপাদন, ডিম উৎপাদন কিংবা মুরগি উৎপাদনের অনুমতি নিয়েছে। কিন্তু দেখা যাচ্ছে, বিদেশী কোম্পানিগুলো বর্তমানে সবই করছে। এ ছাড়া, বিদেশী কোম্পানিগুলো সর্বোচ্চ কী পরিমাণ মুনাফা অর্জন করতে পারবে, মোট লভ্যাংশের কত শতাংশ নিজ দেশে নিয়ে যেতে পারবে এবং কত শতাংশ এ দেশে খরচ কিংবা বিনিয়োগ করতে পারবে; সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো নীতিমালা নেই।
এ অবস্থায় আরো কিছু বিদেশী প্রতিষ্ঠান ব্যবসার জন্য পাইপলাইনে রয়েছে। কয়েক দিন আগেও যেখানে দেশীয় এক লাখ থেকে দেড় লাখ খামারি ছিলেন; বর্তমানে তা ৭০ হাজারে নেমে এসেছে। এ ছাড়া খামারিদের ব্যয়ের ৭০ শাতাংশই যায় পোলট্রি ফিডে, যা বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। এই আমদানিতে ট্যাক্স ফ্রি সুবিধা না পাওয়ায় আরো বিপাকে রয়েছে পোলট্রি শিল্প। অপর দিকে লাইভ স্টোক ডিপার্টমেন্ট থেকে অনুমতি না নিয়ে বোর্ড অব ইনভেস্টমেন্ট থেকে অনুমতি নিয়ে বিদেশী প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যবসায় করছে। বিদেশী কোম্পানিগুলোর সাথে প্রতিযোগিতা করার মতো অর্থনৈতিক সামর্থ্য দেশীয় প্রতিষ্ঠানের নেই। বিশেষ করে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা এবং ব্যক্তিপর্যায়ের খামারিরা তাদের খামার লোকসান দিয়ে গুটিয়ে নিতে বাধ্য হবেন।
একাধিক ব্যবসায়ী অভিযোগ করে বলেন, এই শিল্পে অভিভাবক শূন্য হয়ে পড়েছে। কারণ, আজ পর্যন্ত এ শিল্পে কোনো অনুষ্ঠানে মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীকে পাওয়া যায়নি। ২০০৮ সালে প্রণীত নীতিমালা পোলট্রিকে প্রাণিজ কৃষি খাত ঘোষণা দিয়ে এ শিল্পে শস্য খাতের সমান সুবিধা দেয়ার কথা বলা হয়, যা কাগজ-কলমে সীমাবদ্ধ রয়েছে। অথচ দেশের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টিতে অবদান রাখছেন দেশীয় খামারিরা। পোলট্রি শিল্পকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে লিংকেজ শিল্পÑ কাঁচামাল, ওষুধ প্রস্তুতকারী ও সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান। জাতীয় অর্থনীতিতে পোলট্রি শিল্পের অবদান প্রায় ২ দশমিক ৪ শতাংশ।
মুনাফা কম, খাদ্যপণ্য এবং ওষুধের দাম বৃদ্ধি, আড়তদারদের হাতে ডিমের বাজার জিম্মি হওয়া ও ব্যাংকঋণের অপ্রতুলতাসহ নানা কারণে বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে সম্ভাবনাময় পোলট্রি শিল্প। এ পেশায় জড়িত খামারিদের অনেকেই বর্তমানে বিকল্প ব্যবসার সন্ধান করছেন। যারা কোনো মতে টিকে আছেন, তারাও কয়েক বছর ধরে লাভের মুখ দেখছেন না। আবার অনেকে বড় ধরনের অর্থনৈতিক ক্ষতির মুখে পড়ার ভয়ে হঠাৎ করে খামার বন্ধ করতেও পারছেন না। হ