বড় দলগুলোর কেউ কেউ তাদের নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করেছে। আবার কেউ কেউ তাদের ইশতেহারে যুগোপযোগী ও উন্নয়নমুখী চিন্তাধারার অংশ হিসেবে বিভিন্ন পরিকল্পনাকে নিয়ে এখনো বিশ্লেষণ করছেন। সবারই চিন্তা ভোটারদের আকৃষ্ট করতে চমকপ্রদ সব পরিকল্পনা ও প্রতিশ্রুতি কিভাবে ইশতেহারে যুক্ত করা যায়। বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয় এমন লোক দেখানো বা অযৌক্তিক ইশতেহার তৈরি করা যাবে না, যা অতীতেও জাতি দেখেছে। ইশতেহারে কোনো একক শ্রেণীর স্বার্থকে প্রাধান্য নয় বরং আপামর জনগণের সব শ্রেণীকেই আমলে নিতে হবে। বলা হয়ে থাকে দেশের ভবিষ্যৎ কর্ণধার ও নতুন সমৃদ্ধ এবং আধুনিক দেশ গড়ার হাতিয়ার তরুণ প্রজন্মকে। জাতিসঙ্ঘের প্রণীত এসডিজি বাস্তবায়নের ব্যাঘাত না ঘটাতে এই তরুণদের দাবি-দাওয়াগুলো যেকোনো নতুন সরকারকে আমলে নিতেই হবে। গত কয়েক দশকের মধ্যে দেশে এবারের নির্বাচনেই সবচেয়ে বেশি তরুণ ও শিক্ষিত ভোটার রয়েছে। সব ইশতেহারে তরুণদের স্বার্থ কতটুকু নিহিত থাকবে আর কতটুকুইবা বাস্তবায়িত হবে তাই চিন্তার বিষয়!
দেখা গেছে, গত দুই আমলে অর্থাৎ নবম ও দশম জাতীয় নির্বাচনে আওয়ামী লীগকে সরকার গঠনে তরুণরাই বেশি সহায়তা করেছে। আবার এই ক্ষমতাসীন সরকারের কাছে বেশ কিছু ন্যায্য ও যৌক্তিক দাবি নিয়ে এসব তরুণই মাঠপর্যায়ে লাঞ্ছিত ও বঞ্চিত হয়েছেন বেশি। সাম্প্রতিককালের শিক্ষিত তরুণদের বেশ কয়েকটা সংগঠনের বিভিন্ন যৌক্তিক আন্দোলনের ফলাফলই সেই চিত্র বহন করছে। তরুণদেরকে বিভিন্ন প্রতিশ্রুতি দিলেও তার বাস্তবায়ন করা হয়নি। ক্ষমতাসীন দলের অতীত নির্বাচনী ইশতেহারে চোখ রাখলেই সেটা বেরিয়ে আসবে। দুই আমলে হয়তো দেশে বেশ কয়েকটা সূচকে উন্নয়ন হয়েছে কিন্তু তরুণদের ভাগ্যোন্নয়নে কি আঙ্গুল তুলে কথা বলার মতো এতটুকু পরিবর্তন হয়েছে? আমরা দেখেছি সরকারপ্রধান সব সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনা শেষ করা তরুণদের চেয়ে কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে, পড়ুয়া তরুণদের অপেক্ষাকৃত বেশি গুরুত্ব দিয়ে থাকেন। যার জ্বলন্ত প্রমাণ চাকরি ক্ষেত্রে প্রবেশে সীমিত সুযোগ অতিবাহিত হওয়ার পরই এরা রীতিমতো সরকারের কাছে অবহেলার পাত্রে পরিণত হয়েছেন আর নানা রকম অবজ্ঞাসূচক কথা শুনেছেন। তবে তরুণরা এবার আর শুধু ক্ষমতাসীন দল বা অন্যান্য দলের চমকপ্রদ ইশতেহারে আকৃষ্ট হবেন না বরং ক্ষমতায় এসেই সর্বপ্রথম তার বাস্তবায়ন করা হবে এমনই ওয়াদা জাতির কাছে করতে হবে।
তারা চান ক্ষমতায় এসেই সব না পারলেও অন্তত তালিকার উপরের দিকের সাম্প্রতিককালের আলোচিত ও রীতিমতো যৌক্তিক কয়েকটি দাবির দ্রুতই যেন বাস্তবায়ন করার প্রতিজ্ঞা করা হয়। উল্লেখযোগ্য কয়েকটি দাবি নি¤œরূপÑ
হ চাকরিতে প্রবেশের বয়স কমপক্ষে ৩৮ থেকে ৪০ বছর বা সবার জন্য অভিন্ন বয়সসীমা নির্ধারণ করতে হবে। (একমাত্র জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট চাকরিতে প্রবেশে পুলিশ ও সেনাবাহিনী ছাড়া সবার জন্য কোনো বয়সসীমা রাখেনি। যা তরুণদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে) মেধা, যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে কোনো কোনো ক্ষেত্রে অবারিত করে দিতে হবে।
হ কোটা বাতিল নয় বরং সব ক্ষেত্রে এর যৌক্তিক সংস্কার করতে হবে।
হ এনটিআরসিএ এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উদাসীনতার কারণে দীর্ঘদিন ধরে নিবন্ধনধারীদের নিয়োগ বন্ধ রয়েছে। হতাশায় পথে পথে ঘোরা ৭০ থেকে ৮০ হাজার শিক্ষককে দ্রুতই নিয়োগের ব্যবস্থা করতে হবে। যেকোনো পদ শূন্য হওয়ার তিন মাসের মধ্যেই নিয়োগ দিতে হবে।
হ চার কোটি ৮২ লাখ ৮০ হাজার (বিবিএস প্রতিবেদন ২০১৬-২০১৭) শিক্ষিত বেকারের জন্য সরকারি উদ্যোগে বেকার গবেষণাগার বা বেকার কল্যাণ ফাউন্ডেশন মন্ত্রণালয় গঠন করতে হবে।
হ বাজেটে বেকারদের জন্য আলাদা বরাদ্দ থাকতে হবে।
হ ‘চাকরি চাই না, চাকরি দেই’ এই স্লোগান বুকে ধরে দেশব্যাপী তরুণ বেকার উদ্যোক্তাদের শনাক্ত করে বেকার কল্যাণ ফাউন্ডেশন মন্ত্রণালয়ের নিয়ন্ত্রণে প্রত্যক্ষ পৃষ্ঠপোষকতা দিতে হবে।
হ দেশের সব নিয়োগ পরীক্ষার আবেদন অনলাইনভিত্তিক হবে ও ফি-মুক্ত হতে হবে। সব নিয়োগ পরীক্ষা লিখিত আকারে হবে। মূল মার্কসের শতকরা ১০ ভাগ ভাইভাতে থাকতে হবে। একই সময়ে এবং একই দিনে একাধিক নিয়োগ পরীক্ষা নেয়া যাবে না। নিয়োগ পরীক্ষা বিকেন্দ্রীকরণ অর্থাৎ জেলা বা বিভাগীয়ভিত্তিক হতে হবে।
হ প্রতি বছর ছাত্র সংসদ নির্বাচন দিতে হবে।
হ প্রশ্নপত্র ফাঁসবিরোধী সেল গঠন করতে হবে।
হ নিয়োগের স্বচ্ছতা নিশ্চিতকরণে প্রিলিমিনারি, লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষার নম্বরসহ ফলাফল প্রকাশ করা। বিসিএস পরীক্ষার মৌখিক নম্বর কমিয়ে সর্বোচ্চ ৫০ নির্ধারণ করা।
হ শিক্ষার হার বাড়ানোর চেয়ে শিক্ষার গুণগত মানের উৎকর্ষ সাধনে সচেষ্ট হতে হবে এবং কর্মমুখী শিক্ষার ব্যাপক প্রসার ঘটাতে হবে।
হ নিয়োগবাণিজ্যের দৌরাত্ম্যে মেধাবীরা আজ দিশেহারা। এর রোধকল্পে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে।
এতসব দাবি আমলে নিয়ে নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করা যেকোনো দলের ক্ষেত্রেই কঠিন। কারণ ইশতেহারে যুক্ত করে সে অনুযায়ী তো কাজও করতে হবে। তাই যেকোনো দলেরই উচিত তাদের পূর্ণাঙ্গ ইশতেহারে দেশের জনগণের অন্যান্য শ্রেণীর সুযোগ-সুবিধার কথা মাথায় রাখার পাশাপাশি শিক্ষিত ও বেকার তরুণদের যাবতীয় যৌক্তিক দাবিগুলোকে সঠিকভাবে বিশ্লেষণ ও বিবেচনা করে তাদের ইশতেহার যুক্ত করা। হ
লেখক : প্রকৌশলী
nazmulhussen@yahoo.com