বিভিন্ন টিভি চ্যানেলের টকশোতে জামায়াত ও লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিয়ে আলোচনার ঝড় বইছে। তবে বেশি প্রাধান্য পেয়েছে জামায়াত ইস্যু। নিজে একাত্তর প্রজন্মের মানুষ হওয়ায় একাত্তরে তাদের প্রত্যক্ষ ভূমিকা দেখার সুযোগ হয়নি। যতটুকু জেনেছি, মুসলিম লীগ, চীনপন্থী কমিউনিস্ট পার্টি তারাও স্বাধীনতাবিরোধী। তাদের নিয়ে আলোচকদের পেরেশানি নেই কেন? এ সরকারের টানা ১০ বছরে জামায়াতের ওপর যে নির্যাতন দেশবাসী দেখেছে; অন্য কোনো রাজনৈতিক দলের ওপর তা করা হলে সেই দলকে মাইক্রোস্কোপ দিয়ে খুঁজতে হতো। এত কিছুর পরও জামায়াত আসন্ন সংসদ নির্বাচনে ২৫টি আসন! এ জন্য আওয়ামী ঘরানার লোকদের মধ্যে সাঙ্ঘাতিক অস্থিরতা দেখা যাচ্ছে। তদুপরি তারা মানতেই নারাজ যে, জামায়াতের মধ্যে কোনো মুক্তিযোদ্ধা আছেন। গত ৩০ নভেম্বর একটি টিভি চ্যানেলে রাতের টকশোতে চাঁদপুর থেকে একজন প্রভাষক এক আলোচককে প্রশ্ন করেছিলেন (সম্ভবত) : ‘দেশের মানুষের বিশ্বাস, কর্ম ও আচরণে যেভাবে ধর্ম জড়িত হয়ে আছে, সে ক্ষেত্রে রাজনীতিতে কি তার প্রভাব পড়ে না।’ উত্তরে শ্যামল দত্ত বলেছিলেন, ‘ধর্ম ব্যক্তিগত লালনের ব্যাপার। রাজনীতির মধ্যে ধর্মকে আনা যাবে না।’ তিনি ভিন্ন ধর্মের লোক। তাই এমন উত্তর হওয়াই স্বাভাবিক। ইসলাম একটি পরিপূর্ণ জীবনব্যবস্থার নাম। এটা পৃথিবীর সব মানুষের অনুসরণযোগ্য ধর্ম। সমাজ, রাষ্ট্র কিংবা জীবন সঙ্কটের এমন কোনো দিক নেই, যেখানে ইসলামের দিকনির্দেশনা নেই। চুরি, ব্যভিচার, হত্যা, সুদ, ব্যবসা, ভূমি বণ্টন, অমুসলিম বা সংখ্যালঘুদের সাথে সম্পর্ক, নারীর অধিকার, দেশপ্রেম, পারস্পরিক সম্পর্ক ও ভ্রাতৃত্ব, কী নেই ইসলামে? ইসলামে রাজনীতিবিদ ও সরকারের জন্য রয়েছে উত্তম পরামর্শ এবং সর্বোত্তম দিকনির্দেশনা। আওয়ামী লীগের কাছে জামায়াত ছিল একসময় ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক দল। কেয়ারটেকার সরকার ইস্যুতে আন্দোলনের সময় উভয়ের নেতাদের মধ্যে কি দহরম-মহরম। এক টেবিলে বসে চা খাওয়া, মিছিল-মিটিংসহ কত কর্মকাণ্ড। আওয়ামী লীগের মনোনীত রাষ্ট্রপতি পদপ্রার্থীর পক্ষে সমর্থন লাভের জন্য অধ্যাপক গোলাম আযমের দোয়া কামনা। জামায়াত তখন ‘যুদ্ধাপরাধী’ ছিল না? আওয়ামী লীগ ও বিএনপির ভোটের ব্যবধান খুব বেশি নয়। তৃতীয় পক্ষ জামায়াত যেদিকে থাকবে, তার জয়ের সম্ভাবনা সাধারণত বেশি। জামায়াতের ভোট এদিক ওদিক হবে না। যেহেতু জামায়াত আছে, বিএনপির নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটে, এ জন্যই সরকার ও তার অনুসারীদের সব আঘাত জামায়াতের ওপর। গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে বিশ্বাস ও মতের পার্থক্য থাকাই স্বাভাবিক। যখন থাকে না, তখন সেটাকে আর গণতন্ত্র বলা যায় না। মানুষকে ভালোবাসলে কাছে পাওয়া যায়। ক্ষমতায় থেকে জোর করে, জুলুম-নির্যাতন করে, মামলা-হামলা দিয়ে সাময়িক তৃপ্তি ও বিজয়ের স্বাদ পাওয়া গেলেও সেই বিজয় মানবিক মূল্যবোধ বিহীন। যে সংসদে জনগণের ম্যান্ডেট নেই, সেই সংসদের সদস্যরা নিজেদের মনমতো আইন তৈরি করে, বিরোধী নেতাকর্মীদের জেলে রেখে, সাজানো নির্বাচন কমিশন দিয়ে ভোট করার উদ্দেশ্য জনগণ বোঝে। হোম গ্রাউন্ডে ক্রিকেট খেলা, তারপর আম্পায়ার যদি নিজের হয়; তা হলে ফলাফল অনুকূলই হয়। আজ যদি বিএনপি ক্ষমতায় থেকে এভাবে নির্বাচন করত, আওয়ামী লীগ কি সেই নির্বাচনে অংশ নিতো? আজকে রাষ্ট্রের অর্থে পালিত পুলিশ দলবাজি করছে। যে জনগণের ট্যাক্স-ভ্যাটে চলছে রাষ্ট্র, রাষ্ট্রের পুলিশকে সরকার সেই জনগণের বিপক্ষে দাঁড় করিয়েছে। বিগত ১০ বছরে পুলিশ আওয়ামী লীগের কয়জনের নামে কয়টি মামলা করেছে, কতজনকে গ্রেফতার করেছে, তাদের কয়জন গুম হয়েছেন? ভিন্ন মতের মানুষ দেখলেই পুলিশ ‘নাশকতার’ গন্ধ পায়! পুলিশ বিভাগের সুনাম দলবাজি পুলিশের কারণে আজ তলানিতে। আর কয়দিন পরই বহু প্রতীক্ষিত সংসদ নির্বাচন। কিন্তু থেমে নেই বিরোধী দলের প্রার্থী, পোলিং এজেন্ট, নেতাকর্মী, ভোটার এবং দেশপ্রেমিক সুশীলসমাজের বিরুদ্ধে পুলিশি মামলা-হামলা, গ্রেফতার ও হয়রানি। কোনোভাবে কি এটাকে সমতল খেলার মাঠ (লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড) বলা যায়? হ
pkcppi98@gmail.com