এ কথা সত্য, বাংলাদেশের উপকূলের মাটিতে লবণাক্ততা বাড়ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ছে। ফলে দেশের উপকূলীয় অঞ্চলে ঘন ঘন নোনা পানির প্লাবন মাটিতে লবণাক্ততা বাড়িয়ে দিচ্ছে। লবণাক্ততার প্রভাবে সাতক্ষীরা, খুলনা, বাগেরহাট, ভোলা, বরগুনা, পটুয়াখালীসহ দক্ষিণাঞ্চলের অন্য জেলাগুলোতে চাষাবাদে সমস্যা, সুপেয় পানির সঙ্কট ও জীবনযাত্রার ক্ষেত্রে নানা সমস্যার মুখামুখি হতে হচ্ছে। লবণাক্ততার কারণে কৃষিজমিতে ফলন কম হচ্ছে। কোনো ক্ষেত্রে জমি চাষাবাদের অনুপযোগী হয়ে পড়ছে! আবাদি জমির পরিমাণ কমে যাচ্ছে। লবণাক্ততা বেড়ে যাওয়ায় উপকূল অঞ্চলে সুপেয় পানির তীব্র সঙ্কট দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে শুষ্ক মওসুমে সুপেয় পানির সঙ্কট ভয়াবহ আকার ধারণ করে। এ ছাড়া নিরূপায় হয়ে লবণ পানি খাওয়ার কারণে শরীরে চুলকানি, চর্মরোগসহ নানাবিধ অসুখ দেখা দিচ্ছে। মূলত ঘূর্ণিঝড় সিডর, আইলার পর থেকে লবণাক্ততার পরিমাণ বেড়েই চলেছে। লবণাক্ততার কারণে উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষের জীবন-জীবিকার ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। অনেকে দীর্ঘদিনের পেশা বদল করতে বাধ্য হচ্ছেন। অনেক পরিবার প্রতিকূল পরিবেশের অভিযোজনে টিকতে না পেরে বাপ-দাদার ভিটে ছেড়ে বা বিক্রি করে দূরে পাড়ি জমাচ্ছেন (বিশেষ করে শহরে চলে যাচ্ছেন)। সহজ কথায়, লবণাক্ততার কারণে উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষ কর্মহীন বাস্তবতার মুখোমুখি হচ্ছেন। জমিতে লবণাক্ততা বেড়ে যাওয়ায় বা বিভিন্ন কারণে ফসলি জমি কমে যাওয়ায় দক্ষিণাঞ্চলের মানুষ এখন কাঁকড়া ও চিংড়ি চাষে ঝুঁকছেন।
দেশের দক্ষিণাঞ্চল থেকে অভিবাসনের হার আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় অনেক বেড়েছে। লবণাক্ততার কারণে উপকূলে অবস্থিত পৃথিবীর সবচেয়ে বড় জলকাদার বন সুন্দরবনের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। সম্প্রতি এক গবেষণার তথ্য মতে, সুন্দরবনের শিবসা, পশুর নদসহ অন্যান্য নদ-নদী ও খালে লবণাক্ততার পরিমাণ বাড়ছে। তথ্য মতে, সুন্দরবন এলাকায় প্রতি বছর লবণাক্ততা বাড়ছে প্রায় দুই পিপিটি বা পার্টস পার ট্রিলিয়ন হারে। লবণাক্ততার ফলে বিরূপ প্রভাব পড়েছে মিঠা পানির মাছের ওপর। গবেষণায় বলা হয়েছে, মারাত্মক ঝুঁকিতে রয়েছে সুন্দরবনের প্রায় ২৭ প্রজাতির মাছ। কেননা, এই ২৭ প্রজাতির মাছ শূন্য থেকে পাঁচ পিপিটি পর্যন্ত লবণাক্ততা সহ্য করতে পারে। ইতোমধ্যে খুলনা ও বাগেরহাটের নদী-নালা-খাল-বিল থেকে মিঠা বা স্বাদু পানির অনেক মাছ হারিয়ে গেছে। সুন্দরবন ও চারপাশের এলাকায় লবণাক্ততার পরিমাণ যত বাড়বে বনের প্রতিবেশ ব্যববস্থার ওপর তার বিরূপ প্রভাব পড়বে। নদ-নদীগুলোর প্রবাহ কমে আসার ফলে নিম্নমুখিতার দিকে লবণাক্ততা উঠে আসছে। লবণপানি আটকে চিংড়ি ও কাঁকড়া চাষ করার ফলেও লবণাক্ততা বেড়ে যাচ্ছে।
সুন্দরবনকে সুন্দরবনের মতো থাকতে দেয়া হচ্ছে না! বনের চারপাশে নতুন নতুন বসতি ও আবাসন প্রকল্প গড়ে তোলা হচ্ছে। বিভিন্নভাবে সুন্দরবনের এই নদী-খালগুলোকে বিষাক্ত করে তোলা হচ্ছে। নদী-খালের মুখ বন্ধ করে বিষ প্রয়োগের মাধ্যমে মাছ ধরা হচ্ছে! সুন্দরবনের অস্তিত্ব রক্ষার সাথে নদী-খাল আর জীববৈচিত্র্যের ব্যাপক ভূমিকা রয়েছে। কিন্তু সুন্দরবন ও আশপাশের পরিবেশের ওপর লবণাক্ততার প্রভাব এবং প্রকৃতি-প্রতিবেশবিনাশী বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের ফলে বনের জীববৈচিত্র্য আজ হুমকির মুখোমুখি। সুন্দরবনে প্রায় ১৬৭ প্রজাতির বেশি উদ্ভিদ-প্রাণী রয়েছে। সুন্দরবন প্রাকৃতিক সম্পদের আধার ও জলবায়ু দুর্যোগে উপকূলীয় অঞ্চলের রক্ষা দেয়াল। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলসহ সমগ্র দেশের পরিবেশ-প্রতিবেশসহ উপকূলের লক্ষ-কোটি মানুষের জীবন-জীবিকা সুন্দরবনের সাথে জড়িত। সুন্দরবন অক্সিজেনেরও বিশাল আধার। সুন্দরবনের গুরুত্ব বলে শেষ করা যাবে না। সুন্দরবন বাঁচলে বাংলাদেশ বাঁচবে। তবে সুন্দরবন রক্ষায় আসলে কি উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে? এখনই উদ্যোগ না নিলে লবণাক্ততার কারণে সুন্দরবনে ডলফিনসহ অনেক জলজ প্রাণী টিকে থাকতে পারবে না (কেননা ভিন্ন ভিন্ন প্রাণী ও উদ্ভিদ ভিন্ন ভিন্ন লবণাক্ততা ও তাপমাত্রা সহ্য করতে পারে)। সুন্দরবনে বাঘ ও হরিণের সংখ্যা প্রতি বছর কমছে। বন রক্ষার স্বার্থে বাঘ ও হরিণ রক্ষা জরুরি হয়ে পড়েছে।
বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবে ভুগতে থাকা প্রথম সারির দেশগুলোর একটি। তাই জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবেলায় বাংলাদেশকে নিজেদের মতো করে প্রস্তুতি নেয়ার পাশাপাশি দায়ী রাষ্ট্রগুলোর কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ আদায়ে সচেষ্ট হতে হবে। উপকূলীয় অঞ্চলে সবুজ বেষ্টনী বাড়াতে হবে। শুধু উপকূলীয় জেলাগুলোকে ঘিরে পরিবেশবান্ধব বেশি বেশি প্রকল্প গ্রহণ করতে হবে। মনে রাখতে হবে, দ্বিতীয় সুন্দরবন তৈরি করা যাবে না। তাই সুন্দরবন রক্ষায় উপকূলে লবণাক্ততা নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থাসহ সুন্দরবনের আশপাশ থেকে দূষণ সৃষ্টিকারী শিল্পকারখানা সরিয়ে ফেলতে হবে। হ
