এবার নির্বাচনের এক সপ্তাহ আগে থেকে ক্ষমতাসীন দলের অন্যতম শীর্ষনেতা ওবায়দুল কাদের বলে আসছিলেন, আওয়ামী লীগ জয়ী হবে। নির্বাচনোত্তর সংবাদ সম্মেলনেও তিনি একই মন্তব্য করেছেন। তিনি এটাকে ‘সরকার প্রধানের ম্যাজিক’ বলেছেন। একাদশ সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী হওয়ার বিষয়ে মন্তব্যটি গভীর তাৎপর্য বহন করে। মানুষ যখন কোনো একটি বিষয়ে গভীরভাবে আচ্ছন্ন হয়ে পড়েন, তখন অবচেতন মনেই সেই বিষয়ের ওপর সত্যগুলো উচ্চারণ করতে থাকেন। তারাও অবচেতন মনে সত্যটি হয়তো প্রকাশ করে দিয়েছেন। দেশের ভোটাররাও মনে করছেন, একাদশ সংসদ নির্বাচনের ফলাফল ম্যাজিকের মতো চোখ ধাঁধানো ব্যাপার হয়ে উঠেছে। ফলাফল দেখে মহাজোটের অনেকেই বলছেন, এত লোক তাদেরকে ভোট দেবেন, তারা আগে থেকে তা ভাবতেও পারেননি।
জনগণও এই নির্বাচনের ফলাফলকে ম্যাজিকের মতোই মনে করছেন। অন্য কোনো নির্বাচনের ব্যাপারে ম্যাজিক শব্দটি ব্যবহার করা হয়নি; এ নির্বাচনে তা হয়েছে। নিশ্চয়ই তার একটি কারণ রয়েছে। ম্যাজিকটা কেমন ছিল, সেটা বিশ্লেষণ না করলেও জনসম্মুখে ও রাতের অন্ধকারে যা ঘটেছে, সেগুলোকে ম্যাজিক বলা চলে। নির্বাচনের আগে প্রিজাইডিং ও পোলিং অফিসার নিয়োগের সময় পুলিশ ভেরিফিকেশন; ভোটের আগে ঐক্যফ্রন্টের নেতাকর্মী ও পোলিং এজেন্টদের গ্রেফতার এবং আগের রাতে পুলিশি নির্দেশে বাক্সে ব্যালট ভরা ইত্যাদি এ ক্ষেত্রে উপাদান বলেই মনে হতে পারে।
খবর পাওয়া যাচ্ছে, ৩০ ডিসেম্বর নির্বাচনের আগের রাতে ভোটকেন্দ্রে অবস্থানরত প্রিজাইডিং অফিসারদের অনেককে আইনশৃঙ্খলার দায়িত্বে নিয়োজিত একটি বাহিনীর পক্ষ থেকে বোঝানোর চেষ্টা হয়েছেÑ যে করেই হোক নৌকার পক্ষে ৮০ শতাংশ ভোট কাস্ট করার বা দেখানোর নির্দেশনা রয়েছে। সেই নির্দেশ অগ্রাহ্য করলে ফল কী হতে পারে, সেটা ভেবে নিয়ে রাতে ও দিনে প্রিজাইডিং ও পোলিং অফিসার ও সরকারদলীয় কর্মীরা পুলিশের সহযোগিতা ও উপস্থিতিতে সে মোতাবেক ব্যালট কর্তন করার ব্যবস্থা করেছেন। এই বিশেষ ‘ম্যাজিক’টি বিদেশী ও দেশী পর্যটকদের নজরে পড়ার কথা নয়। এ ছাড়াও নির্বাচনে বেশির ভাগ কেন্দ্রে বেলা ১১টার পর থেকে ভোটাররা যেন আর কেন্দ্রে প্রবেশ করতে না পারে, সেজন্য এক ধরনের কৌশল অবলম্বন করা হয়। এই কৌশলটি হচ্ছেÑ ভোটারদের ভোট নম্বরের স্লিপ সরবরাহ বন্ধ করে দেয়া হয়েছিল। ও দিকে, স্লিপ ব্যতীত কারো ভোট গ্রহণ করা হচ্ছে না বলে ভোটকেন্দ্রে প্রচার করা হয় এবং স্লিপ ব্যতীত ভোট গ্রহণ না করে ভোটারদের ফেরত পাঠানো হয়েছে। এসব ছিল পূর্বপরিকল্পিত। এই ম্যাজিক সংসদ নির্বাচনে ভোটাররা অবাক বিস্ময়ে লক্ষ করেছেন। অন্য দিকে, যে এক কোটি নতুন তরুণ ভোটার রয়েছে তাদের অনেকে ভোটই দিতে পারেননি। চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলন করতে গিয়ে যে তরুণেরা হাতুড়িপেটার শিকার হয়েছেন এবং ‘নিরাপদ সড়ক চাই’ আন্দোলনে অংশ নেয়া যুবকেরা যে হেলমেট বাহিনীর নির্যাতন সহ্য করেছেন, তাদের ভোট যে সরকার পক্ষে পড়তে পারে নাÑ সেটা নিশ্চিত হয়েই এ নির্বাচনে কথিত ম্যাজিকের আশ্রয় নেয়া হয়েছে বলে অনুমিত হয়েছে।
এ নির্বাচনে অনেক মানুষ হত্যার শিকার হয়েছেন। তবুও বলা হচ্ছে, বড় ধরনের অঘটন ছাড়াই নির্বাচন শান্ত পরিবেশে সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হয়েছে। নির্বাচনের কয়েক দিন আগে দুইজন মানুষ খুনের শিকার হলে সিইসি দুঃখ প্রকাশ করে বলেছিলেন, ‘কোনোভাবেই হত্যা কাম্য নয় এবং একটি জীবনের চেয়ে একটি নির্বাচন কখনোই দামি হতে পারে না।’ এ মন্তব্যে মনে করেছিলাম আমাদের সমাজে মূল্যবোধের যে অবক্ষয় রয়েছে, সিইসি হয়তো সেই অবক্ষয় থেকে নিজেকে রক্ষা করতে পেরেছেন। কিন্তু আমাদের ধারণা ভুল হয়ে গেল। তিনি যখন নির্বাচনে ১৭ জন মানুষের মৃত্যুকে ‘বিচ্ছিন্ন’ ঘটনা বলছেনÑ অর্থাৎ তারা নির্বাচনে বড় কোনো সহিংসতা লক্ষ করতে পারেননি, তখন অবাক হতে হয় দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের কাণ্ডজ্ঞান দেখে। হত্যাকাণ্ডের থেকেও বড় কোনো ঘটনা যে হতে পারে, সেটি আজ পর্যন্ত শোনা যায়নি। এটিই মূল্যবোধের অবক্ষয়জনিত কারণ। যেসব মানুষ হত্যাকাণ্ডের চেয়ে বড় কোনো ঘটনা বা সহিংসতা খোঁজেন, তারা রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পেলে রাষ্ট্রকে কোথায় নিয়ে যেতে পারেনÑ তা সহজেই অনুমান করা যেতে পারে। এ নির্বাচনে ২০ জন মানুষের হত্যার দায় নির্বাচন কমিশন কোনোভাবেই এড়াতে পারে না। হ