এই তোর নাম কী? রোজিনা (ছদ্মনাম)। পুরো নাম বলতে পারিস না? বেয়াদব কোথাকার! ক্যাম্পাসে আশা দু’দিন হয়নি; তাতেই পাখনা গজিয়েছে? ছেলেবন্ধু আছে? মেয়েটি মাটির দিকে তাকিয়ে বলেন, না ভাইয়া। বেয়াদব, বড়দের সাথে সম্মান দিয়ে কথা বলতে জানিস না? নিচের দিকে তাকিয়ে আছিস কেন? তুই এখন আমার দিকে তাকিয়ে আমাকে প্রপোজ করবি। যদি না পারিস তোর খবর আছে! বিভাগের সিনিয়রেরা নতুন শিক্ষার্থীদের সাথে কথিত পরিচয়ের নামে এ রকম আচরণ করেন, যা র্যাগিং নামে পরিচিত।
ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের ক্লাসরুমে সম্প্রতি শিক্ষককে বের করে দিয়ে ২০১৩-১৪ শিক্ষাবর্ষের ¯œাতকোত্তর শ্রেণীর শিক্ষার্থীরা প্রথম বর্ষের ছাত্রছাত্রীদের শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। অল্প কয়েকদিন আগে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়কে র্যাগিংমুক্ত ক্যাম্পাস হিসেবে ঘোষণা দেয়ার পরও ক্লাসরুমে নতুন শিক্ষার্থীদের লাঞ্ছনার প্রতিবাদে ফেসবুকে সমালোচনার ঝড় উঠেছে।
ইংরেজি ‘জধম’ শব্দটির অর্থ জ্বালাতন করা। রসিকতার নামে কাউকে অত্যাচার করা। হোক তা মানসিক বা শারীরিক। অনেক শিক্ষার্থী এটি সহ্য করতে না পেরে ক্যাম্পাস ছেড়েছেন। এমন ঘটনা অনেক। র্যাগিংয়ের শিকার হয়ে আত্মহত্যার নজিরও রয়েছে আমাদের দেশে।
র্যাগিংকে অনেকে মজা, আদব-কায়দা শেখানো, সিনিয়র-জুনিয়র গভীর সম্পর্ক উন্নয়ন, বাস্তবতার সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়ে মানসিকভাবে শক্ত করে গড়ে তোলা ইত্যাদি নামে প্রচারণা করে থাকেন। কিন্তু এটি কোনো সম্পর্ক উন্নয়নের মাধ্যম হতে পারে না। র্যাগিং এখন বিকৃত ও অমানবিক নির্যাতনের নাম। এত লেখালেখি আর সংবাদ প্রচারের পরেও দেশে এখনো র্যাগিং প্রতিরোধে সুনির্দিষ্ট কোনো আইন কিংবা শাস্তিমূলক ব্যবস্থার বিধান নেই।
দেশের বেশির ভাগ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে র্যাগিংয়ের মাধ্যমে নিপীড়ন চলে। ভয়ে ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীরা তা স্বীকার করেন না। কারণ, র্যাগিংয়ে মানসিক-শারীরিক নির্যাতনের শিকার শিক্ষার্থীদের শাসিয়ে দেয়া হয়, এ ঘটনা প্রকাশ করলে এর চেয়েও ভয়াবহ পরিণতি ভোগ করতে হবে। তাই বাধ্য হয়ে অনেকে র্যাগিংকে বিশ্ববিদ্যালয়ের রীতি হিসেবে মেনে নেন। অন্য দিকে, এটা বন্ধে ছাত্র রাজনীতির দাপটে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন কোনো প্রতিকারমূলক ব্যবস্থাও নিতে পারছে না। ব্যবস্থা নেয়ার জন্য মাঝে মধ্যে তদন্ত কমিটি গঠন করা হলেও অদৃশ্য কোনো শক্তির ইশারায় কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেয়ার নজির নেই।
উচ্চশিক্ষা গ্রহণে দেশের নানা প্রান্তের শিক্ষার্থীরা ভর্তি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েই পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় জীবন শুরু করে থাকেন। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে প্রথমেই যে আতঙ্ক বিরাজ করে তাÑ কথিত সম্পর্ক উন্নয়নের নামে র্যাগিং।
দেশের বেশির ভাগ বিশ্ববিদ্যালয়ে র্যাগিং নিষিদ্ধ হলেও এ অপরাধে যারা জড়িত তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হওয়ায় ক্যাম্পাসে এটি বন্ধ হচ্ছে না। সবচেয়ে অবাক লাগে তখনই, যখন র্যাগ দেয়া কথিত বড় ভাইটি তার কুকর্ম বুক ফুলিয়ে বর্ণনা করেন।
সময় এসেছ ঘুরে দাঁড়ানোর। দেশের প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে র্যাগিং-বিরোধী আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। ভর্তিযুদ্ধে বিজয়ী মেধাবীদের স্বপ্ন পূরণে কেউ যেন বাধা হয়ে দাঁড়াতে না পারেÑ সেদিকে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হবে।
বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের উচিতÑ অপরাধীকে শুধু অপরাধের দৃষ্টিতে দেখা, রাজনৈতিক শক্তির কাছে মাথা নত না করা এবং শিক্ষার্থীর কৃতকর্মের শাস্তি নিশ্চিত করা। মনে রাখা দরকার, র্যাগিংমুক্ত ক্যাম্পাস ঘোষণা আর প্রচারের মাধ্যমেই এটি বন্ধ করা সম্ভব নয়। এ জন্য চাই, এই অপরাধে জড়িতদের দুষ্টান্তমূলক শাস্তি। তবেই র্যাগিং নামক অপকর্মটি বন্ধ হতে পারে। হ
লেখক : শিক্ষার্থী,
ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া