দক্ষ জনশক্তির অভাবে আমাদের দেশে বেসরকারি খাতে, বিশেষ করে পোশাক শিল্পে বেশি বেতনের পদগুলোতে বিদেশীদের নিয়োগ দেয়া হয়ে থাকে। অথচ দেশের হাজার হাজার শিক্ষিত তরুণ-তরুণী হন্যে হয়ে চাকরি খুঁজছেন। অন্য দিকে এ কথাও শোনা যায়, দেশের শিক্ষার মান দিন দিন নিম্নগামী। এমন খবরে দেশের সচেতন নাগরিকেরা হতাশ না হয়ে পারেন না। এ প্রেক্ষাপটে তারা হতাশা ব্যক্ত করে বলে থাকেন, তাহলে স্বাধীনতার ৪৮ বছরে যারা দেশের শিক্ষাব্যবস্থা পরিচালনা করলেন, তাদের পরিশ্রমের ফল কী দাঁড়াল?
বাংলাদেশ পোশাক রফতানি করে এবং বিদেশে শ্রমিক পাঠিয়ে প্রবাসী আয় আসতে শুরু হয় বিগত শতাব্দীর আশির দশকের শুরুতে। রফতানিমুখী এ বৃহৎ শিল্প টিকিয়ে রাখতে কী ধরনের মানবসম্পদের প্রয়োজন এর একটি আগাম পর্যবেক্ষণ প্রয়োজন ছিল। জানা প্রয়োজন ছিল, দক্ষ জনশক্তির যোগান দেশ থেকে দেয়া যায় কিভাবে। আর তা কী প্রক্রিয়ায়। এ নিয়ে ফলপ্রসূ গবেষণার প্রয়োজন ছিল। এ ধরনের কোনো গবেষণা বা পর্যবেক্ষণ হয়েছে বলে আমাদের জানা নেই। হলে হয়তো প্রয়োজনমাফিক দক্ষ জনশক্তি তৈরিতে কর্মমুখী শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব হতো। সেই সাথে কোন ধরনের শিক্ষাব্যবস্থা আগামীতে দরকার হতে পারে তার ব্যবস্থা করাও হয়তো সহজ হতে পারত। তা হলে পোশাক শিল্পের চাহিদামাফিক দক্ষ জনশক্তি দেশ থেকেই সংগ্রহ করা যেত। একই সাথে অতিরিক্ত জনশক্তি বিদেশে পাঠিয়ে আরো বেশি বৈদেশিক মুদ্রা দেশে আনা সম্ভব হতো। কিন্তু এর কোনোটিই হয়নি। হচ্ছে না। কর্মমুখী শিক্ষা ও নিজেদের প্রয়োজনীয় দক্ষ জনশক্তি তৈরির উপযুক্ত পাঠক্রম তৈরিতে শিক্ষাব্যবস্থার পরিবর্তন যে দরকার, এ বিষয়ে অনেক দিন থেকে বিভিন্ন মহল বলে আসছে।
অথচ স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশে কর্মমুখী শিক্ষাব্যবস্থা প্রবর্তনে আমরা কতটুকু এগিয়েছি, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। এভাবে আর কত দিন।
বিদেশে দক্ষ শ্রমিকের চাহিদা রয়েছে। চাহিদামতো দক্ষতা অর্জন করতে একজন শ্রমিককে নতুন করে প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটে ভর্তি হতে হচ্ছে। নতুন করে যদি প্রশিক্ষণই নিতে হয়; তাহলে এসএসসি-এইচএসসি কিংবা স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখাপড়ার ফল কী দাঁড়াল? এ যেন মেরামত করে একটি অচল জিনিস সচল রাখার মতো। এ ছাড়া দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের লক্ষ্যে কাজ করার চেতনা সৃষ্টি হচ্ছে না আমাদের প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থায়, শুধু গুণগত শিক্ষার অভাবে আর শিক্ষার মান কমে যাওয়ায়। যদি মানসম্মত শিক্ষার প্রচলন থাকত, তবে এর মাধ্যমে নীতিনির্ধারকেরা হয়তো তাদের চেতনার সংস্কার করতে পারতেন।
প্রচলিত শিক্ষা সনদ জমা দিয়ে চাকরি নেয়া ছাড়া বেশির ভাগ শিক্ষিত লোক নিজের ঘরের প্রয়োজনীয় কাজও ভালোমতো করতে পারেন না। প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থায় যেমন দক্ষ ও যোগ্যতাসম্পন্ন কর্মী সৃষ্টি করা যাচ্ছে না, তেমনি নিজের কাজ নিজে করার মতো লোকও গড়ে তোলা সম্ভব হচ্ছে না। দুনিয়ার বহু দেশে প্রাথমিক শিক্ষায় সংযুক্ত আছে একজন শিশুশিক্ষার্থী কী কী করবে আর কোন কোন কাজ থেকে বিরত থাকবে; ওই বিষয়ে পাঠ্যসূচিতে স্পষ্ট করে বলা রয়েছে। অর্থাৎ শিশুকে ছোটবেলা থেকে শেখানো হয়Ñ কোন কাজ করতে হবে আর কোন কাজ করা যাবে না। এ শিক্ষা একটি শিশু তার স্কুল থেকেই পেয়ে থাকে। বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় ছাত্রছাত্রীদের এসব শিক্ষা যথাযথভাবে দিতে পারেনি বলেই এখানে অনিয়মের চর্চা চলে অবলীলায়। তাই জীবনকে দক্ষ, কর্মব্যস্ত ও নিয়মতান্ত্রিক করতে চাইলে শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কার জরুরি। এটি সময়ে দাবি। হ
Mojaffarh40@gmail.com