দেশে উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে ধর্ষণ। বাড়ছে ধর্ষণের পর হত্যা। সামাজিক অবক্ষয়, মাদকের বিস্তার, বেকারত্ব, আকাশ সংস্কৃতির নেতিবাচক প্রভাব, আইনের সঠিক প্রয়োগ না থাকা, পর্নো ছবির অবাধ ছড়াছড়ির কারণে ধর্ষণপ্রবণতা দিন দিন বাড়ছে। আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে নারী ও কন্যাশিশু ধর্ষণের ঘটনা। ধর্ষণের সাথে জড়িতরা হয়ে পড়ছে খানিকটা অপ্রতিরোধ্য আর দুর্দমনীয়।
শিশু থেকে কিশোরী, তরুণী থেকে বৃদ্ধা, স্কুলছাত্রী থেকে পোশাককর্মী, ডাক্তার। আইনজীবী এমন কি ভিখারিণীও রেহাই পাচ্ছেন না মানুষরূপী এসব হায়েনার হিংস্র থাবা থেকে। ধর্ষকেরা শুধু ধর্ষণ করেই ক্ষান্ত থাকছে না, ঘটনা ধামাচাপা দিতে করছে নৃশংস হত্যা।
সম্প্রতি ধর্ষণের ভয়াবহতা ও ধর্ষণ-পরবর্তী নির্যাতনের লোমহর্ষক সব ঘটনায় আঁতকে উঠেছেন দেশবাসী। ধর্ষণ রুখে দিতে প্রতিরোধের চেয়ে প্রতিকার গুরুত্বপূর্ণ। নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতা একটি সামাজিক ব্যাধি। মানুষের মধ্যে যে আদিম প্রবৃত্তি, তা দমিয়ে রাখতে হলে শৈশব থেকে বা পরে স্কুল-কলেজে সুস্থ জ্ঞানচর্চা, নৈতিক মূল্যবোধ জাগ্রত করতে হবে।
মূলত সচেতনতার অভাবেই বাড়ছে ধর্ষণের মতো ঘটনা। নিম্ন আয়ের পরিবারগুলোতে ধর্ষণের ঘটনা বেশি ঘটছে। এসব পরিবার সবসময়ই নানা টানাপড়েনে থাকে। এর সুযোগ নেয় মানুষরূপী নরাধমেরা। গরিব ঘরের অবুঝ শিশু ও নারীরা ওইসব নরাধমের লালসার সহজ শিকারের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে। সামাজিক লোকলজ্জার ভয়ে ধর্ষণের শিকার বেশির ভাগ নারীই বিচার চাইতে যান না। যেসব নারী বিচার চাইতে যান, তারা নানাভাবে হেনস্তা ও হয়রানির শিকার হন। ধর্ষণের অভিযোগগুলো বেশির ভাগই প্রমাণ হয় না। প্রধান কারণ, ঘটনার তদন্ত যথাযথভাবে না হওয়া। আর যেসব শিশু ধর্ষণের শিকার হয়, পরবর্তীতে তাদের জীবন হয়ে ওঠে দুর্বিষহ। ধর্ষণ ও ধর্ষণ-পরবর্তী হত্যার ঘটনা সমাজের বিবেকবান যে কাউকে ব্যথিত করে। কাঁদায় ও উদ্বিগ্ন করে তোলে। শিশুদের নিরাপদ জীবনের নিশ্চয়তা দান ও মৌলিক অধিকার রক্ষা করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। রাজনৈতিক, পারিবারিক বা অন্য যে কারণেই হোক শিশু খুনের ঘটনা সামাজিক সংহতির অভাব ও মূল্যবোধের অবক্ষয়ের স্মারক। শিশুদের প্রতি নির্মমতা থামছে না। ভবিষ্যতের কাণ্ডারি শিশুদের জন্য উপযুক্ত পরিবেশ সৃষ্টির বিকল্প নেই। এ সমাজ কলুষমুক্ত করতে হলে সব অভিযুক্তকে আইনের আওতায় আনতে হবে। দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে না পারলে পঙ্কিলতার অতল গহ্বরে তলিয়ে যাবে আমাদের সমাজ। তাই ধর্ষণ রোধে আইনের কঠোর প্রয়োগের পাশাপাশি এ প্রবণতার কারণগুলো চিহ্নিত করে তা দূর করার উদ্যোগ নিতে হবে। অনেকের মতে, ভোগবাদী সমাজে কেউ কেউ বিকৃত আনন্দ পেতে হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে এসব কুকর্ম করে থাকে। সেখানে ন্যায়-অন্যায় এবং নীতি-নৈতিকতার বালাই থাকে না। জাতিকে নৈতিকতাসমৃদ্ধ করে তুলতে না পারলে ধর্ষণের মতো অপরাধ থেকে মুক্তি মেলা ভার। দেশের অপরাধ বিশেষজ্ঞ থেকে শুরু করে সমাজবিজ্ঞানী, রাজনৈতিক নেতৃত্বÑ সবাইকে এক হয়ে ধর্ষণপ্রবণতার কারণগুলো চিহ্নিত করে এ অপকর্ম থেকে দেশকে রক্ষা করতে হবে।
স্বীকার করতে হবে, তরুণদের সুস্থ-সুন্দর মন ও মূল্যবোধসম্পন্ন করে গড়ে তুলতে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলো যথাযথ ভূমিকা রাখতে পারছে না। মাদকের ব্যবহার বাড়ার সাথেও এরকম অপরাধের হার বাড়ার যোগসূত্র আছে বলে অপরাধ বিশেষজ্ঞদের অভিমত।
ধর্ষণের মতো জঘন্য অপরাধ যে মাত্রায় বাড়ছে, এর লাগাম টেনে ধরতে না পারলে তা সামাজিক ব্যাধি হিসেবে ছড়িয়ে পড়বে। তাই ধর্ষণ প্রতিরোধে জরুরি, অপরাধীর যথার্থ শাস্তি নিশ্চিত করা। ভুক্তভোগীর পক্ষে রাষ্ট্রের এগিয়ে আসা। অপরাধ তদন্তে এবং অপরাধীকে আইনের আওতায় এনে বিচারের মুখোমুখি করে দৃষ্টামূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের নিরপেক্ষ আর সঠিক তদন্ত করা। এর কোনো বিকল্প নেই।
লেখক : আইনজীবী, সুপ্রিম কোর্ট