যুক্তরাজ্যের লন্ডনভিত্তিক সাময়িকী দ্য ইকোনমিস্টের ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (ইআইইউ) সম্প্রতি Democracy Index 2018’ গণতন্ত্রের সূচক ২০১৮ প্রকাশ করেছে। বিশ্বের ১৬৫টি স্বাধীন দেশ এবং দু’টি অঞ্চলকে নিয়ে সূচকটি তৈরি করা হয়েছে। নির্বাচনী ব্যবস্থা ও বহুদলীয় অবস্থান, সরকারের কার্যকারিতা, রাজনৈতিক অংশগ্রহণ, রাজনৈতিক সংস্কৃতি এবং নাগরিকদের অধিকারের বিষয়টি সামনে রেখে একটি দেশের পরিস্থিতি বিবেচনা করে ১০ পয়েন্টভিত্তিক এ সূচক তৈরি করেছে ইআইইউ। প্রাপ্ত স্কোরের ভিত্তিতে চারটি শ্রেণীতে ইআইইউ দেশগুলোকে ভাগ করা হয়েছে। যেমনÑ পূর্ণ গণতন্ত্র, ত্রুটিপূর্ণ গণতন্ত্র, মিশ্র শাসন ও স্বৈরতন্ত্র। মূল্যায়নের ১০ পয়েন্টের মধ্যে ৯ দশমিক ৮৭ স্কোর নিয়ে শীর্ষে রয়েছে নরওয়ে। শীষ পাঁচে অবস্থানকারী অন্য দেশগুলো হচ্ছেÑ আইসল্যান্ড, সুইডেন, নিউজিল্যান্ড ও ডেনমার্ক। সবার নিচের ১৬৭তম অবস্থানে রয়েছে উত্তর কোরীয়। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে ভালো অবস্থানে আছে ভারত ও শ্রীলঙ্কা। বাংলাদেশ ৫ দশমিক ৪৩ স্কোর নিয়ে ৯২তম অবস্থানে রয়েছে। ২০১৬ সালের সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ৮৪তম। গবেষণা প্রতিষ্ঠানটি ২০০৬ সালে প্রথম গণতন্ত্রের সূচক প্রকাশ করে। পৃথিবীর অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক সূচক কেন দুর্বল অবস্থানে রয়েছে বিষয়টি আমাদের খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
একটি স্বাধীন দেশের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা ও বিকাশের গুরুত্বপূণ উপাদান হচ্ছে সুষ্ঠু, অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন। আর সে নির্বাচন যখন ত্রুটিপূর্ণ হয়, তখনই জন্ম দেয় বিতর্কের। বিতর্কিত নির্বাচনের মাধ্যমে যখন একটি দল জয়ী হয়, তখন দলটির ওপর জনগণের ক্ষোভ বাড়তে থাকে। ক্ষমতায় যাওয়া আর জনগণকে বোকা বানানো এক জিনিস নয়। জনগণ এখন আর আগের মতো এত বোকা নন! ডিজিটাল জামানায় ভাবের পাগল পাওয়া যায়, কিন্তু সত্যিকারের পাগল পাওয়া দুষ্কর। এই সরকারের আমলে স্কুল কমিটি, বাজার কমিটি, ব্যবসায়ীদের নেতা নির্বাচন থেকে শুরু করে স্থানীয় সরকারের নির্বাচন পর্যন্ত বিতর্কিত হয়েছে।
আমাদের মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য ছিল নির্ভেজাল গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা। কিন্তু সে গণতন্ত্র আজ কোথায়? ১৯৯০ সালে স্বৈরাচার এরশাদের সামরিক শাসনের পতনের পর বাংলাদেশে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়। এরপর থেকে নিয়মিত নির্বাচন হয়ে আসছে। ২০০৮ সালে কেয়াটেকার সরকারের অধীনে আওয়ামী লীগ দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে ক্ষমতায় আসে। যে কেয়ারটেকার সরকারপদ্ধতি প্রবর্তনে ১৯৯৪ সাল থেকে আওয়ামী লীগ তীব্র আন্দোলন গড়ে তোলে; সেই কেয়াটেকার সরকারব্যবস্থা তারাই আবার বিলোপ করেছে। ১৯৯১ সালে বিশেষ ব্যবস্থাপনায় এবং ১৯৯৬ সালে প্রবর্তিত কেয়ারটেকার সরকার ব্যবস্থার অধীনে কয়েকটি জাতীয় নির্বাচন ছাড়া দেশে অনুষ্ঠিত সব নির্বাচনই প্রশ্নবিদ্ধ ছিল।
সরকারদলীয় নেতা-নেত্রীদের মুখে খুব জোরগলায় উন্নয়ন ও প্রবৃদ্ধির কথা শোনা যায়। অথচ উল্লেখযোগ্য মানুষের কর্মসংস্থানের কথা শোনা যায়নি। উন্নয়ন হয়নিÑ এটি বলা যাবে না। তবে যেটুকু উন্নয়ন হয়েছে তা বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর জন্য সুফল বয়ে এনেছে কি না তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। ক্ষমতাসীনদের বিরুদ্ধে জনগণ টুঁ শব্দ পর্যন্ত করতে পারেনি। ক্ষমতাসীনেরা দু’টি অস্ত্রকে অবলম্বন করে কর্তৃত্ববাদী হয়ে ওঠে। একটি হলো রাষ্ট্রীয় শক্তি, অন্যটি সমর্থকদের পুরস্কৃত করে। একদিকে বলপ্রয়োগ করে বিরোধী জোটকে বিতাড়িত করা, অন্য দিকে সুবিধা দিয়ে নিজেদের সমর্থকগোষ্ঠীকে চাঙা রাখার প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখা। ২০১৪ সালের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার পর ১১ জানুয়ারি দ্য ইকোনমিস্ট পত্রিকার এক প্রতিবেদনে মন্তব্য করা হয়, ‘বাংলাদেশের গণতন্ত্র পচে গেছে।’ গত বছর মার্চে জার্মান গবেষণা সংস্থা ব্যাটেলসম্যান স্টিফটাং প্রকাশিত এক গবেষণা প্রতিবেদনে বাংলাদেশের ক্ষমতাসীন সরকারকে বিশ্বের স্বৈরতান্ত্রিক সরকারগুলোর কাতারভুক্ত করা হয়। বাংলাদেশকে স্বৈরতান্ত্রিক রাষ্ট্রের তালিকায় রাখা ব্যাটেলসম্যান ফাউন্ডেশনের নাম যদিও এর আগে অনেকই শোনেননি, কিন্তু ব্রিটিশ সাপ্তাহিক ম্যাগাজিন দ্য ইকোনমিস্ট সুপরিচিত। বিগত এক যুগ ধরে পত্রিকাটি প্রতি বছর বৈশ্বিক গণতন্ত্রের মান পর্যালোচনা করে প্রকাশ করছে ডেমোক্র্যাসি ইনডেক্স। ২০১৬ সাল থেকে ২০১৭ সালে বাংলাদেশের গণতন্ত্র পরিস্থিতির আট ধাপ অবনতি হয়েছে। সরকার মত প্রকাশের অধিকার নিয়ন্ত্রণের সব অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে। পত্রিকা ও টিভির সংখ্যা উপস্থাপন করে গণমাধ্যম ও ইলিকট্রনিক মিডিয়ায় জিগির তুলে প্রায়ই মত প্রকাশের স্বাধীনতার হিসাব দেয় বর্তমান সরকার।
গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় নিরঙ্কুুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা কতটা নির্দয় হতে পারে তার বহু দৃষ্টান্ত বিশ্ব ইতিহাসে রয়েছে। গণতান্ত্রিক দেশের নির্বাচনে ভেলকিবাজির ভোট অনুষ্ঠিত হলে সেখানকার ক্ষমতাসীনেরা কতটা দানবীয় হয়ে উঠতে পারে তার বড় উদাহরণ জার্মানির হিটলার। ভি-এস নাইপল তার একটি উপন্যাসে লিখেছিলেনÑ কাছে থাকলে মানুষ সমস্যার মধ্যে নিজেও গুলিয়ে যায়। আর সেজন্য হয়তো ক্ষমতাসীন শাসকেরা জনগণের মনের দ্রোহটা বুঝতে পারেন না। ইতিহাসের পাতায় যারা বীরত্বে নাম লিখিয়েছেন তারাও আজ নিশ্চুপ! বাদ্যের আওয়াজ অনেক দূর থেকে শোনা যায়। কিন্তু ছেঁড়া বাদ্যের আওয়াজ ঢুলির নিজেরও শুনতে কষ্ট হয়। ৩০ ডিসেম্বরের পর যত মানুষের সাথে নির্বাচন সম্পর্কে কথা হয়েছে তাদের সবার ভোটগ্রহণ নিয়ে রয়েছে বড় প্রশ্ন। গণতন্ত্র কোনো গাছের ফল নয় যে পেড়ে নিলেই হলো। বিশ্বের ৬২ শতাংশ দেশ গণতান্ত্রিক হলেও বর্তমানে অনেক দেশে মত প্রকাশের স্বাধীনতা সঙ্কুচিত।
ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ইশতেহারে গণতন্ত্র ও আইনের শাসন গড়ে তোলার নিশ্চয়তা দিয়েছে। আমরা আশা করব, সরকার ইশতেহারের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করবে। পাশাপাশি রাজনৈতিক প্রতিহিংসা পরিহার করে বিরোধী সব রাজনৈতিকদলকে সংবিধানসম্মত রাজনীতি করার অধিকার দেবে; যাতে করে অদূরভবিষ্যতে গণতন্ত্রের সূচকে বাংলাদেশ পিছিয়ে না পড়ে পূর্ণ গণতান্ত্রিক দেশের তালিকায় স্থান হয়, এটিই দেশবাসীর প্রত্যাশা। হ