‘গালভরা প্রতিবেদন সবাই দিতে পারে। আপনাকে বলতে হবে কোন সরকারি কর্মকর্তা, কোন রাজনৈতিক নেতা দুর্নীতি করছেন। কারা কিভাবে কোথায় অর্থ পাচার করছেন। নইলে, এ মহাসমুদ্রে আমি কাকে ধরব? কাকে খুঁজব?’ টিআই ও জিএফআইয়ের প্রতিবেদন সম্পর্কে এমন মন্তব্য করেছেন দুর্নীতি দমন কমিশনের চেয়ারম্যান।
টিআইবির প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০১৭ সালের তুলনায় ২০১৮ সালে বাংলাদেশের সূচকে ৪ ধাপ অবনতি হয়েছে। ২০১৭ সালে দুর্নীতিগ্রস্ত দেশের তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ১৭তম। ২০১৮ সালে তা হয় ১৩। অন্যদিকে গ্লোবাল ফাইন্যান্সিয়াল ইনটিগ্রিটির (জিএফআই) প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশ থেকে ২০১৫ সালে প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকা পাচার হয়েছে। গত ১১ বছরে মোট পাচার হয়েছে আট হাজার ১৭৫ কোটি ডলার। বর্তমান বাজারদরে এর মূল্যমান ছয় লাখ ৮৬ হাজার ৭০০ কোটি টাকা।
টিআইর জরিপে বাংলাদেশে দুর্নীতি বাড়ার যে তথ্য এসেছে, এর ব্যাখ্যা চেয়েছেন দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) চেয়ারম্যান। তিনি বলেছেন, ‘রিপোর্ট দেয়ার নামে সুইপিং কমেন্টস (যাচ্ছেতাই মন্তব্য) করলেই হবে না। ফ্যাক্টস অ্যান্ড ফিগারসহ (তথ্য-উপাত্ত) পরামর্শও দিতে হবে। বলেছেন, ‘আমরা ব্যাখ্যা চাই, কিভাবে এবং কী কী কারণে দুর্নীতি বেড়েছে। ফ্যাক্টস অ্যান্ড ফিগার না দিলে ওই রিপোর্ট কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয় বলে মন্তব্য করেছেন তিনি।
টিআইর জরিপে বাংলাদেশে দুর্নীতি বাড়া ও জিএফআইর টাকা পাচারের যে প্রতিবেদন এসেছে, তাতে দুদক চেয়ারম্যান তার ব্যাখ্যা চেয়েছেন। টিআই ও জিএফআইর জরিপ যদি বিশ্বাসযোগ্য না হয়, তাহলে দুদকও চ্যালেঞ্জ নিয়ে প্রতি বছর তালিকা ও প্রতিবেদন প্রকাশ করতে পারে, দেশে কোন কোন খাতে দুর্নীতি হয় না।
দুদক ক্ষমতাসীনদের কাউকে শাস্তি দিয়ে দেখাতে পারলে, ব্যাখ্যা চাওয়া নিয়ে দেশব্যাপী আলোচনা হতো না। অবস্থাদৃষ্টে মনে হয়, দেশে সরকারি দলের কেউ দুর্নীতি করেন না, সরকারি দলের বাইরে যারা থাকেন তারাই শুধু দুর্নীতি করেন!
টিআইবিকে দুদকের প্রতিপক্ষ ভাবার কোনো কারণ নেই। দুদক কারো জন্য ‘ওয়াশিং মেশিন’ আর কারো জন্য যেন ‘যাঁতা মেশিন’ না হয়। বরং টিআইবির কাছ থেকে সহযোগিতা নিয়ে দুর্নীতি দমনে সক্রিয় হতে পারে দুদক।
দুদক কি দেশবাসীকে এ বার্তা দিতে পারে না, দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণে সরকারের আজ্ঞাবহ প্রতিষ্ঠান নয় এটি? বর্তমান ক্ষমতাসীনেরা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্সের। শূন্য সহনশীলতার ঘোষণা যতটা সহজ, এর বাস্তবায়ন ততটাই কঠিন ও জটিল। বিশেষ করে এমন পরিবেশে যেখানে রাজনৈতিক ও শাসনব্যবস্থার সব ক্ষেত্র এবং পর্যায়ে ক্ষমতাসীন দলের একচ্ছত্র প্রভাব প্রায় প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়। আগে ক্ষমতাসীন ও সরকারি কর্মকর্তাদের সম্পদের হিসাব তলব করতে পারে দুদক।
বিআরটিএ, ব্যাংক, শেয়ারবাজার, রিজার্ভ, ট্রেন, বিমান, হাসপাতাল, ভূমি খাত, ভ্যাট অফিস, ইনকাম ট্যাক্স, সরকারি ক্রয় খাত ইত্যাদিতে বাদ দিয়ে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের নজরদারিতে আনার বিষয়টি কৌতূলোদ্দীপক নয় কি? যেকোনো একটি সরকারি সেবাসংস্থার নাম বলা যাবে, যেখানে দুর্নীতি নেই? টিআইবি ও জিএফআইর কাছে ব্যাখ্যা না চেয়ে, তথ্য-উপাত্ত দিয়ে দুদকের প্রমাণ করা দরকার ওই দুটি সংস্থার প্রতিবেদন ভুল!
টিআই ও জিএফআইকে যদি তথ্য-উপাত্ত, কর্মপদ্ধতি, ব্যাখ্যা, বিশ্লেষণ দিয়ে খুঁজে বের করে দিতে হয়, তাহলে দুদক কী করবে? দুদকের কাজ দুর্নীতিবাজদের খুঁজে বের করা, গ্রেফতার করা।
দুই-চার কোটি টাকার দুর্নীতি খুঁজতে ব্যস্ত থাকলে দুদকের আন্তরিকতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। ব্যাংক, শেয়ারবাজার ও অর্থপচারসহ হাজার হাজার কোটি টাকার দুর্নীতিবাজ ‘তিমি-হাঙ্গরদের’ খুঁজতে বা ধরতে গিয়ে কে কার পদ ধরে রাখতে পারবেন তাও দেশের সাধারণ নাগরিকের জানা থাকা দরকার।
ট্রেনের টিকিট কাটা থেকে শুরু করে ব্যাংক ঋণ, চিকিৎসা, শিক্ষা কোথাও দুর্নীতিমুক্ত নেই? সত্যিকার অর্থে দেশে দুর্নীতির শিকড় অনেক গভীরে। তা থেকে দেশকে মুক্ত করতে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করতে হবে। একই সাথে যেসব বিষয়ে সমালোচনা হচ্ছে, ওই সব ভুল শক্ত হাতে শিকড়সহ উপড়ে ফেলা অতি জরুরি।
বিএনপির সময় পাঁচবার দুর্নীতিতে প্রথম হওয়ার টিআইবির রিপোর্ট ক্ষমতাসীনেরা এখন পর্যন্ত তসবির মতো জপতে থাকেন! আর এখন টিআইবির প্রতিবেদন রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত, ত্রুটিপূর্ণ ও মনগড়া? তা হলে তো বলতে হয়, বিএনপি আমলে টিআইবি বাংলদেশকে যতবার দুর্নীতিতে প্রথম ঘোষণা করেছিল, তাও ছিল মিথ্যা? আমাদের একটি প্রবণতা লক্ষণীয়, পক্ষে হলে ভালো। আর বিপক্ষে গেলে বানোয়াট এবং মনগড়া বলে উড়িয়ে দেয়া। এ প্রবণতা থেকে বেরিয়ে আসতে না পারলে কাজের কাজ কিছু হবে না।
টিআইর সূচক অনুযায়ী, ১০০ নম্বরের মধ্যে বাংলাদেশ গতবার পেয়েছিল ২৮। এক বছরের ব্যবধানে এবার দুই পয়েন্ট কমে স্কোর হয়েছে ২৬। এবার ১৮০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ভালো থেকে খারাপের দিকে ১৪৯তম। গতবার ছিল ১৪৩তম। ফলে বাংলাদেশ ছয় ধাপ পিছিয়েছে। বাংলাদেশের সাথে একই অবস্থানে আছে আফ্রিকার দেশ মধ্য আফ্রিকা প্রজাতন্ত্র ও উগান্ডা। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ৪ ধাপ পিছিয়েছে। এশিয়ায় বাংলাদেশের চেয়ে দুর্নীতি বেশি তিনটি দেশে। দক্ষিণ এশিয়ায় দুর্নীতিতে বাংলাদেশের চেয়ে খারাপ অবস্থা একটি দেশে, আফগানিস্তানে। এর আগে ২০০১ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশের অবস্থান ছিল দুর্নীতিতে শীর্ষে। এর মধ্যে ২০০১ সালের ২৬ জুন টিআই যখন এ সূচক প্রকাশ করে, তখন ক্ষমতায় ছিল আওয়ামী লীগ। এরপর বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার আমলে পরপর চারবার দুর্নীতিতে শীর্ষে ছিল বাংলাদেশ। এবারের সূচকে কম, ১০ নম্বর পেয়ে তালিকায় সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত দেশ সোমালিয়া। ১২ বছর ধরে দেশটি একই অবস্থানে রয়েছে। সূচকে ৮৮ নম্বর পেয়ে তালিকার শীর্ষে অর্থাৎ সবচেয়ে কম দুর্নীতিতে রয়েছে ডেনমার্ক। এরপর দুর্নীতি কম হওয়া দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে নিউজিল্যান্ড, ফিনল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, সুইডেন ও সুইজারল্যান্ড। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে কম দুর্নীতিগ্রস্ত দেশ ভুটান (২৫তম)।
আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারে দুর্নীতির বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতার ঘোষণা দিয়েছিল। প্রধানমন্ত্রী মন্ত্রিসভা গঠনের পর মন্ত্রীদের প্রতি দুর্নীতির বিরুদ্ধে সাবধানবাণী পুনরাবৃত্তি করেছেন। প্রধানমন্ত্রী যেমনটা বলেছেন, আইনের কঠোর প্রয়োগের মাধ্যমে দুর্নীতি যেই করুক, পরিচয়নির্বিশেষে আইনানুগ শাস্তি পেতে হবে, এটা নিশ্চিত করতে হবে। হ
abunoman1972@gmail.com
