কর্ণফুলী নদী ও সংলগ্ন চাক্তাই এবং রাজাখালী খালের মধ্যবর্তী এক লাখ ৭৩ হাজার ২৬৩ বর্গফুট জায়গায় সোনালি যান্ত্রিক মৎস্যশিল্প সমবায় সমিতি মৎস্য অবতরণকেন্দ্র নির্মাণ করা হয়। সেখানে গড়ে উঠেছে ১৮৮টি দোকান। পাশাপাশি ওই এলাকায় গড়ে উঠেছে বস্তি, দোকান, মিল-কারখানা, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানসহ একাধিক স্থাপনা। অথচ এসব নদী ও খালের পাশে সব ধরনের অবৈধ স্থাপনা নির্মাণে হাইকোর্টের নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। আইন-কানুন ও জেলা প্রশাসনকে পাত্তা না দিয়ে এসব স্থাপনা গড়ে উঠেছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
সম্প্রতি কর্ণফুলী নদীর প্রাণ ফেরাতে উচ্ছেদ অভিযান শুরু হলে আলোচনায় উঠে এসেছে কর্ণফুলীর নদীতীরের বিশাল জায়গাজুড়ে গড়ে উঠা মৎস্য অবতরণকেন্দ্রটি উচ্ছেদ করা হবে কি না। পরিবেশবাদী ও সচেতনমহল বলছে, কর্ণফুলীর পাড়ে সব অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করে নদীটিকে বাঁচাতে হবে।
২০১৬ সালে কর্ণফুলী নদীর চাক্তাই ও রাজাখালী খালের তীরে ড্রেজিং করে মৎস্য অবতরণকেন্দ্র নির্মাণ করা হয়। জায়গাটি ১৫ বছরের জন্য চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ থেকে ইজারা নেয় বাংলাদেশ মৎস্যজীবী সমবায় সমিতি লিমিটেড। এক লাখ ৭৩ হাজার ২৬৩ বর্গফুট জায়গাটির বছরে ইজারামূল্য ২৮ লাখ ১৫ হাজার ৫২৩ টাকা। মৎস্যজীবী সমবায় সমিতি থেকে উপ-ইজারা নিয়ে সোনালি যান্ত্রিক মৎস্যশিল্প সমবায় সমিতি মৎস্য অবতরণকেন্দ্র নির্মাণ করে। এতে ১৮৮টি দোকান নির্মিত হয়। মৎস্য অবতরণকেন্দ্র নির্মাণের শুরুতে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন কার্যালয় থেকে একাধিকবার নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছিল। এরপরও পেশীশক্তি, রাজনৈতিক প্রভাববলয়ে মৎস্য অবতরণকেন্দ্র নির্মাণ ঠেকানো যায়নি। ফলে কর্ণফুলীর তীরে একের পর এক গড়ে উঠে অবৈধ স্থাপনা। অপ্রতিরোধ্য অবৈধ দখলদারেরা ২০১৮ সালে মৎস্য অবতরণকেন্দ্রের পাশে গড়ে তুলে হিমাগার ও বরফকল। উচ্চ আদালতের আদেশ এবং জেলা প্রশাসনের নিষেধাজ্ঞার পরও কর্ণফুলী দখলের এ মহাযজ্ঞ থেমে থাকেনি।
বন্দর সংশ্লিষ্টরা দাবি করে আসছেন, চট্টগ্রাম বন্দর চ্যানেল হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে কর্ণফুলী নদী। এর শাসন, খনন, সংরক্ষণ, রক্ষণাবেক্ষণ ও বন্দর অবকাঠামো নির্মাণ চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের আওতাভুক্ত। সাধারণত কর্ণফুলী নদীর হাই ওয়াটার মার্ক (সাধারণ জোয়ারে নদীর পানি যে সীমানা স্পর্শ করে) ১৫০ ফুট পর্যন্ত বন্দরের এখতিয়ারে। তা ছাড়া নদীকেন্দ্রিক যেসব প্রতিষ্ঠান ব্যবসায়, পরিচালনা করে এদের সুযোগ-সুবিধা বাড়ানোও বন্দরের কাজ। এ চিন্তা থেকেই জাতীয় মৎস্যজীবী সমবায় সমিতিকে জায়গাটি লিজ দেয়া হয়েছে। যা বন্দরের বৈধ জায়গা। আইনজীবীরা বলছেন, নদী তীর লিজ দিলে কিংবা স্থাপনা তৈরি করা হলে তা হবে আদালতের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। আদালতের এই নির্দেশনাবলে যেকোনো সময় এ স্থাপনা উচ্ছেদের ক্ষমতাও রাখে জেলা প্রশাসন।
কর্ণফুলীর গতিপথ স্বাভাবিক রাখতে নদীর সীমানা নির্ধারণ, দখল, ভরাট ও নদীতে যেকোনো ধরনের স্থাপনা নির্মাণকাজ বন্ধ রাখতে মানবাধিকার ও পরিবেশবাদী সংগঠন হিউম্যান রাইটস পিস ফর বাংলাদেশের সভাপতি ২০১০ সালে হাইকোর্টে রিট পিটিশন করেন। রিটের শুনানি শেষে ২০১৬ সালের ১৬ আগস্ট কর্ণফুলী নদীর অবৈধ স্থাপনা অপসারণের নির্দেশ দেন হাইকোর্ট।
হাইকোর্টের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, হাইকোর্ট ডিভিশনের রিট মামলার আদেশে চাক্তাই ও রাজাখালী খালের সীমানা চিহ্নিতকরণ এবং খালগুলোতে সব ধরনের কাজ বন্ধ রাখার (উন্নয়ন, ফাইলিং, নির্মাণ ও স্থায়ী-অস্থায়ী অবকাঠামো) নির্দেশনা রয়েছে। হাইকোর্টের রায়ের তিন বছর পর চলতি ফেব্রুয়ারিতে কর্ণফুলীতে প্রাণ ফেরাতে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ অভিযান শুরু করে চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসন। তিন ভাগে ভাগ করে উচ্ছেদ অভিযান প্রথম পর্যায়ের কাজ এরই মধ্যে শেষ হয়েছে। দ্বিতীয় ও তৃতীয় পর্যায়ের কাজ শুরু হবে শিগগির। এর মধ্যে তদারকি প্রশাসনকে হুমকি-ধামকি এবং তদবির করা হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। যাতে উচ্ছেদ না করা হয়। তবে ভূমিমন্ত্রী সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, কোনো হুমকি-ধামকি ও তদবিরে কর্ণফুলীকে বাঁচানোর প্রচেষ্টা রোধ করা যাবে না।
চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন বলেছে, দখলদারেরা যতই প্রভাবশালী হোক, সব ধরনের অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করা হবে।
প্রশ্ন উঠেছে, কর্ণফুলীর তীরে তালিকাভুক্ত ২১৮১টি অবৈধ স্থাপনার মধ্যে মৎস্য অবতরণকেন্দ্রের নাম নেই কেন? অথচ জেলা প্রশাসনের ভূমি শাখার আপত্তি ছিল ওই অবতরণকেন্দ্র নিয়ে। জানা গেছে, শতাধিক কক্ষের মৎস্য আড়ৎ তৈরি করে পরে এটি বিক্রি করে সোনালি যান্ত্রিক মৎস্য সমবায় সমিতি লিমিটেড। প্রতিটি আড়ৎ পাঁচ থেকে ৩০ লাখ টাকা দরে শতাধিক ব্যক্তির কাছে বিক্রি করা হয় বলে অভিযোগ আছে। তাই এটি রক্ষা করতে তারা দ্বারস্থ হয়েছে প্রভাবশালীর। এ জন্য নদী তীরের এ জায়গা বাদ দিয়েই দুই হাজার ১৮১ স্থাপনার তালিকা তৈরি করেছে জেলা প্রশাসন। তবে সোনালি যান্ত্রিক মৎস্য শিল্প সমবায় সমিতির সভাপতি মোহাম্মদ আলী বলেছেন, চট্টগ্রাম বন্দর থেকে জায়গাটি ১৫ বছরের জন্য লিজ নিয়েছেন তারা। যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমোদন নিয়ে মাছের আড়ৎ তৈরি করে ভাড়া দেয়া হয়েছে বলের জানান তিনি। হ
লেখক : সাংবাদিক
কর্ণফুলী নদী ও সংলগ্ন চাক্তাই এবং রাজাখালী খালের মধ্যবর্তী এক লাখ ৭৩ হাজার ২৬৩ বর্গফুট জায়গায় সোনালি যান্ত্রিক মৎস্যশিল্প সমবায় সমিতি মৎস্য অবতরণকেন্দ্র নির্মাণ করা...
