সমাজে অব্যাহতভাবে বেড়ে চলেছে শিশু নির্যাতন। মিডিয়ায় প্রতিনিয়ত সংবাদ ছাপা ও প্রচার হচ্ছে শিশু নিপীড়ন, ধর্ষণ ও হত্যার বীভৎস সব কাহিনী। শিশুর প্রতি নিষ্ঠুরতার জন্য সমাজ ও সভ্যতা আজ প্রশ্নবিদ্ধ। অথচ শিশুরা হচ্ছে দেশের আগামী দিনের নাগরিক। রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ কর্ণধার। দেশের বিদ্যমান শিশু আইনে ১-১৮ বছরের মানব সন্তানকে শিশু হিসেবে গণ্য করা হয়। জাতিসঙ্ঘ শিশু অধিকার সনদে ১৮ বছরের কম বয়সী সব মানুষকে শিশু হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। বাংলাদেশে ১৮ বছরের কম বয়সী জনসংখ্যা ছয় কোটি ৩০ লাখ প্রায়। যা মোট জনসংখ্যার ৪৫ শতাংশ। শিশুর সার্বিক উন্নয়ন নিশ্চিত করা ও অধিকার সংরক্ষণের দায়িত্ব সমাজের সবার। একটি সৎ, দেশপ্রেমিক ও কর্মক্ষম প্রজন্ম গড়ে তোলা আমাদের চাওয়া। সংবিধানের ২৮(৪) অনুচ্ছেদে উল্লেখ রয়েছে, ‘নারী বা শিশুদের অনুকূলে কিংবা নাগরিকদের যেকোনো অনগ্রসর অংশের অগ্রগতির জন্য বিশেষ বিধান প্রণয়ন হতে এ অনুচ্ছেদের কোনো কিছুই রাষ্ট্রকে নিবৃত্ত করবে না।’ শিশুরা সুন্দর আর পবিত্রতার প্রতীক। কিন্তু শিশু সুরক্ষা আমাদের সমাজে আজ চ্যালেঞ্জের মুখে। শিশুর সুরক্ষার মূল কথা, শিশুর প্রতি হিংসা, শোষণ, নিগ্রহ, যৌনাচার, পাচার, শিশুশ্রম ও বাল্যবিয়েসহ নানা অনাচার থেকে তাদের রক্ষা করা জরুরি।
সম্প্রতি ‘বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরাম’ দেশব্যাপী শিশু নির্যাতনের তথ্যচিত্র প্রকাশ করেছে। এতে ভয়ানক চিত্র ফুটে উঠেছে। ২০১৮ সালে শিশু নির্যাতনের মোট ঘটনা চার হাজার ৫৬৬টি। ২০১৭ সালের তুলনায় নির্যাতন বেড়েছে ১৯ শতাংশ। শিশু হত্যাকাণ্ড ৪১৮টি ও ধর্ষণ ৪৯৪টি। প্রতিবন্ধী শিশুকে ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। গত পাঁচ বছরে ধর্ষণের শিকার তিন হাজার ৫৮৭ শিশু। এদিকে দেশে শিশু শ্রমের বিষয়টিও উদ্বেগজনক। এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, দেশের প্রায় ৭৮ লাখ শিশু অর্থনৈতিক কাজে নিয়োজিত। অনেক কাজ অতি ঝুঁকিপূর্ণ। মৌলিক অধিকার বঞ্চিত এসব দরিদ্র শিশু শুধু বেঁচে থাকার তাগিদে কাজ করে থাকে। মধুর শৈশব ও স্মৃতিময় কৈশোর তাদের জীবনে ফেরারি। বিআইডিএস পরিচালিত ২০১৭ সালের এক সমীক্ষায় দেখা যায়, ৪৭ শতাংশ শিশু বাল্যবিয়ের শিকার। বাল্যবিয়ের ক্ষেত্রে দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশের অবস্থান প্রথম এবং বিশ্বে চতুর্থ।
শিশুরা চায় চারপাশের মানুষজন তাদের ভালোবাসা ও স্নেহের পরশ দেবে। একটি সুন্দর নিরাপদ আশ্রয় দেবে। কিন্তু আমাদের সমাজের দৃশ্যপট ভিন্ন। দারিদ্র্যের কারণে কাজ করতে বাধ্য হয় শিশু। অনেক সময় নিয়োগকারীর হাতে নিপীড়ন-যৌন হয়রানির শিকার হয় কর্মজীবী শিশু। গৃহকর্তা বা গৃহকর্ত্রীর হাতে শিশু শারীরিক নির্যাতন ও যৌনাচারের শিকার হচ্ছে। শিশু নির্যাতনকারী অনেকে অভিজাত। এ ছাড়া দেশে বাবা-মায়ের পরকীয়া, পারিবারিক কলহ, শত্রুতার জের, ভালো ফলাফলের তাড়না প্রভৃতি কারণে শিশুর বিকাশ বিঘিœত হচ্ছে।
শিশুর প্রতি কেন পৈশাচিক আচরণ? কেন এ বর্বরতা? এ প্রশ্ন আজ সবার। মানুষের যৌন লালসা, অভিজাত শ্রেণীর অনেকের বিলাসী মনোভাব ও অতি অধিকার চর্চায় আজকের শিশু চরম নিষ্ঠুরতার শিকার। শিশুর প্রতি বিরূপ আচরণ বিবেকহীন মানুষের অসুস্থ মানসিকতার প্রকাশ। বিকৃত মানসিকতা। যা অসুস্থ সমাজের বহিঃপ্রকাশ।
দেশে বিরাজমান আর্থসামাজিক অবস্থার কারণে শিশুর বিকাশ বহু ক্ষেত্রে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। শিশুর পরিপূর্ণ বিকাশে সবাইকে হতে হবে সংবেদনশীল। শিশুর গর্ভকালীন পরিচর্যা, অসুস্থতা, অপুষ্টি, শারীরিক ত্রুটি, দুর্ঘটনা, অস্বাভাবিক শারীরিক গঠন প্রভৃতি ক্ষেত্রে সতর্ক থাকতে হবে। বিশেষত সতর্ক থাকতে হবে প্রতিবন্ধী শিশুর ক্ষেত্রে। দেশের নাগরিক হিসেবে তাদের অধিকার রক্ষায় সবাইকে যতœবান হতে হবে। শিশুর মানসিক ও সামাজিক বিকাশে তাদের প্রতি বঞ্চনা, অবহেলা ও ভীতি প্রদর্শন করা যাবে না। নজর দিতে হবে শিশুর দুশ্চিন্তা, উদ্বিগ্নতা ও ভীতির কারণ সম্পর্কে। আবার শিশুর প্রতি অতিস্নেহ, ভালোবাসা, অতি শাসন, অতিরিক্ত মানসিক চাপ, শাস্তি ও সমালোচনা প্রভৃতি বিষয়ে বিরত থাকতে হবে। অতি নিয়ন্ত্রণে শিশুরা কূটকৌশলের আশ্রয় নিয়ে থাকে। এ ক্ষেত্রে তাদের ওপর চূড়ান্ত নিয়ন্ত্রণ হারানোর আশঙ্কা প্রবল। এ পরিপ্রেক্ষিতে অভিভাবক মহলকে শিশুর সুরক্ষায় কৌশলী ভূমিকা পালন করতে হবে।
দেশে শিশুর সুরক্ষায় সরকারি ও বেসরকারি বেশ কিছু উদ্যোগ চলমান। এতিম, দুস্থ ও অভিভাবকহীন শিশু লালন পালনে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় অধীন পরিচালিত হচ্ছে সরকারি শিশু পরিবার (৮৫টি), ছোটমণি নিবাস (৬টি) ও বেসরকারি এতিমখানা (৩৮৭১টি)। তা ছাড়া প্রতিবন্ধী শিশুদের উন্নয়নে পরিচালিত হচ্ছে বেশ কিছু বিশেষায়িত বিদ্যালয়, প্রশিক্ষণ ও পুনর্বাসন কেন্দ্র। শিশুর সুরক্ষায় চালু আছে ‘চাইল্ড হেল্প লাইন ১০৯৮’। শিশুর সার্বিক কল্যাণে ‘জাতীয় শিশুনীতি-২০১১’ এবং ‘শিশু আইন-২০১৩ (সংশোধন-২০১৮)’ প্রণয়ন করেছে সরকার। মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীন শিশু সুরক্ষায় পরিচালিত হচ্ছে শিশু বিকাশ কেন্দ্র (৬টি) এবং ডে-কেয়ার সেন্টার (১১টি)। দারিদ্র্যপীড়িত গর্ভবতী নারীর শিশুর পুষ্টির চাহিদা মেটানোর জন্য চালু আছে মাতৃত্বকালীন দুগ্ধ মহিলা ভাতা। এ মন্ত্রণালয় বাল্যবিয়ে রোধে চালু করেছে ‘ন্যাশনাল হেল্প লাইন ১০৯’। অন্য দিকে ‘বাংলাদেশ শিশু একাডেমি’ শিশুর মননশীলতা, সৃজনশীলতা ও সাংস্কৃতিক বিকাশে দেশব্যাপী কার্যক্রম চালাচ্ছে। সরকারের অন্যান্য বিভাগ তথা ‘স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও পরিবার পরিকল্পনা’ এবং ‘প্রাথমিক ও গণশিক্ষা’ মন্ত্রণালয় শিশুর স্বাস্থ্য, পুষ্টি ও শিক্ষা বিস্তারে ভূমিকা রাখছে। শিশুর সুরক্ষায় সরকারি-বেসরকারি সব উদ্যোগ ও কর্মসূচি সুফল শিশুদের সেবায় পৌঁছে দিতে সমাজে সক্রিয় সবার ভূমিকা রাখা জরুরি।
শিশু মানবাধিকারের সর্বজনীন দলিল হলো ‘জাতিসঙ্ঘ শিশু অধিকার সনদ’। ১৯৮৯ সালের ২০ নভেম্বর জাতিসঙ্ঘের সাধারণ পরিষদ এ সনদ সর্বসম্মতিক্রমে অনুমোদন করে। বিশে^র সব শিশু বৈষম্যহীনভাবে ভোগ করবে তাদের মৌলিক-মানবাধিকার। বাংলাদেশ এ সনদে স্বাক্ষরকারী ও অনুসমর্থনকারী অন্যতম দেশ। শিশু অধিকার সনদের ৫৪টি ধারার মধ্যে ২৪টি ধারা সরাসরি শিশুর সুরক্ষাবিষয়ক। শিশুর সুরক্ষায় এ সনদ অনুসারে ইউনিসেফ, সেভ দ্য চিলড্রেন ও অপরাজেয় বাংলাদেশ সরকারের সহযোগী হিসেবে শিশুর সুরক্ষায় কাজ করছে। শিশুর প্রতি নিপীড়ন নয়, নিষ্ঠুরতা নয়, তার সার্বিক সুরক্ষা নিশ্চিত হোক সমাজের অঙ্গীকার। হ
লেখক : সহকারী পরিচালক, সমাজসেবা অধিদফতর,
বিভাগীয় কার্যালয়, চট্টগ্রাম।
newaz.usso@gmail.com