যখন জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবে বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলের বেশির ভাগ তলিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে; ঠিক তখন বঙ্গোপসাগরের বুক চিরে জেগে ওঠা ছোট ছোট ভূমি অভাবনীয় সম্ভাবনা তৈরি করেছে। বঙ্গোপসাগরের বুকে জেগে ওঠা এ যেন আরেক বাংলাদেশ! জানা গেছে, বঙ্গোপসাগর ও উপকূলবর্তী বিভিন্ন নদীতে এখন বছরে গড়ে ১৬ বর্গকিলোমিটারের বেশি নতুন ভূমি জেগে উঠছে।
তথ্য মতে, প্রতি বছর যে পরিমাণ ভূমি নদীভাঙন ও ভূমিধসের কারণে বিলীন হয়, জেগে ওঠা ভূখণ্ড তার চেয়ে বেশি। গত চার দশকে মূল ভূখণ্ডের সাথে কয়েক হাজার বর্গকিলোমিটার নতুন ভূমি যুক্ত হয়েছে। গবেষকদের মতে, নতুন ভূমি বাংলাদেশের মূল ভূখণ্ডের ১০ ভাগের ১ ভাগেরও বেশি। গত কয়েক দশকে উপকূলের জেলাগুলোতে (চট্টগ্রাম, নোয়াখালী, কক্সবাজার, পটুয়াখালী, ফেনী, ভোলাসহ অন্যান্য উপকূলীয় জেলা) আনুমানিক ১০ হাজার বর্গকিলোমিটার নতুন ভূমি জেগে উঠেছে। অনেক আগেই নোয়াখালীর হাতিয়া উপজেলায় বঙ্গোপসাগরের বুকে জেগে ওঠে নিঝুম দ্বীপ, স্বর্ণদ্বীপ, ভাসানচরসহ আরো অনেক দ্বীপ। মেঘনার অব্যাহত ভাঙনে দ্বীপ উপজেলা হাতিয়ায় যে পরিমাণ ভূমি বিলীন হচ্ছে, তার বিপরীতে এর চার দিকে কয়েক গুণ বেশি ভূমি জেগে উঠছে।
হাতিয়া উপজেলায় প্রতি বছর যে পরিমাণ ভূমি জাগছে, তাতে কয়েক বছরের মধ্যে হাতিয়া একটি জেলার আয়তনের সমান হবে। সব মিলিয়ে নোয়াখালীর উপকূলীয় এলাকায় প্রতি বছর প্রায় ৭০ হাজার নতুন ভূমি জাগছে। হাতিয়ায় জেগে ওঠা স্বর্ণদ্বীপের আয়তন একটি উপজেলার আয়তনের সমান। স্বর্ণদ্বীপের প্রায় ১৫ কিলোমিটার দক্ষিণে ভাসানচর। ভাসানচরের আয়তন প্রায় ২৫০ বর্গকিলোমিটার। ভাসানচরের দেড় কিলোমিটার দক্ষিণে প্রায় ১০০ কিলোমিটার বিলাশ আয়তনের গাঙ্গুরিয়া চরের অবস্থান। এ ছাড়া হাতিয়ার দক্ষিণে আরো বেশ কয়েকটি চর জেগে উঠেছে।
এ ছাড়া ৩০-৪০টির বেশি ডুবোচর (ভাটার সময় জেগে ওঠে, জোয়ারের সময় ডুবে যায়) রয়েছে, যেগুলো জেগে ওঠার অপেক্ষায় রয়েছে। হাতিয়ার কোনো কোনো চরে জনবসতি গড়ে উঠেছে, শুরু হয়েছে চাষাবাদ। সুন্দরবনের বিভিন্ন নদীর আশপাশেও ছোট ছোট চর জেগে উঠেছে। এসব স্থানে সবুজ বেষ্টনী গড়ে তোলা ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের ক্ষেত্র তৈরি হচ্ছে।
চট্টগ্রামের সন্দীপের ১৫০ বর্গকিলোমিটার দ্বীপ ঘিরে চার পাশে নতুন ভূমি গড়ে উঠেছে এর দ্বিগুণ। মেঘনা নদীর পাড় ঘিরে বিভিন্ন সময় সৃষ্টি হওয়া আরো ৬০টির বেশি চর জেগে ওঠার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। সে হিসাবে সব মিলিয়ে আগামী দুই দশকে বর্তমান বাংলাদেশের অর্ধেক পরিমাণ নতুন ভূমি পাওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে।
২০১৩ সালে মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউটের সমীক্ষায় বলা হয়, ১৯৭১ থেকে ২০১০ পর্যন্ত বিভিন্ন উপকূলীয় অংশে প্রায় ৬ হাজার বর্গকিলোমিটার নতুন ভূমি জেগে উঠেছে। নতুন এসব ভূমি জেগে ওঠার ফলে মূল ভূখণ্ডের পরিমাণই বাড়ছে না, তৈরি হয়েছে অফুরন্ত সম্ভাবনার হাতছানি। এখন শুধু দরকার পরিকল্পনা ও কার্যকর উদ্যোগ। বঙ্গোপসাগরে জেগে ওঠা নতুন ভূমিকে পরিকল্পিত ও পরিবেশসম্মতভাবে ব্যবহারের উদ্যোগ নেয়া প্রয়োজন।
সদ্যপ্রণীত ‘শতবর্ষব্যাপী বদ্বীপ পরিকল্পনা-২১০০’ এর মাধ্যমে জেগে ওঠা চরগুলো অর্থনৈতিক কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার ব্যাপক সুযোগ রয়েছে। যদিও জেগে ওঠা নতুন ভূমি ঘিরে সরকার অর্থনৈতিক অঞ্চল করার পরিকল্পনা করেছে। তবে সবার আগে দরকার বনায়ন। নতুন ভূমিতে ব্যাপকভিত্তিক বনায়ন সৃষ্টির উদ্যোগ নিতে হবে। এ ছাড়া জেগে ওঠা এসব নতুন ভূমিতে বসতিহীন প্রান্তিক মানুষের মাথা গোঁজার ঠাঁই দেয়ার পরিকল্পনা করা যেতে পারে। জেগে ওঠা চরগুলো মূল ভূখণ্ডের সাথে সংযুক্ত করতে ক্রসড্যাম বা আড়াআড়ি বাঁধ তৈরির পরিকল্পনা করতে হবে।
চরকেন্দ্রিক রয়েছে অর্থনৈতিক অমিত সম্ভাবনা ব্যাপক। এক একটি চর হয়ে উঠতে পারে এক একটি অর্থনৈতিক ক্ষেত্র। এ ছাড়া নতুন ভূমিতে কৃষিকাজ ও মাছ চাষের সম্ভাবনাও কাজে লাগানো যেতে পারে। চরকেন্দ্রিক পর্যটন সম্ভাবনাও ব্যাপক। প্রতিটি চর ও দ্বীপকে ঘিরে পর্যটন শিল্পের বিকাশের কথা বিবেচনা করতে হবে। সর্বোপরি বঙ্গোপসাগরের বুকে জেগে ওঠা ভূমিকে পরিকল্পিতভাবে ব্যবহার করতে পারলে ভূরাজনৈতিকভাবে অন্যান্য দেশের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হবে বাংলাদেশ। হ
sadonsarker2005@gmail.com
যখন জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবে বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলের বেশির ভাগ তলিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে; ঠিক তখন বঙ্গোপসাগরের বুক চিরে জেগে ওঠা ছোট ছোট ভূমি...
