প্রশাসন হলো কোনো প্রতিষ্ঠান, সংস্থা, সমিতি, ফোরাম ইত্যাদির পরিচালনা কর্তৃপক্ষ। লোকপ্রশাসনের কেন্দ্রবিন্দু হচ্ছে সরকার এবং সরকারের কার্যক্রম। অর্থাৎ এমন কোনো জায়গা নেই যেটি লোকপ্রশাসনের বহির্ভূত। যে কোনো প্রতিষ্ঠানের সফলতা-ব্যর্থতা নির্ভর করে একজন প্রশাসকের ওপর। তাই একজন দক্ষ প্রশাসককে হতে হয় একজন মাল্টিডিসিপ্লিনারি ব্যক্তিত্ব। পাবলিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশন বিভাগে পড়ানো হয় কিভাবে একজন দক্ষ প্রশাসক হতে হয়; স্বভাবতই পাবলিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশন বিভাগে পড়লে শিখতে হয় মৌলিক কিছু বিষয়।
মোদ্দা কথা, প্রশাসন অলৌকিক ক্ষমতাধর কোনো তৃতীয় পক্ষ নয় বরং সুষ্ঠু পরিচালনার লক্ষ্যে গঠিত একটি দলগত প্রচেষ্টার নাম। আমাদের দেশে বর্তমানে প্রশাসন ঘিরে গড়ে ওঠা সামাজিক চিত্র এ কথা স্বীকার করে না যে, প্রশাসন উন্নয়ন ও সংহতি রক্ষার লক্ষ্যে একটি দলগত প্রচেষ্টা। উল্টো নিজ স্বার্থ হাসিলে প্রশাসনের ছত্রছায়ায় আশ্রয় নেয়া এক ভীতিকর সুশীলসমাজ বৈ কিছু নয়! দেখা যাচ্ছে, বেশির ভাগ সময় ‘প্রশাসন’ শব্দটি মানুষের মনে-মুখে এখন ভীতি হিসেবে দেখা দিয়েছে। ‘প্রশাসন’ শব্দটি অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে কিছু ব্যক্তি স্বার্থসিদ্ধি, দলীয় কিংবা ব্যক্তিগত অপারগতার এক সহজ ব্যাখ্যা হিসেবে সবার সামনে তুলে ধরতে সদা তৎপর।
কিছু বাস্তবধর্মী ঘটনার সাহায্যে প্রশাসন, এর দায়িত্বহীনতা ও কর্মফল দিয়ে বিভিন্ন পক্ষের দুর্ভোগের পর্যালোচনা করা যেতে পারে। যেমনÑ একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, কতটুকুই তার ক্ষমতা? বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সাথে পেরে না ওঠার ভয়ে দিনের পর দিন নিজেদের আর শিক্ষার্থীদের ওপর অবিচার হতে দিয়ে থাকেন অনেকে। অসহায়ত্ব মানা যায় কিন্তু তৈলমর্দনকারী যারা নিজ স্বার্থ রক্ষায় শিক্ষক-শিক্ষার্থী মধ্যকার সম্মানের সম্পর্ক অনায়াসে কর্তৃপক্ষের হাতে বিকিয়ে দেন, তাকে কী বলা যেতে পারে? বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে ওঠে শিক্ষার্থীদের জন্য। শিক্ষকেরা ছাত্রছাত্রীদের অভিভাবক। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনে নামধারী গোষ্ঠীর স্বৈরতন্ত্রী আচরণ ও স্বার্থান্বেষী কার্যকলাপ রীতিমতো বিভীষিকায় রূপ নিয়েছে। ভাবখানা এমন যে, প্রশাসনই সব, শিক্ষার্থীরা কিছুই না, আগে প্রশাসন তার পর শিক্ষার্থী কিংবা শিক্ষকেরা। ফলাফল এ দাঁড়িয়েছে, ভালোবাসা আর আদর্শ নিয়ে এখন কেউ শিক্ষক হতে চান না। আমাদের দেশে স্বার্থ রক্ষায় সাদা-কালো টাকা এক হয়ে যায়। কেন হচ্ছে, আসলে কী উপায় নেই, নাকি দেখার কেউ নেই। নাকি থেকেও চোখ বন্ধ করে আছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। চাল, তেল, কম্বল এমনকি গ্যাস পর্যন্ত প্রশাসনের নাকের ডগা দিয়ে লোপাট হয়ে যাচ্ছে, জবাবদিহি করার কেউ নেই। কার সম্পদ? দেশের। লুটছেন কারা? দেশের মানুষ। আইন কে প্রণয়ন করবে? প্রশাসন। প্রশাসন কে? দেশের ক্ষমতাধর ব্যক্তিরা। আইন ভাঙছেন কারা? উত্তর সবার জানা। যা শুধু প্রশাসন ঘিরে চক্রাকারে ঘূর্ণায়মান।
অথচ একটি রাষ্ট্রের সব চেয়ে দরকারি হল প্রশাসন ব্যবস্থা। যে দেশের প্রশাসনব্যবস্থা ভঙ্গুর, সে দেশ ধীরে ধীরে বসবাসের অনুপযোগী হয়ে ওঠে। সরকারের প্রধান কাজ হলো রাষ্ট্রের নাগরিকদের মৌলিক চাহিদাগুলো পূরণ করা আর তাদের জান-মালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। কিন্তু এগুলা করবে কে? সরকার বা রাষ্ট্র নিজে কোনো জীবন্ত সত্তা নয়। তার জন্য দরকার প্রতিনিধি যা প্রশাসন নামে পরিচিত।
আমাদের দেশের প্রশাসন অনেক ক্ষেত্রেই দুর্নীতিগ্রস্ত। কিন্তু প্রশাসন তো আমাদের স্বার্থে গড়া প্রতিনিধি! তবে এখানে দুর্নীতিই বয়ে আনল কে? উত্তর একটাই, আমরা। দেশে বিভিন্ন খাতে সরকারের প্রশাসন এর সাথে জড়িত লোকের সংখ্যা কিন্তু বেশি নয়। আমরা আমজনতা তার থেকে অনেক বেশি। সুতরাং ভালো হওয়ার দায় শুধু প্রশাসনের নয়, বরং যাদের জন্য তারা দুর্নীতি চর্চার সুযোগ পাচ্ছে অর্থাৎ আমরাও সমান তালে দায়ী। নিজে খারাপ কাজ করা আর কাউকে দিয়ে করানো তো সমান কথা। দুই টাকা ঘুষ দিয়ে নিজের কাজটি আগে করিয়ে নিতে ব্যাকুল হবেন আর দোষ দেবেন প্রশাসন কেন নিলো, এটি কি সঠিক দৃষ্টিভঙ্গি? প্রশাসনের ভুল ফয়সালাগুলোর প্রতিবাদ না করে নিজ স্বার্থ ও নিরাপত্তা নিশ্চিতের লক্ষ্যে আজন্ম তেল দিয়ে যাবেন। আর স্বার্থে ঘা লাগলে সব দায় প্রশাসনের? এমন মানসিকতা ছাড়তে হবে।
স্বচ্ছতা, জবাবদিহি, কঠোর নজরদারি, যথাযথ আইনিব্যবস্থা ও সচেতনতায় এ ভয়াবহ জটিলতা কমিয়ে আনার পাশাপাশি দেশের প্রশাসনিক ব্যবস্থায় শক্ত ভিত গড়ে তুলতে হবে। আগামীর প্রজন্মকে ভীতি নয় বরং প্রশাসনের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ জন্মানোর পরিস্থিতি তৈরি করতে হবে। হ
লেখক : শিক্ষার্থী, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়