সর্বজনীনভাবে স্বীকৃতÑ ধূমপান যক্ষ্মা এবং ফুসফুসের ক্যান্সারসহ নানা রোগের অন্যতম কারণ। একই সাথে এর ধারক ও বাহক। বাংলাদেশে ১৫ বছরের বেশি বয়সী চার কোটি ১৩ লাখের বেশি মানুষ কোনো না কোনোভাবে তামাক সেবন করছেন। পরোক্ষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন এক কোটি ১৫ লাখ মানুষ। ধূমপান না করেও কেউ যেন পরোক্ষভাবে এর কুফলের শিকার না হয়, এ লক্ষ্যে দেশে প্রকাশ্যে ধূমপান নিষিদ্ধ করা হয়। আইনে সরকারি-বেসরকারি কার্যালয়সহ ২৪ ধরনের স্থানকে পাবলিক প্লেস ঘোষণা দিয়ে সেসব জায়গায় ধূমপান সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। আইনে খোলা জায়গা, পার্ক, মাঠ, বাস টার্মিনাল, স্টেশন, লঞ্চঘাট, রেস্তোরাঁ, খাওয়ার জায়গা এবং যেখানে মানুষ জড়ো হয় সেখানে ধূমপান নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তা ছাড়া, আইনে শিশুসহ অধূমপায়ীদের পরোক্ষ ধূমপান থেকে রক্ষায় কঠোর বিধান থাকলেও তা কতটা মানা হচ্ছে, এ নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।
অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, মাদকাসক্ত ব্যক্তিদের বেশির ভাগই ধূমপানের পথ ধরে নেশায় জড়িয়েছে। একজন ধূমপায়ীর সাধারণত একাধিক ধূমপায়ী বন্ধু থাকে। এভাবেই একজনের প্রভাবে অন্য বন্ধুরা মাদকাসক্ত হয়ে পড়ে। একবার যখন কেউ কোনো মাদক গ্রহণ করে, তখন সে একটির পর অন্য একটি মাদক গ্রহণ করে।
রাজধানীসহ দেশের সব বড় বড় শহর, বাজার, স্কুল-কলেজের আশপাশের মতো ব্যস্ত এলাকায় বা জনসম্মুখে বেপরোয়া ধূমপায়ীরা। এ বিষাক্ত ধোঁয়ায় অতিষ্ঠ হয়ে কেউ প্রতিবাদ করলে তাদের অনেকে উল্টো ধমকের স্বরে জবাব দেয়। পরোক্ষ ধূমপানের কারণে সবচেয়ে ঝুঁকিতে রয়েছে শিশু ও অন্তঃসত্ত্বা নারীরা। এ কারণে গর্ভের সন্তানও নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পড়ে। পরম নির্ভরতায় শিশুটি বাবার পাশে বসে খেলছে। আর ধূমপায়ী বাবাই কি না শিশুটির সবচেয়ে ক্ষতির কারণ হচ্ছেন, না বুঝেই। শিশুরা ধূমপানে বিষাক্ত ধোঁয়ায় হার্টের রোগ, শ্বাসকষ্ট, হাঁপানি, নিউমোনিয়া, ব্রঙ্কাইটিস ইত্যাদি রোগ হতে পারে। এক গবেষণায় দেখা গেছে, সিগারেটের বিষাক্ত ধোঁয়ায় শিশুর স্বাভাবিক বৃদ্ধি ও মানসিক বিকাশ ব্যাহত হয়। তাই শুধু জন সমাগমস্থল ও গণপরিবহন নয়, বাসায়ও ধূমপান পরিহার করা উচিত।
অন্য আরেক গবেষণায় দেখা গেছে, একজন ধূমপায়ীর ধূমপানের সময়ে কোনো অধূমপায়ী উপস্থিত থাকলে তারও একই সমস্যা দেখা দিতে পারে। সিগারেটের ধূমপানে নিকোটিনসহ ৫৬টি বিষাক্ত রাসায়নিক পদার্থ বিরাজমান। ২০১০ সালে প্রকাশিত বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার উদ্যোগে বিশ্বের ১৯২টি দেশে পরিচালিত একটি গবেষণা প্রতিবেদনে জানানো হয়, নিজে ধূমপান না করলেও অন্যের ধূমপানের (পরোক্ষ ধূমপান) প্রভাবে বিশ্বব্যাপী প্রতিবছর প্রায় ছয় লাখ মানুষ মারা যায়। এর মধ্যে এক লাখ ৬৫ হাজারই শিশু।
তামাক ও মাদক খুবই ভয়াবহ। তামাক ও মাদকের নেশা যুব সমাজকে ধ্বংস করে দিচ্ছে। দরিদ্র জনগোষ্ঠী ধূমপান ও তামাকের নেশায় অর্থ ব্যয় করছে। এতে এক দিকে তারা অসুস্থ হচ্ছে, অন্য দিকে কর্মক্ষমতা হারাচ্ছে। এতে তাদের সমস্যা যেমন বাড়ছে, তেমনি দেশেরও ক্ষতি হচ্ছে।
ধূমপান আইন মেনে না চলার প্রবণতা, জরিমানার পরিমাণ কম হওয়া এবং তামাক উৎপাদন ও বিপণনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর দাপট, এসব কারণে আইন প্রয়োগে হিমশিম খাচ্ছে সরকার। ২০১৩ সালের তামাক আইনের আইন অনুযায়ী, ওইসব স্থানে ধূমপায়ীকে অনধিক ৩০০ টাকা জরিমানা করতে হবে। যা আইনের মধ্যেই শুধু সীমাবদ্ধ থাকলেও বাস্তবে প্রয়োগ নেই। প্রকাশ্যে ধূমপান বন্ধে আইনের বিচারে এমন জরিমানা কঠিন পদক্ষেপের কোনো অংশ হতে পারে না। আইন প্রয়োগকারী কর্তৃপক্ষের এমন উদাসীনতার কারণেই আইনের প্রতি অনেকেই শ্রদ্ধাশীল নন।
ফিলিপাইন ও শ্রীলঙ্কায় প্রকাশ্যে ধূমপান করলে মোটা অঙ্কের জরিমানা গুনতে হয়। এ ছাড়া তামাকপণ্য বেচাকেনা এবং ধূমপান সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করার প্রথম দেশ হিসেবে রেকর্ড গড়েছে তুর্কমেনিস্তান। আমাদের দেশে একেবারে বন্ধ না হোক, অন্তত প্রকাশ্যে ধূমপান বন্ধ করা যেতে পারে। দেশে প্রকাশ্যে ধূমপান রোধে মোটা অঙ্কের জরিমানার বিধান প্রণয়ন এবং এর সঠিক প্রয়োগ করতে হবে। যেখানে সেখানে অবাধে বিড়ি-সিগারেট বিক্রি বন্ধে প্রশাসনকে কঠোর হতে হবে। মূলত তামাকের ব্যবসা বৈধ হলেও অনৈতিক। তামাকের ব্যবহার কমিয়ে আনতে সব তামাকের ওপর উচ্চহারে কর বৃদ্ধি করতে হবে। ভারত থেকে সীমান্ত এলাকা দিয়ে নেশা জাতীয় এক ধরনের পাতার বিড়ি বাংলাদেশে প্রবেশ করে। সেগুলোও বন্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। চিকিৎসকদের মধ্যে ধূমপানের নেশা কমিয়ে আনতে বাংলাদেশ মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন বোর্ডকেও পদক্ষেপ নিতে হবে। সচেতন দেশবাসী চায়Ñ সরকার যেন দ্রুত প্রকাশ্যে ধূমপান বন্ধে কঠোর আইন প্রণয়ন ও এর প্রয়োগ নিশ্চিত করে সুস্থ ও স্বাভাবিক জীবনযাপনের পরিবেশ সৃষ্টি করবে। হ
লেখক : প্রকৌশলী
vnazmulhussen@yahoo.com
সর্বজনীনভাবে স্বীকৃতÑ ধূমপান যক্ষ্মা এবং ফুসফুসের ক্যান্সারসহ নানা রোগের অন্যতম কারণ। একই সাথে এর ধারক ও বাহক। বাংলাদেশে ১৫ বছরের বেশি বয়সী চার কোটি ১৩...
