আর্থিক সচ্ছলতার আশায় বাংলাদেশের বহু নাগরিক বিদেশ যেতে হয়ে ওঠেন আগ্রহী। অনেকে উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে যান। সেখানে লেখাপড়ার পাশাপাশি বিভিন্ন কাজ করেন তারা। জায়গা-জমি বিক্রি করে বিদেশমুখী হন অনেকে। বাংলাদেশের তরুণেরাই পরিবারের মুখে হাসি ফোটাতে বেশির ভাগ সময় বিদেশ যাওয়ার প্রহর গুনেন। দারিদ্র্য থেকে মুক্তি পেতে ঝুঁকি নিয়ে বিদেশ যান তারা। শিক্ষার্থী ভিসায় সাধারণত যারা বিদেশ যান; তারা মেধাবী। তারা বিশ্বের নানা প্রান্তে লেখাপড়া করে পর্যাপ্ত সুযোগ সুবিধা পাওয়ায় আর দেশে ফিরে আসেন না।
কিন্তু সম্প্রতি বাংলাদেশী তরুণেরা ঝুঁকি নিয়ে ইউরোপ-আমেরিকার বিভিন্ন দেশে পাড়ি জমাতে জলপথে সাগরে ডুবে মারা যাচ্ছেন। এমন হৃদয়বিদারক খবর প্রায়ই আমরা গণমাধ্যমে দেখে থাকি। অনেক মা-বাবা আছেন, যারা একমাত্র সন্তানকে সব সঞ্চয় দিয়ে কিংবা জায়গা-জমি বিক্রি করে দালালের হাতে তুলে দেন। মানুষরূপী অনেক দালাল তাদের সন্তানদের যেভাবে বলে সেভাবে বিদেশ পাঠায় না। ঝুঁকিপূর্ণ পথে তাদের বিদেশ পাঠায়। এমন অনেক ঘটনা ঘটছে, আমাদের বহু তরুণ মানবপাচারকারীর কবলে পড়ে তাদের সর্বস্ব হারাচ্ছেন। অনেক সময় বন্দী করে মুক্তিপণ দাবি করছে মানবপাচারকারীরা। পরে দেখা যায়, মা-বাবা মুক্তিপণ দিয়ে তাদের সন্তানদের ফিরিয়ে আনছেন। এভাবে বাংলাদেশে অনেক পরিবার হচ্ছে সর্বস্বান্ত।
দারিদ্র্য থেকে মুক্তি পেতে দেশের অনেক তরুণ যারা কখনো ঢাকা দেখেনি তারাই সাইপ্রাস, আফ্রিকা, লিবিয়া, মেক্সিকো, কলম্বিয়ার পথে পাড়ি দিচ্ছেন আমেরিকা-ইউরোপের উদ্দেশে। এর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে লিবিয়া হয়ে ইউরোপ যাত্রা। বাংলাদেশ থেকে লিবিয়া পর্যন্ত নানা বিপদ কাটিয়ে ইউরোপে যাওয়ার স্বপ্নে বিভোর তরুণেরা ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ ভূমধ্যসাগরে ডুবে প্রাণ হারাচ্ছেন। এ সাগর দিয়ে বাংলাদেশীরা ঝুঁকি নিয়ে ইউরোপ যাওয়ার চেষ্টা করেন। কেউ ইউরোপে পাড়ি জমাচ্ছেন। সম্প্রতি লিবিয়া-সিরিয়া সঙ্কটে সাগর পাড়ি দিয়ে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে যাওয়ার প্রবণতা বেড়েছে। যাওয়ার পথে নৌকাডুবিতে মৃত্যু হচ্ছে কিশোর থেকে সদ্য যৌবনে পা দেয়া অনেক বাংলাদেশীর। লিবিয়া থেকে ইতালি মানবপাচারের একটি অতিপরিচিত পথ।
২০১৬ সালে ভূমধ্যসাগর, বিশেষ করে অভিবাসী পারাপারের রুট থেকে তিন হাজার ৭৭১ জনের লাশ উদ্ধার করা হয়। ২০১৭-২০১৮ সালেও অনেক লাশ উদ্ধার করা হয়। এর মধ্যে অনেকে ছিল বাংলাদেশের হতভাগা যুবক। উন্নত জীবনের আশায় সাগরপথে মধ্যপ্রাচ্য হয়ে ইউরোপ যাওয়ার পথে প্রাণ হারান অনেকে। মৃত্যুর পর যাদের লাশ পাওয়া যায় এবং যাদের পরিচয় জানা যায়, কেবল তাদের নাম আসে মৃত্যুর মিছিলে। বাকিদের ভাগ্যে কী ঘটেছে সে সম্পর্কে জানতে পারে না পরিবার-পরিজন। গত দুই-তিন বছরে ঝুঁকি নিয়ে ভূমধ্যসাগর দিয়ে প্রায় দুই লাখ অভিবাসী ইউরোপে ঢুকেছেন। তাদের মধ্যে আছেন বহু বাংলাদেশী।
আমাদের দেশে জুন-আগস্ট এই তিন মাস চলে মানবপাচারের রমরমা ব্যবসা। ইউরোপ যেতে আগ্রহীরা এ সময়ের অপেক্ষা করেন। এই তিন মাস সাগর শান্ত থাকায় দেশের অনেক তরুণ ছোট নৌকায় ঝুঁকি নিয়ে মাইলের পর মাইল সমুদ্রপথ পাড়ি দিয়ে যেতে চান। অনেক সময় পৌঁছে যায় স্বপ্নের ইউরোপে। কোনো কোনো সময় সাগরে সলিল সমাধি হয়। ২০১১ সালে লিবিয়ায় রাজনৈতিক অবস্থার পরিবর্তন হওয়ার ফলে এ ব্যবসায় জমজমাট হয়ে উঠেছে, এর সাথে যুক্ত হয়েছে কিছু বাংলাদেশী। ফলে মওসুমের তোয়াক্কা না করে সারা বছর ঝুঁকি নিয়ে অসংখ্য বাংলাদেশী ইউরোপে যাওয়ার চেষ্টা করছেন।
দেশের তরুণেরা বেকারত্বের অভিশাপ থেকে মুক্তি পেতে ঝুঁকিপূর্ণ বিদেশযাত্রীকে বেছে নিচ্ছেন। দেশে কর্মসংস্থান করতে পারলে তরুণদের এ প্রবণতা রোধ করা সম্ভব। সরকারের পাশাপাশি বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ব্যাপকভাবে গড়ে তুলতে হবে। অনেক প্রবাসী আছেন যাদের অর্থ ব্যাংকে অলস পড়ে আছে; সেই টাকা দেশে বিনিয়োগ করলে নতুন নতুন অনেক কর্মসংস্থান সৃষ্টি হতে পারে। তবে এ ক্ষেত্রে দেশে বিনিয়োগের পরিবেশ তৈরি করতে হবে সরকারকে। হ