এক দিকে আমাদের সমাজ যখন আধুনিকতার ছোঁয়ায় ভাসছে, অন্য দিকে, লোপ পাচ্ছে শিষ্টাচার, নৈতিকতা আর সৌজন্যবোধ। হারিয়ে যাচ্ছে মানবতা আর মনুষত্ব। সমাজে কমছে বড়দের মর্যাদা। ছোটদের ¯েœহ। কমছে গুরুজনের প্রতি শ্রদ্ধা আর ভক্তি। আজকের সমাজে শ্রদ্ধা, ভক্তি, ভালোবাসা যেন সোনার হরিণ। এর জন্য অবশ্য দায়ী বড়রাই। একটি শিশু বেড়ে উঠার সময় সে সমাজ ও পরিবারে যা দেখবে তাই শিখবে। সন্তান খারাপ হতে থাকলে ভাবতে হবে আমাদের নিজেদের মধ্যে সমস্যা আছে। কিন্তু তা না করে আমরা সন্তানের ওপর সব দোষ চাপিয়ে দেই। বড়রা গালি দিলে ছোটরা তা কেন শিখবে না? তাই বড়রা ঠিক থাকলে ছোটরাও ঠিক থাকবে।
স্কুল-কলেজে শিক্ষকেরা ক্লাসে ঢুকলে দাঁড়ানো আমাদের সমাজে শিষ্টাচার। এখনো শিক্ষার্থীরা দাঁড়িয়ে শিক্ষককে সম্মান করে বটে। তবে বাস্তবে সম্মান, শ্রদ্ধা ও ভক্তি করে দাঁড়ানোর মানসিকতা ছাত্রদের ভেতরে এখন প্রায় লোপ পেয়েছে। দেখা যায়, চলার পথে শিক্ষক বা বড়দের দেখে ছাত্ররা সালাম দেয়া তো দূরের কথা, পাশ কাটিয়ে চলে যায়। কারণ, তাদের বড়রা এ ধরনের শিক্ষা দেয়ার কথা এখন বিবেচনায় নিচ্ছেন না। আর শিক্ষা শুধু যে পরিবার থেকে আসবে তা নয়; সমাজ, বিদ্যালয়, বন্ধু, কর্মস্থল কিংবা কোনো সংগঠন থেকেও আসতে পারে। কিন্তু বাস্তবে সমাজ, পরিবার, স্কুল-কলেজ, বন্ধু-বান্ধব, বড়ভাই কিংবা সংগঠন কোথাও এ শিক্ষা এখন আর তেমন দেখা যায় না। পরিবর্তে সমাজে বিদ্যমান খুন, ধর্ষণ, হিংসা-বিদ্বেষ, পরকীয়া ও নারী নির্যাতনের এক অশুভ প্রতিযোগিতা চলছে।
এখন ছোটদেরও বড়দের ওপর আঘাত করতে দেখা যায়। যার ভেতর শিষ্টাচার, সৌজন্যবোধের ঘাটতি আছে, সে তো বড়দের আঘাত করবেই। এর দায় বড়দেরই নিতে হবে। আজকাল বড়রাই ছোটদের শিষ্টাচার, নৈতিকতা ও ভদ্রতা থেকে দূরে রাখছেন। তারাই ছোটদের নিয়ে কুকর্ম আর অন্যায় পথে হাঁটছেন। আমরা যদি বড়দের সম্মান না দেই, তা হলে ছোটরাও আমাদের সম্মান দেবে না, এটিই স্বাভাবিক। তাই সচেতন হতে হবে আপনাকে আমাকে। যার যার অবস্থান থেকে মানবিকতা, নৈতিকতা, নম্রতা, ভদ্রতা, শিষ্টাচার ও সৌজন্য প্রদর্শন এবং ভালো ব্যবহার করতে হবে। তবেই অন্যজন শিখবে। আমি অন্যের সাথে ভালো ব্যবহার করলে, তার বিনিময়ে আমিও ভালো ব্যবহার পাবো। তাই আগে নিজেকে সচেতন হতে হবে, তারপর অন্যকে সচেতন করার কথা ভাবতে হবে। নিজে অন্যায় করে অন্যকে উপদেশ দেয়া অন্যায়। এমন কাজ নিজের সাথে নিজের প্রতারণা। তাই আসুন আমরা প্রত্যেকে যার যার অবস্থানে থেকে সচেতন হই।
আসুন, ছোটদের স্নেহ আর বড়দের সম্মান দিয়ে আগে নিজেরা নিজেদের ঠিক করি। আত্মসমালোচনা করে নিজেকে শোধরানোর চেষ্টা করি। তখন আমাদের কাছে থেকে বড় বা ছোট সবাই শিক্ষা পাবে। মুখে নয়, কাজে শিষ্টাচারের প্রমাণ দিতে হবে। তবেই সমাজ একটু একটু করে বদলাবে। হ
লেখক : প্রাথমিক শিক্ষক,
চৌদ্দগ্রাম, কুমিল্লা