২১ এপ্রিল ২০১৯, দেশের কয়েকটি পত্রিকা, নিউজ পোর্টাল ও টেলিভিশনের খবরÑসিনিয়র সাংবাদিক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক খণ্ডকালীন শিক্ষক, ড্যাফোডিল ইউনিভার্সিটির বর্তমান শিক্ষক ও ষাটের দশকের ছাত্রনেতা মাহফুজ উল্লাহ মারা গেছেন। কিন্তু পরে জানা গেল, তিনি বেঁচে আছেন। অথচ সংবাদটি বাংলাদেশসহ অন্যান্য দেশে ছড়িয়ে যায়। ফেসবুক ছেয়ে যায় শোকের স্ট্যাটাসে। অথচ তিনি ইন্তেকাল করেন আরো কয়েক দিন পর ২৭ এপ্রিলে।
সাংবাদিক এবং পত্রিকার সম্পাদকদের অন্তত এটুকু দায়িত্ব ছিল, মৃত্যুর মতো একটি স্পর্শকাতর বিষয়ে সংবাদ পরিবেশনের ক্ষেত্রে তার পরিবারের কাছ থেকে খবরটি নিশ্চিত হওয়া। একজন মানুষকে মৃত বলার পরে যদি বলেন, তিনি বেঁচে আছেন, বিষয়টি কি দুঃখজনক নয়? ফলে এ ধরনের মিডিয়ার প্রতি মানুষের যে অনাস্থা তৈরি হবে তা বুঝতে কারো কষ্ট হওয়ার কথা নয়।
আমরা এর আগেও দেখেছি, ঢাকাই চলচ্চিত্রের খ্যাতিমান অভিনেতা নায়করাজ রাজ্জাককেও জীবিতাবস্থায় কয়েকটি মিডিয়া তার মৃত্যুর খবর পরিবেশন করে। পরে তার ছেলে নায়ক সম্রাট যখন বিষয়টি জানতে পারেন, তিনি অত্যন্ত ভারাক্রান্ত হৃদয়ে জানান, ‘বাবা বেঁচে আছেন। আপনারা কেন না জেনে এমন খবর প্রচার করছেন।’ কয়েকদিন আগে চলচ্চিত্র জগতের আরেক বিশিষ্ট পরিচালক, নির্মাতা ও অভিনেতা কাজী হায়াতকেও মিডিয়া মৃত ঘোষণা করেছিল। কিন্তু তার ছেলে মারুফ বিষয়টি শোনার পরে জানান ‘বাবা বেঁচে আছেন’। এমন ভুয়া খবর প্রচার করা হয়েছিল জনপ্রিয় অভিনেতা এ টি এম শামসুজ্জামানের বেলায়ও। কয়েকটি মিডিয়া তার মৃত্যু সংবাদ প্রচার করেছিল।
এখন সংবাদপত্র এবং পোর্টালগুলোর সবচেয়ে খারাপ দিক হিসেবে যেটি নজরে পড়ে তা হলোÑ যে নিউজটি বা বিষয়টি ফেসবুকে ভাইরাল হয়, তা নিউজ পোর্টালগুলো দ্রুত নিজেদের সাইটে পাবলিশ করে। পাবলিক যাতে পোর্টাল বা পত্রিকার পেজ থেকে ফেসবুকে বা অন্যান্য সোশ্যাল মাধ্যমে বেশি শেয়ার করেন। কিন্তু এ ক্ষেত্রে সাংবাদিকেরা এবং সম্পাদকরা সত্যতা যাচাইয়ে নিউজের সাথে যারা সম্পৃক্ত তাদের একটি ফোনকল দেয়ার প্রয়োজনও বোধ করেন না। যাচাইবিহীন ভাইরালের পিছু ছোটায় আজ সংবাদের সত্যতা হুমকির মুখে। যা আদৌ কাম্য নয়। পত্রিকার পর আসে টেলিভিশন। এখন নিউজ পোর্টাল। এরপর বিকল্প গণমাধ্যম সোশ্যাল মিডিয়া। ফলে মিডিয়া জগতে চলছে তীব্র প্রতিযোগিতা। কার আগে কে খবর পরিবেশন করবে, চলে এর প্রতিযোগিতা। ফলে ঘটছে তথ্য বিভ্রাট। সৃষ্টি হচ্ছে অনাকাক্সিক্ষত পরিস্থিতির। এদিক দিয়ে মিডিয়ার আয় পড়েছে হুমকিতে; এটি সচেতন সবাই বোঝেন। তাই বলে জীবিত মানুষকে মৃত বানানো নৈতিকতার মানদণ্ডে কতটুকু যুক্তিযুক্ত, তা গণমাধ্যমকর্মীদের ভেবে দেখতে হবে। তা না হলে তাদের গ্রহণযোগ্যতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা এখনো যা-ও আছে, তাও থাকবে না। আর কে না জানে, এই দুটো না থাকলে মিডিয়ার কী অবস্থা হবে।
মাহফুজ উল্লাহর ঘটনায় সবচেয়ে অদ্ভুত বিষয় ছিল এটি, কোনো সত্যতা যাচাই না করেই কিছু টিভি চ্যানেলের পোর্টালও লেখে, ‘সিনিয়র সাংবাদিক মাহফুজ উল্লাহ মারা গেছেন। বিস্তারিত আসছে...’। কিন্তু তারা যখন জানতে পারল, বাস্তবে তিনি তখন মারা যাননি, তখন অনেক টিভি চ্যানেল তার স্বজনের সাক্ষাৎকার নেয়। আর সাথে সাথে যেসব সংবাদমাধ্যম মৃত্যু সংবাদ প্রচার ও সম্প্রচার করে ওই সব টেলিভিশন চ্যানেল, পত্রিকা এবং নিউজ পোর্টালে মৃত্যু সংবাদ ইরেজ করে দেয়। সবাই ডিলেট করে দেয়। তাই টেলিভিশন চ্যানেল, পত্রিকা এবং নিউজ পোর্টালের সাংবাদিক ও সম্পাদকদের কাছে অনুরোধ, জীবিত কাউকে যেন আর মৃত বানানো না হয়। নিউজের এবং ভাইরালের সত্যতা যাচাই করেই তবে সংবাদ প্রচার করার প্রদক্ষেপ নিতে হবে। এটি মিডিয়ার বিশ্বাসযোগ্যতা ধরে রাখার স্বার্থেই। কারণ সবাই মিডিয়ার কাছে থেকে সত্য ও অনুসন্ধানী সংবাদ আশা করেন। তাই মিডিয়ার দায়িত্বশীল আচরণ সবার প্রত্যাশা। হ
লেখক : শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
mdeleashasandu.97@gmail.com