দেশে উন্নয়নের ধারাবাহিকতা চলমান। অর্থনীতির সূচকগুলোর অবস্থাও চোখেপড়ার মতো। বাড়ছে বিদেশী বিনিয়োগ। বাড়ছে জনপ্রত্যাশা। এসব কারণে এখন সামাজিক নিরাপত্তার অবস্থান এবং পরিস্থিতি বিশ্লেষণের সময় এসেছে। প্রশ্ন হচ্ছে, এত উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের মধ্যে সামাজিক নিরাপত্তা কতটুকু নিশ্চিত হচ্ছে? অর্থাৎ দেশের নাগরিকেরা সামাজিক ও দৈনন্দিন জীবনে কতটুকু নিরাপদ বোধ করছেন!
বাংলাদেশ ২০১৯ সালে বিশ্বের ৪১তম বৃহত্তম অর্থনীতির দেশে উন্নীত হয়েছে। ২০৩৩ সালের মধ্যে ২৪তম স্থানে পৌঁছে বিশ্বের শীর্ষ ২৫টি বৃহত্তম অর্থনীতির দেশের তালিকায় প্রবেশ করবে বলে আশা করা হচ্ছে। উন্নয়নের একটি গ্রহণযোগ্য সংজ্ঞাতে বলা আছে, অর্থনৈতিক উন্নয়নের পাশাপাশি সামাজিক উন্নয়নকে অবশ্যই পরিকল্পনা এবং বাস্তবায়নের আওতায় রাখতে হবে।
গেল মাসের সার্বিক পরিস্থিতি আমরা শুধু সড়ক দুর্ঘটনা ও অনাকাক্সিক্ষত অগ্নিকাণ্ডের ঘটনাগুলো বিবেচনায় রেখে বিশ্লেষণ করতে যাই, তাহলেও দেশ আজ ভয়াবহ বিপর্যয়ের মুখে। ভুলগুলো কিন্তু আজকের করা নয়, হঠাৎ করে নিজেদের সৃষ্ট এসব দুর্যোগ শুরু হয়নি। এখন যা হচ্ছে, তা আগের ভুলের মাশুল।
যমুনা টিভিতে সম্প্রচারিত প্রতিবেদন থেকে পাওয়া তথ্যানুযায়ী, চট্টগ্রাম দেশের বাণিজ্যিক রাজধানী। সেখানেও বেশির ভাগ নির্মাণে প্রথম দিকে বেশ অনিয়ম ছিল। ব্যবসায়ীরা অনিরাপদ জেনেও ঝুঁকি নিয়ে চালিয়ে যাচ্ছেন ব্যবসায়। দেশের বিভিন্ন স্থানে ছোট সেতু ধসে অচলাবস্থার সৃষ্টি হচ্ছে। কঠোর নজরদারির অভাবে এসব হচ্ছে বলে আমাদের বিশ্বাস। কোনো দুর্ঘটনার পরপর টিভি চ্যানেলগুলো বিজ্ঞজনদের নিয়ে বিশ্লেষণের আয়োজন করে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শুরু হয় হাহাকার। সেই সাথে বিপদ নিয়েও ব্যঙ্গাত্মক খবরাখবর।
‘উদাসীনতা’ আর ‘অনিয়ম’ শব্দ দু’টি দেশের বেশির ভাগ মানুষের ঘাড়ে জেঁকে বসেছে বলে মনে হয়। সরকার, গণমাধ্যম আর জনগণ যেটুকু করছে, তার অনেকটাই এর থাবায় আসল উন্নয়ন ব্যাহত করছে। কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে সারা দেশে কয়েকটি বিষয় মাথায় রেখে বিশ্লেষণ হয়। যেমনÑ আগে কী করা উচিত ছিল, কর্তৃপক্ষ কী করেছে এবং এমন প্রেক্ষাপট ঘিরে কী করা উচিত প্রভৃতি। এ বিশ্লেষণ কতটুকু ফলপ্রসূ হচ্ছে, তা প্রমাণসাপেক্ষ। তাই উন্নয়ন প্রশ্নবিদ্ধ হওয়াই স্বাভাবিক। সঠিক চিত্র তুলে ধরতে ব্যাপক ভিত্তিতে একটি গবেষণা চালান যেতে পারে, দেশের নাগরিকেরা মানসিকভাবে কতটুকু নিরাপদ বোধ করেন? তাদের উত্তর সরাসরি হ্যাঁ হবে না, অনায়াসে বলে দেয়া যায়। যথাযথ নিরাপত্তাবোধ দ্বিধাহীন সন্তুষ্ট আনে, আর যা একই সাথে দেশের উৎপাদনশীলতা এবং সম্ভাবনাকে ত্বরান্বিত করে।
একটি তত্ত্ব হচ্ছেÑ ‘প্রয়োজন বা চাহিদার পদসোপান’। এর একটি গুরুত্ববহ ধাপ হচ্ছে ‘নিরাপত্তা’। তত্ত্বটি পুরনো হলেও এটি বর্তমানেও এর উপযোগিতা কমেনি। বরং দিন দিন আরো বাড়ছে। এই সাথে এর প্রাসঙ্গিতা কেউ অস্বীকার করতে পারছেন না। আজ বাংলাদেশ যতটা সমৃদ্ধ; তা রক্ষা করা অনেকাংশেই নির্ভর করছে জনগণের নিরাপদতা বোধের ওপর। তা না হলে, উন্নয়ন স্বয়ংসম্পূর্ণ হবে না। যে ভুলগুলোর কারণে আজ কোটি কোটি টাকার ক্ষতি হচ্ছে, অবৈধ দখলদারিত্ব উচ্ছেদে যে বিপুল সম্পদের ক্ষতি হচ্ছে, সে ভুলগুলোর আর যেন পুনরাবৃত্তি না হয়; সেদিকে নজরদারি সময়ের দাবি। সচেতন জাতি হিসেবে নিজেদের প্রমাণ করার এখনই সময়। আমাদের চিন্তা, পরিকল্পনা এবং করণীয় সেই অনুযায়ী হওয়া অতীব প্রয়োজন। আমরা নিজ নিজ জায়গা থেকে সচেতন আর সচেষ্ট হলে তা উন্নয়নের ধারাবাহিক রক্ষা করতে সহায়তা করবে। আর অর্থনৈতিক উন্নয়নের পাশাপাশি সামাজিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত করতে দৃশ্যমান পরিবর্তন আনবে। হ
লেখকÑ শিক্ষার্থী বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়