আমাদের চিরচেনা মানবিক সমাজ আজ গভীর সঙ্কটে নিমজ্জিত। মানবিকতাবোধ দিন দিন লোপ পাচ্ছে। বাড়ছে বিচারহীনতা; যার কারণে বাড়ছে বর্বর ঘটনা। আমাদের শিক্ষা, সংস্কৃতি আদর্শগত শূন্যতার কারণে গভীর সঙ্কটের দিকে ধাবিত হচ্ছি আমরা। এমন সঙ্কটের মর্মে আছে, মানুষের মধ্যে নৈতিক পতনশীলতা ও অমানবিক কর্মকাণ্ড। শুধু অশিক্ষিত সমাজের মধ্যেই নয়, শিক্ষিত সমাজের মধ্যেও বর্বরতা-নিষ্ঠুরতা বাড়ছে ক্রমবর্ধমান হারে। বর্তমান সমাজে শুভবুদ্ধি আজ দুর্বল, পরাজিত, নির্যাতিত আর অসহায়। অন্য দিকে, অশুভ শক্তির জয় জয়কার। বিজয়ী ও পরাজিত উভয় মহলেই আজ মানবতা লাঞ্ছিত, অপমানিত আর পদদলিত।
রাষ্ট্র যখন গণতান্ত্রিক অবয়ব থেকে বেরিয়ে সমাজে বিভাজন তৈরির চেষ্টা করে এবং নাগরিকদের মধ্যে বৈষম্য চর্চার দরজা উন্মুক্ত করে দেয়; তখন একটি শ্রেণী রাষ্ট্র থেকে মাত্রাতিরিক্ত সুবিধা পায়। অন্য শ্রেণীটি হয় নিদারুণভাবে সুবিধাবঞ্চিত। রাষ্ট্রের ছত্রছায়ায় সুবিধাভোগী গোষ্ঠী আইনের তোয়াক্কা না করে সুবিধাবঞ্চিতদের ওপর নিষ্ঠুর আচরণ করে থাকে। বর্তমান বাংলাদেশের প্রতিটি জায়গায় এমন চিত্র লক্ষণীয়।
প্রশ্ন হচ্ছে, এর জন্য দায়ী কে, রাষ্ট্র নাকি দেশের নাগরিক? এর উত্তর খুঁজতে আমরা ক্লাইভ বেলের ‘সিভিলাইজেশন’ বা সভ্যতা নামক বইয়ের সাহায্য নিতে পারি। বেলের মতে, ‘রাষ্ট্র আর সভ্যতা এক জিনিস নয়। সভ্যতা সৃষ্টির ব্যাপারে রাষ্ট্র সহায়তা করতে পারে, কিন্তু সভ্যতা সৃষ্টি করতে পারে না। সভ্যতা সৃষ্টি করে ব্যক্তি। অর্থাৎ সুন্দরচিত্তের মানুষের প্রভাবে সভ্যতা সৃষ্টি হয়। যে যুগে ব্যক্তি অবসর ও নিরাপত্তা সূক্ষ্ম উপভোগের কাজে প্রয়োগ করে, যে যুগে মমত্ববোধের চেয়ে বিচারবোধ বড় হয়ে ওঠে, সে যুগই সুসভ্য যুগ। কেননা, তখনই মানুষের চিত্তের সমৃদ্ধি বড় হয়ে ওঠে।’
সাধারণ জনগণ আজ ঘুমন্ত। মাঝে মাঝে জেগে উঠলেও ফের ঘুমিয়ে পড়ে। এ সুযোগে অসুন্দরচিত্তের মানুষজন ভীষণভাবে সক্রিয় হয়ে উঠছে। ফলে সমাজে দ্রুত অসভ্যতা বিনা বাধায় জায়গা করে নিচ্ছে। মানুষ হয়ে মানুষকে কেটে টুকরো টুকরো করছে, আগুনে পুড়িয়ে মারছে, নারীর সম্ভ্রম হচ্ছে ভূলুণ্ঠিত। এর কোনো প্রতিকার নেই। বিচার চাওয়ার জায়গাও নেই। রাষ্ট্রীয় অঙ্গপ্রত্যঙ্গ প্রভাবশালীর দখলে। এ অবস্থাকে আমরা সভ্য বলতে পারি না। মানুষের মন থেকে সুন্দরচিত্ত হারিয়ে যাচ্ছে, অপসংস্কৃতি গ্রাস করছে ব্যক্তি থেকে পরিবার, সমাজ এমনকি রাষ্ট্রের প্রতিটি অঙ্গে। যেখান থেকে বা যার থেকে সভ্যতা সৃষ্টি হবে সেখানেই অসভ্যতা বেশি মাত্রায় চর্চা হচ্ছে। এর পেছনের কারণ হচ্ছে মূল্যবোধের অভাব।
কে কোন কাজটি করবেন বা কার ওপর কোন দায়িত্ব অর্পিত আছে, সেদিকে দৃষ্টি না রেখে যার যে কাজ নয়; তিনি তাই করছেন। ফলে দেশের সর্বোচ্চ আদালতের বিচারকেরা বলতে বাধ্য হচ্ছেন, ‘থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা (ওসি) যখন তখন কোর্ট বসায়, রাতেও বসায়, এত সাহস কোথায় পায় তারা?’ (বাংলাদেশ প্রতিদিন, ৩ এপ্রিল, ২০১৯)। সাহস কোথা থেকে পায় তা দেশবাসী সবার কমবেশি জানা। ২০১৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নির্বাচন করেছে পুলিশ। পুলিশের অত্যাচারে বিরোধী দলের কোনো লোক এলাকায় পর্যন্ত থাকতে পারেননি। এর বিনিময়ে তারা রাজনৈতিক প্রশ্রয়ে নিজেদের শতভাগ নিরাপদ মনে করেন। ফলে কোনো কিছুরই তারা তোয়াক্কা করেন না। বাংলাদেশে একটি নির্বাচনী সংস্কৃতি ছিল; যা পুলিশ বাহিনী ব্যবহার করে প্রতিপক্ষকে নির্মূল করার বাসনা থেকে অকার্যকর করা হয়েছে। এখন দেশের জনগণ এই নির্বাচনীব্যবস্থার ওপর আস্থা হারিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে অনুষ্ঠিত উপজেলা নির্বাচনে বেশির ভাগ ভোটার ভোট দেননি। অথচ গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি সৃষ্টিতে দেশের মানুষ দীর্ঘ দিন সংগ্রাম করেছেন, রক্ত দিয়েছেন। অথচ যে গণতন্ত্রের জন্য এতকিছু, সেই গণতন্ত্র আজ ঘোর অন্ধকারে হাবুডুবু খাচ্ছে।
অল্প কিছু মানুষের হাতে ক্ষমতা এবং সম্পদ চলে যাওয়া, ধনী-গরিবের বৈষম্য বেড়ে যাওয়া, জ্ঞানার্জনের চাইতে সস্তা খ্যাতির পেছনে দৌড়ানো, ধর্মীয় মূল্যবোধের অভাব, অপসংস্কৃতির আগ্রাসন, মিথ্যাকে প্রতিষ্ঠিত করার অপচেষ্টা, প্রতিহিংসা পরায়ণতা, আদর্শহীন রাজনৈতিক চর্চা এবং গণতন্ত্রকে লুণ্ঠিত করে জোর করে রাষ্ট্র পরিচালনার হীন মানসিকতাই আমাদের সমাজকে অমানবিক করে তুলছে। মানুষ এতটাই অমানবিক হয়ে গেছে, একটি বিশেষ দলকে ভোট দেয়ার অপরাধে চার সন্তানের জননীকে ধর্ষিত হতে হয়। প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক, কেন ধর্ষিত হওয়ার পর তনুকে হত্যার শিকার হতে হয়? কেন পুড়িয়ে মারা হয় নুসরাত জাহান রাফিকে ? কেন শত শত মানুষের সামনে কুপিয়ে হত্যার শিকার হয় বিশ্বজিৎকে ? এর জবাব দেয়ার কেউ কি নেই ? যে সমাজে বেশির ভাগ মানুষ অন্ধ, মূক ও বধির হয়ে যায়, ওই সমাজে এসব প্রশ্নের উত্তর আশা করা দুরাশা ছাড়া আর কিছুই নয়।
আমাদের সমাজের বেশির ভাগ জায়গা আজ অসভ্যতার চারণভূমি হয়ে যাচ্ছে। দেশে প্রতিনিয়ত এমন সব লোমহর্ষক ঘটনা ঘটছে, যার সামন্যই প্রকাশ পাচ্ছে। বিচারহীনতার সংস্কৃতির চরম দৌরাত্ব এসব নিষ্ঠুর কর্মকাণ্ড বিস্তৃতের জন্য দায়ী। বেদনার বিষয় হলোÑএ ক্ষেত্রেও সর্বোচ্চ আদালতের বিচারকদের বলতে হয়, ‘নুসরাত হত্যার তদন্ত যেন সাগর-রুনির হত্যা তদন্তের মতো হারিয়ে না যায়।’ বিচারহীনতার সংস্কৃতি আমাদের কতটা বিপদের দিকে ধাবিত করছে; তা এখনই চিন্তা করা উচিত।
আমাদের মধ্যে ইদানীং এক নতুন রোগ বাসা বেঁধেছে। আজ যে বিষয় নিয়ে তুলকালাম করে ফেলছি আগামীকাল নতুন আরেকটি বিষয় সামনে এলে আগেরটি বেমালুম ভুলে গিয়ে নতুনটি নিয়ে ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়ছি। যার কারণে পেছনের অনেক বড় বড় ঘটনা সহজেই বিচারের দীর্ঘসূত্রতার অতল গহ্বরে নিমজ্জিত হয়। ফলে অপরাধীরা আরো জঘন্য অপকর্ম করার সুযোগ পাচ্ছে। একটি বিচারহীন অঘটন আরেকটি অঘটন সৃষ্টিতে উৎসাহিত করে।
আমাদের সমাজ ও ব্যক্তি মননে কূটকৌশলে যে অসভ্যতার বীজ বপন করা হচ্ছে; তা অনিরাময়যোগ্য ক্যান্সারে রূপ নিচ্ছে। প্রথমেই যদি ক্যান্সারের চিকিৎসা করা না হয়, কিংবা ক্যান্সারকে অস্বীকার করা হয়; তাহলে এ ক্যান্সারের বীজ অতি দ্রুত রাষ্ট্র ও সমাজের সব স্তরে ছড়িয়ে পড়বে। তখন আর আরোগ্য লাভ বা সভ্য হওয়ার কোনো পথ খুঁজে পাওয়া যাবে না।
আমাদের মনের গহিনে অসভ্যতার যে ব্যাধি বাসা বেঁধেছে, তা থেকে নিষ্কৃতি পেতে সুশিক্ষা গ্রহণ করা প্রয়োজন। আমাদের সমাজে এখন অ্যাকাডেমিক সার্টিফিকেট অর্জনকারী ভুরি ভুরি শিক্ষিত লোক রয়েছে, আসলে তাদের অনেকেই সুশিক্ষায় শিক্ষিত হতে পারেননি। তারা নিজেদের সভ্য বলে দাবি করলেও সুসভ্য নন। সভ্য হতে হলে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার বাইরেও নৈতিক ও মানবিক শিক্ষার প্রয়োজন অতীব জরুরি। নতুবা নিজেকে যতই সভ্যতার অংশীদার বলে দাবি করুন, প্রকৃত অর্থে তারা কখনোই সভ্য বলে বিবেচিত হবেন না। সমাজের নামধারী বুদ্ধিজীবীর দৃষ্টিভঙ্গির দিকে দৃষ্টি দিলেই বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে যাবে। যেমনÑ পয়লা বৈশাখ বাংলা বছরের প্রথম দিন হিসেবে আমরা উৎসব হিসেবে পালন করে আসছে। কিন্তু এ দিনে মঙ্গল শোভাযাত্রা কিংবা সকালে পান্তা-ইলিশ খেতে হবে, এটি কী আমাদের সংস্কৃতির অংশ? আমাদের বুদ্ধিজীবী মহলের একটি অংশ যারা ধর্ম নিরপেক্ষতায় বিশ্বাসী তারা বলেন, এটি যারা করেন না বা এই রীতির বিরুদ্ধে তারা ধর্ম নিয়ে ব্যবসা করেন। প্রকৃতপক্ষে এ শ্রেণির লোকেরা মঙ্গল শোভাযাত্রা বা পান্তা ইলিশের নামে আমাদের সমাজে যে বিজাতীয় সংস্কৃতি প্রবেশ করছে, তা তারা দেখেও না দেখার ভান করছেন। এখন এই বুদ্ধিজীবীদের ধ্যান-ধারণা কি আমরা সভ্যতা বলতে পারি ? এই ধরনের অপ-সংস্কৃতি ধর্মনিরপেক্ষতার দোহাই দিয়ে আমাদের সংস্কৃতিতে অনুপ্রবেশ ঘটিয়ে তরুণ সমাজ অনৈতিকতার দিকে ঠেলে দেয়া হচ্ছে বলে আমরা মনে করি।
প্রতিনিয়ত আমাদের সমাজে ধর্ষণ, হত্যা, নারী নির্যাতন ও দুর্নীতির মতো বিভৎস ঘটনা মহামারীর আকার ধারণ করছে। এটিকে কি আমরা সভ্য সমাজের কর্ম বলতে পারি? এ ধরনের ঘটনা কি সমাজের জন্য অশনিসংকেত নয়? সমাজকে প্রকৃত ধারায় ফিরিয়ে আনার জন্য একটি শক্তিশালী সংস্কৃতির বড়ই প্রয়োজন। আর এ সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠায় আমাদের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পাশাপাশি নৈতিক ও মানবিক শিক্ষা গ্রহণ করতে হবে। অ্যাকাডেমিক শিক্ষার সাথে যখন নৈতিক ও মানবিক শিক্ষা প্রতিফলিত হয় এবং মানব সমাজ তার কাছ থেকে কিছু সুশিক্ষা গ্রহণ করে, তখনই সে সুশিক্ষিত ও সুসভ্য বলে দাবি করতে পারে। আমরা আধুনিক সভ্যতার সাথে তাল মিলিয়ে চলছি এ বিজ্ঞাপন প্রচার করে আর ধর্ম নিরপেক্ষতার দোহাই দিয়ে সমাজের মধ্যে বিষবৃক্ষ রোপণ করার চেষ্টা বুদ্ধিজীবীদের কাজ নয়। বুদ্ধিজীবীদের কাজ হচ্ছে একটি সুন্দর, রুচিশীল সভ্য সমাজ বিনির্মাণে ইতিবাচক ভূমিকা রাখা। তাদের জ্ঞান-প্রতিভা দিয়ে সমাজ থেকে অনাচার, অপসংস্কৃতি দূর করে রাষ্ট্রের নাগরিকেরা যাতে মানবিক হতে পারে সেই চেষ্টা করা। শেষ কথা হচ্ছে, আমাদের সমাজকে মানবিক করতে হলে সবাইকেই রুচিশীল আন্তরিকতা নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে। সবার আন্তরিকতা থাকলে একটি সভ্য-সুন্দর সমাজ গঠন করা অসম্ভব হবে না। হ
লেখক: কেন্দ্রীয় নেতা, স্বেচ্ছাসেবক দল