বর্তমানে বাংলাদেশে মিডিয়া নানামুখী চাপে সঙ্কুচিত আর জর্জরিত। ক্ষুধিত অক্টোপাসের বেষ্টনী ক্রমেই জোরদার হচ্ছে। প্রাণবায়ু নির্গত হয় হয় অবস্থা। গণতন্ত্র, সুশাসন যেখানে অনুপস্থিত, সেখানে মিডিয়ার সুষ্ঠু বিকাশ ও অগ্রগতি প্রত্যাশা করা বাতুলতা মাত্র। বাংলাদেশ তো বটেই, বিশ্বসমাজেও এ হতাশার চিত্র ক্রমান্বয়ে পরিস্ফুট এবং ভয়ঙ্কর হয়ে উঠছে। বিশ্বব্যাপী গণমাধ্যমের স্বাধীনতার যে সূচক, তাতে বাংলাদেশ চার ধাপ পিছিয়ে গেছে। গত ১৮ এপ্রিল বিশ্বজুড়ে প্রকাশ হওয়া খবরÑ ১৮০ দেশের মধ্যে বাংলাদেশের স্থান এবার ১৫০তম। গত বছর বৈশ্বিক সূচকে এ স্থান ছিল ১৪৬ নম্বরে। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ এবার সবার নিচে ঠাঁই পাওয়ার ‘গৌরব (!)’ অর্জন করেছে।
‘রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডার্স’ নামে ফ্রান্সের প্যারিসভিত্তিক সংস্থা সূচকটি প্রকাশ করেছে। এ সংস্থা সংবাদপত্রের স্বাধীনতার পক্ষে কাজ করে থাকে। সংস্থাটির প্রকাশিত প্রতিবেদনে বাংলাদেশ সম্পর্কে যা বলা হয়, তা বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। উঠে আসা সেই চিত্র গভীর উৎকণ্ঠার ও উদ্বেগের। বলা হয়েছে ‘ক্ষমতাসীনদের কঠোর নীতির শিকার হচ্ছেন যেসব ব্যক্তি, তাদের মধ্যে এ দেশের সাংবাদিকেরা অন্যতম। ২০১৮ সালের জাতীয় নির্বাচনের প্রচারণার সময় বাংলাদেশের গণমাধ্যমের স্বাধীনতার লঙ্ঘন বেড়েছে। পেশাগত দায়িত্ব পালনের সময় রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের হামলার শিকার হয়েছেন সাংবাদিকেরা। বন্ধ করা হয়েছে সংবাদভিত্তিক ওয়েবসাইট, উদ্দেশ্যমূলকভাবে গ্রেফতার করা হয়েছে সাংবাদিকদের।’ বাংলাদেশে সরকারের অসন্তোষের কারণ হওয়া ব্যক্তিদের কণ্ঠরোধের চেষ্টার উদাহরণ হিসেবে প্রতিবেদনটিতে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন আলোকচিত্রী ড. শহিদুল আলমকে গ্রেফতারের ঘটনার কথা উল্লেখ করা হয়।
আর কী কী পর্যবেক্ষণ রয়েছে রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডার্সের ওই রিপোর্টে? বাংলাদেশ সম্পর্কে আরো বলা হয়, ২০১৮ সালের অক্টোবরে পাস হয়েছিল যে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন, তা বাংলাদেশ সরকারের সাম্প্রতিক অস্ত্র হয়ে উঠেছে। ‘নেতিবাচক প্রচারণার’ সাজা হিসেবে এ আইনে সর্বোচ্চ ১৪ বছরের কারাদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। এ তো গেল আন্তর্জাতিক মহলে আমাদের সুনাম ও মর্যাদা বাড়ানোর (!) প্রসঙ্গ, সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশে সাংবাদিকতার স্বাধীনতার চিত্রটি কেমন, তার হালহকিকত কোন পর্যায়ে, তা সচেতন ব্যক্তিমাত্রই জানেন। মিডিয়ায় বিরাজ করছে অস্থিরতা, সাংবাদিক ছাঁটাই চলছে বেধড়ক। পেশায় তৈরি হয়েছে এক দমবন্ধ করা পরিস্থিতি। রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হয়েছে যেসব মিডিয়া, সেগুলো খুলে দেয়ার ন্যূনতম কোনো আলামত দৃশ্যমান নয়। জাতীয় নির্বাচনের নামে যেমন প্রহসন হয়েছে, এ যেন তারই উল্টো পিঠ। সাংবাদিক লাঞ্ছনা, হত্যার ঘটনা বিগত বছরগুলোতে বেড়েছে। সচেতন মানুষ নিশ্চয়ই বিস্মৃত হননি, ২০১২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে, সাত বছর আগে সংঘটিত সাংবাদিক দম্পতি সাগর-রুনি হত্যার কোনো কিনারা আজো হয়নি। তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছিলেন, ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে খুনিদের ধরা হবে। তৎকালীন আইজিপি বলেছিলেন, সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ডের তদন্তে ‘প্রণিধানযোগ্য অগ্রগতি’ হয়েছে। পাঠকদের আরো স্মরণ করিয়ে দিতে চাই, বন্ধ করে দেয়া দিগন্ত টিভি, ইসলামিক টিভি সম্পর্কে বিগত সরকারের তথ্যমন্ত্রী বলেছিলেন, এ বন্ধ ‘সাময়িক’। এই ‘সাময়িক’ বিষয়টির সংজ্ঞা যে আসলে কী, তা সরকারই ভালো বলতে পারবে। দৈনিক ‘আমার দেশ’ রাজরোষে পড়ে এখনো অন্ধকারে মুখ থুবড়ে পড়ে আছে। সরকারের মাধ্যমে সংবাদপত্র, সাময়িকী বন্ধ ঘোষিত বা বন্ধ ঘোষণায় বাধ্য হওয়ার শিকার কতগুলো? দুই শতাধিক। সংখ্যাটি অতীব আশঙ্কাজনক, এতে কোনো সন্দেহ নেই। বিজ্ঞাপন বন্ধ করে দেয়া, বিজ্ঞাপন না দিতে প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ চাপ সৃষ্টি, হুমকি দিয়ে, নিবর্তনমূলক ব্যবস্থা নিয়ে উদ্দেশ্য হাসিল করা হচ্ছে।
আমরা জানি, গত এক দশকের সময় পরিধিতে বহু সাংবাদিক নানাভাবে হয়রানির শিকার হয়েছেন। মামলার পর মামলা দিয়ে পর্যুদস্ত, বিধ্বস্ত করে ফেলা হয়েছে অনেক সাংবাদিক-সম্পাদককে। রাজনৈতিক মহল, তাদের মদদে প্রভাবপুষ্ট প্রেশার গ্রুপ তুচ্ছ, ছেঁদো ঘটনায় মামলা ঠুকছে। অথচ সংবাদপত্রের বিরুদ্ধে কথিত অভিযোগ যাচাই-বাছাই, প্রতিকার-প্রতিরোধ এমনকি দণ্ডবিধানে সরকারের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ প্রেস কাউন্সিল রয়েছে। কিন্তু সেই প্রতিষ্ঠানের দ্বারস্থ না হয়ে প্রতিহিংসা চরিতার্থ করার মানসে আদালতের আশ্রয় নেয়া হচ্ছে। দায়ের করা হচ্ছে ফৌজদারি মামলা। এসব পদক্ষেপ যে গণতন্ত্র, মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকারের মূলে কুঠারাঘাত, তা উপলব্ধি করার মতো বোধ বুদ্ধিরও ঘাটতি লক্ষণীয়। মিডিয়া নিষ্পেষণের আরো করুণ চিত্রও রয়েছে, যা সাধারণ মানুষের গোচরে আসে না সচরাচর। আমরা জানি, প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার বেশির ভাগ হাউজেই সংবাদকর্মীদের বেতন-ভাতা বকেয়া পড়ে থাকছে মাসের পর মাস। এমনকি বছরের পর বছর। ছাঁটাইয়ের নির্মম নিষ্ঠুর খড়্গ তো ঝুলছেই। ক্রমেই তা প্রসারিত হচ্ছে। বেকারত্বের অভিশাপ, জীবনযাপনের অনিশ্চয়তার অন্ধকার গ্রাস করছে যোগ্য মেধাবী সাংবাদিকদের। নৈরাশ্যকবলিত হয়ে পেশা পরিবর্তনে বাধ্য হচ্ছেন কেউ কেউ। দারিদ্র্যের কারণে কেউ আত্মহত্যার পথ পর্যন্ত বেছে নিচ্ছেন। সত্য তুলে ধরা, স্পষ্ট ভাষণের মূল্য অনেক। প্রভাবশালী মহলের বিরাগভাজন হয়ে সম্মান ও জীবন রক্ষার্থে একাধিক সাংবাদিক দেশত্যাগে বাধ্য হয়েছেন, এমন নজিরও বিরল নয়।
উন্নয়নের জোয়ারে ভাসছে দেশ। ‘গঠনমূলক’ সেই প্রচারের প্রাবল্যে প্রকৃত গণতন্ত্রের চর্চা ও বিকাশের ক্ষেত্র ক্রমে ছোট হয়ে আসছে। মুখ থুবড়ে পড়েছে গণতন্ত্র, ভোটাধিকার এবং মানবাধিকার। বিচারহীনতার মর্মান্তিক ও বিধ্বংসী সংস্কৃতি দৃঢ়মূল হচ্ছে ক্রমাগত। জাতীয়পর্যায় থেকে শুরু করে স্থানীয় সরকার এমনকি ডাকসু নির্বাচনেও যা ঘটল সত্যি নজিরবিহীন। নির্বাচন ব্যবস্থা জোরালো, অবাধ, সুষ্ঠু নিরপেক্ষ হওয়ার পরিবর্তে ভেঙে পড়েছে বালির বাঁধের মতো। এ কলঙ্ক মোচন কবে হবে, আদৌ হবে কি না, তা কারো জানা নেই।
এক সময় বেসরকারি টিভি চ্যানেলের টকশো তুমুল জনপ্রিয় ছিল। দেশের সমকালীন রাজনৈতিক, সামাজিক সমস্যাগুলো সম্পর্কে বিশ্লেষণ থাকত ওই সবে, সঙ্কট থেকে উত্তরণ, সমাধানের উপায়-পদ্ধতি সম্পর্কে আলোচনা তর্ক-বিতর্ক হতো। কিন্তু সেই টকশোর জনপ্রিয়তায় ধস নেমেছে। আগে জমজমাট তর্ক বিতর্ক, যুক্তি, পাল্টা যুক্তির ধারাক্রম টকশোকে প্রাণবন্ত করে তুলত। নির্দিষ্ট মহল থেকে এখন প্রেসক্রিপশন দেয়া হয়, কাকে নেয়া যাবে, আর কাকে নেয়া যাবে না। এ ‘উপদেশ বা পরামর্শ’ চ্যানেলগুলো হজম করছে। না করে উপায় নেই। কারণ, কারো ঘাড়েই দু’টি মাথা নেই। ফলে যা হওয়ার, তাই হয়েছে। নীরস, প্রাণহীন, একঘেয়ে, শুষ্কং কাষ্ঠং অবস্থায় পর্যবসিত হয়েছে টকশোগুলো। পুরনো নতুন আইন কানুনের নিগড়ে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা এমনই প্যাঁচে পড়েছে যে, আতঙ্কিত উৎকণ্ঠিত সংবাদকর্মীরা সেলফ সেন্সরশিপে বাধ্য হচ্ছেন। নিজেদের বাঁচানোর লক্ষ্যে নিয়ত আপস করতে হচ্ছে তাদের। অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার যে গৌরবময় অধ্যায় এ দেশের সাংবাদিকতাকে এক সময় উজ্জ্বল করে তুলেছিল, তা এখন এক কথায় ভূলুণ্ঠিত। এ পতনপ্রবণতা যে কিভাবে রোধ করা যাবে, তা একমাত্র আল্লাহ জানেন।
মিডিয়ায় চাকচিক্য জৌলুস চটকদারিত্ব বেড়েছে, এতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু তার আত্মা কতটা স্বাধীন? জনমনে সঠিক তথ্য পাওয়ার যে তীব্র চাহিদা ও তৃষ্ণা, তার কতটা পূরণ করতে পারছে আমাদের মিডিয়া? সরল সোজা পথে তথ্য যদি না পাওয়া যায়, সঠিক খবরটি না জানা যায়, তাহলে ভোক্তা বাঁকা পথে যাবেন। এটি রোধ করা সম্ভব নয়। সংবাদপত্র, টিভিতে পরিবেশিত তথ্য যদি ভোক্তার চাহিদা পূরণ করতে না পারে, তাহলে সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে সেই চাহিদা মেটানোর প্রবণতা বাড়বে। সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে সরবরাহ করা তথ্যের একিউরেসির গ্যারান্টি দেয়ার কেউ নেই। পল্লবিত হয়ে তথ্য বিকৃত হতে থাকবে, সমাজে অস্থিরতা তৈরি হবে। খারাপ অনভিপ্রেত কিছু ঘটতে থাকবে। তা ঠেকানো সহজ হবে না। যারা এসবের হোতা, তারাও মহাবিপদে পড়বেন। তথ্য চেপে যাওয়ার বিপদ অনেক। ভয়াবহ ও বহুমুখী। সুশাসনের আকাল যতদিন থাকবে, ততদিন আশা-ভরসা বলতে কিছু নেই। টানেলের অপর প্রান্তে আলোর কোনো ইশারা-আভাস দেখতে পাওয়ার সম্ভাবনাও নেই।
সঙ্কটের মাত্রা ক্রমেই বহুধাবিস্তৃত হচ্ছে। কার্যকর ও শক্তিশালী বিরোধী দল দেশে নেই। গণতন্ত্র যে কোমায় চলে যাচ্ছে, সেটি ঠেকাবে কারা? একচেটিয়া সবকিছুই চলছে। ফলে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা থেকে যাচ্ছে অধরা। তা এক ধরনের আকাশকুসুম কল্পনা হয়েই থেকে যাচ্ছে। এই সর্বগ্রাসী সঙ্কট মোকাবেলার কায়দা-কৌশল এবং এ থেকে পরিত্রাণের উপায় কী আদৌ আছে? সেসব কী? বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবী অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী সম্প্রতি তার এক রচনায় বলেছেন, ‘শাসকশ্রেণী স্বেচ্ছায় জনগণকে ক্ষমতাবান করা দূরে থাক, জনমাধ্যমে তাদের ক্ষোভ-বিক্ষোভের কোনোরকম প্রকাশকেই সহ্য করবে না। সহ্য যাতে করে, তার জন্য চাপ প্রয়োগ করতে হবে। আর সেই চাপটা যে দু’টি জায়গা থেকে আসতে পারে, তাদের একটি হচ্ছে ওই জনমাধ্যম নিজে এবং অপরটি যেটি আরো জরুরি, সেটি হলো বিকল্প রাজনৈতিক শক্তির বিকাশ। দ্বিতীয়টি গড়ে ওঠা সময়সাপেক্ষ। কিন্তু প্রথমটি অর্থাৎ জনমাধ্যম, দ্রুতই নিজেকে সংগঠিত করে তুলতে পারে, যদি জনমাধ্যমের কর্মীরা ঐক্যবদ্ধ হন।
সাংবাদিকদের ঐক্য পাকিস্তান আমলে ছিল, যে জন্য কোনো সংবাপত্রের ওপর আঘাত এলে দেশজুড়ে প্রতিবাদ উঠত। সেই ঐক্য এখন আর নেই। শাসকশ্রেণী সাংবাদিক ও জনমাধ্যমের কর্মীদের বিভক্ত করে ফেলেছে, এ জন্যই জনমাধ্যম এখন অত বিপন্ন।’ হ
লেখক : সম্পাদক, দৈনিক দেশ বর্তমান