আল কুরআনে সূরা বাকারায় বর্ণিত হয়েছেÑ মানুষের আদি পিতা আদম আ:-কে সৃষ্টি করে জান্নাতে অবস্থানের প্রাক্কালে আল্লাহ এ মহাবিশ্বের সব বস্তুর নাম শেখান ও চেনান। মানুষের সব তথ্যজ্ঞান মূলত বস্তুর নামের সাথে জড়িত। আল্লাহ বলেন, আমার প্রতি বিশ্বাস স্থাপনে দুনিয়ায় অসংখ্য নিদর্শন সৃষ্টি করে রেখেছি। এ নিদর্শন আমি আমার প্রত্যেক সৃষ্টির মধ্যেও দিয়েছি। আমার সব সৃষ্টির প্রতি দৃষ্টিপাত করো এবং এ বিষয়ে চিন্তা করো এবং এ দিয়ে ওই সব সৃষ্টবস্তুর স্রষ্টার অস্তিত্বের দলিল ও প্রমাণ অনুসন্ধান করো। জীবদেহ কোষ দিয়ে গঠিত। কোষের মাঝের কেন্দ্র নিউক্লিয়াস, যা সব জীবের বৈশিষ্ট্যের প্রকাশ ঘটায়।
আবার ওই কেন্দ্রিকতাতে যে ক্রোমোজোম থাকে, তাই মূলত জীবের ডিএনএ; যাকে বলা হয় আল্লাহর নির্দেশ বা জীবনের দোষগুণের নীল নকশা। বৈজ্ঞানিক গবেষণায় আলোক কণা ও তরঙ্গ এ দ্বৈত সত্তা বর্ণনা করা হয় এবং আলোর মৌলিক এককের নাম দেয়া হয়েছে ফোটন। ফোটনের মূলশক্তি বিদ্যুৎ চৌম্বকীয় শক্তি। ফোটন মূলত একটি শক্তির আধার। এ আধারে সঞ্চিত হলে তা বিদ্যুৎ চৌম্বকীয় শক্তি হিসেবে প্রকাশ পায়। ফোটনকেও আল্লাহর নির্দেশ বলা হয়। সব প্রকার মৌলিক পদার্থের পারমাণবিক সংখ্যা দিয়ে তার মৌল পরিচয় বা চিহ্ন নির্দেশ করে। ঈমানের মৌল উপাদান বা চিহ্ন হলো তৌহিদ, রিসালাত ও আখিরাত।
মহাকাশ সম্পর্কে আল্লাহ গবেষণা করতে বলেছেন। যিনি সাত আকাশ সৃষ্টি করেছেন স্তরে স্তরে, আল্লাহর সৃষ্টিতে তুমি কোনো খুঁত দেখতে পাবে না। অতঃপর ফের দৃষ্টি ফেরাও। কোনো ফাটল দেখতে পাও কি? (সূরা মূলক) সৃষ্টিজগত সম্পর্কে প্রচুর গবেষণা, গভীর পর্যবেক্ষণ চুলচেরা বিশ্লেষণ এবং বিভিন্নমুখী বাস্তব অভিজ্ঞতার পর বিজ্ঞান এটি প্রমাণ করেছেÑ যাবতীয় কল্যাণ আর ইতিবাচক সৌন্দর্য।
নিখুঁত অবকাঠামো এবং পূর্ণতা করাই হচ্ছে প্রকৃতির বিধান আর সৃষ্টির মূল তাৎপর্য ও উদ্দেশ্যও তাই। অর্থাৎ যাবতীয় সৃষ্টির মাঝে পূর্ণতা বিধান করাই মহান স্র্রষ্টার ইচ্ছা ও অভিপ্রায়। এ বক্তব্যের সপক্ষে প্রমাণ হচ্ছেÑ সৃষ্টি সম্পর্কিত বিজ্ঞানের সব সূত্রই, এ মর্মে ঐকমত্য পোষণ করে যে, সৃষ্টির সব প্রকার মৌল উপাদান প্রকৃতির মধ্যে যে শৈল্পিকতা ও নৈপুণ্যের পূর্ণতা বিধান করা হয়েছে; তাতে প্রতিটি সৃষ্টির ক্ষেত্রে এর চেয়ে নিখুঁত ও সুন্দর আর কিছু কল্পনা করার সাদৃশ্য মানুষের নেই।
পদার্থ বিজ্ঞান, রসায়নবিদ্যা, উদ্ভিদবিদ্যা ও প্রাণীবিদ্যা, মহাকাশ বিজ্ঞান, ভূতত্ত্ববিদ্যা, দেহতত্ত্ববিদ্যা, সমুদ্রবিদ্যা, অন্যান্য সব বিশেষায়িত বিজ্ঞানের পূর্ণসূত্র এবং বিজ্ঞানের গবেষণায় এটি প্রমাণিত হয়েছে যে, জগতের যাবতীয় সৃষ্টির ক্ষেত্রে শৈল্পিক নৈপুণ্য ও নিখুঁত কাঠামো মহান সৃষ্টির অতুলনীয় শৈল্পিক উৎকর্ষতা অসাধারণ কুদরত ও অসীম হিকমত এ সবই পবিত্র কুরআনের সৃষ্টি সম্পর্কে সেই ঘোষণার সত্যতা প্রমাণ করে। যেখানে বলা হয়েছে, যিনি তার প্রত্যেকটি সৃষ্টি সুন্দর করেছেন (সূরা আস সাজদাহ-৭)। এ ধরাপৃষ্ঠে সব সৃষ্টির মধ্যে রয়েছে সৌন্দর্য, নিখুঁত শৃঙ্খলা, অপূর্ব প্রতিসাম্য।
প্রতিসাম্য পাশ কাঠামোও আছে এবং এ দুই মিলেই প্রকৃতির অনন্ত বৈচিত্র্য। এ শৃঙ্খলা ভাঙার মধ্যেও রয়েছে আরেক শৃঙ্খলা। প্রকৃতি একটি ব্যবস্থাপনা, ব্যবস্থাপক নয়। প্রকৃতি স্বাভাবিক একটি বিধান; বিধানদাতা হওয়া তার পক্ষে অসম্ভব। প্রকৃতি আল্লাহর চমৎকার অভিনব নকশা। নকশাকারী হওয়া অসম্ভব। প্রকৃতি নিজেই একটি আইন। এর কোনো শক্তি নেই। প্রকৃতি নিজেই একটি প্রক্রিয়া। অস্তিত্বের কোনো উৎস নয়। প্রকৃতি আল্লাহর নিদর্শনের এক মহাগ্রন্থ; কিন্তু সে গ্রন্থের গ্রন্থকার নয়।
আধুনিক বিশ্বের যত প্রযুক্তি ও তত্ত্ব জ্ঞান বিজ্ঞানের উৎকর্ষতা আমরা ভোগ করছি; তা সবই এসেছে আবিষ্কারক, প্রকৌশলী, বিজ্ঞানী, শিল্পী, শিক্ষক, কবি, সাহিত্যিক, চিকিৎসাবিদ ও দার্শনিকদের গবেষণা থেকে। অনাগত ভবিষ্যতে আরো কত কিছু মানুষ জানবে তা কল্পনা করা যায় না। সে জন্য আল্লাহ বলেন, ‘যদি তোমরা আল্লাহর নিয়ামত গণনা করতে চাও তবে তা তোমাদের দ্বারা সম্ভব হবে না।’ বর্তমান বিশ্বের বিজ্ঞানের সব ক্ষেত্রে যে অগ্রগতি হয়েছে মহাবিশ্বের সব বস্তুর চূড়ান্ত জ্ঞানের কতটুকু জানতে পেরেছি আমারা। তার পরিসংখ্যান হয়তো কোনো দিন জানা যাবে না। আমাদের সব জ্ঞান পূর্বপুরুষ হজরত আদম আ: থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম হয়ে এ পর্যন্ত এসেছে।
সৃষ্টির সব জ্ঞানের তথ্য আমাদের মস্তিষ্কে ১০০ বিলিয়ন অর্থাৎ ১০ হাজার কোটি নিউরন কোষে ধারণ করা আছে। একটি নিউরন কার্যত একটি সুপার কম্পিউটার। মহাবিশ্বের সব জ্ঞানের তত্ত্ব এতে দেয়া আছে। এ নিয়ে গবেষণা ও জানার চেষ্টা করবে যে, সে সংজ্ঞা বা ধারণার মাধ্যমে সঠিক সত্যকে জানতে পারে। বিজ্ঞানের সব প্রকার প্রাকৃতিক নিয়ম ও সূত্র প্রজ্ঞাপ্রসূত জ্ঞান ও পরীক্ষা-নীরিক্ষার মাধ্যমে আবিষ্কৃত হয়েছে।
সংজ্ঞার মাধ্যমে প্রকৃত সত্যের ধারণা আসে। এ ধারণার সাহায্যে বিজ্ঞানীরা প্রকৃত সত্যে পৌঁছতে গবেষণা আর পরীক্ষা-নিরীক্ষার সাহায্যে একটি বিধান বা সূত্র আবিষ্কার করেন। হানেমান উইলিয়াম কালেনের বিখ্যাত মেটেরিয়া মেডিকা থেকে ধারণা পেলেন সিংকোনা কম্পজ্বর ওষুধরূপে ব্যবহৃত হয়, সেই ওষুধটিই বৃহৎ মাত্রায় প্রয়োগ করলে কম্পজ্বর সৃষ্টি হয় বলে উল্লেখ করা আছে।
হানেমান স্থ’ূল মাত্রায় সিংকোনা সেবন করে এর যথার্থতা প্রমাণ পেলেন। সেই ওষুধ সূক্ষèমাত্রায় প্রয়োগে আরোগ্য লাভ করেন। এটাই সদৃশ নীতিÑ Similia, Similibus & Curentur অর্থাৎ Likes cure likes ওষুধটি গুণাগুণ সম্পন্ন বস্তুর মধ্যে যে লক্ষণগুলো সুস্থদেহে প্রুভিং করা হলে যে সব লক্ষণ নিদর্শন বা বৈশিষ্ট্য প্রকাশ পায়, তা প্রাকৃতিক রোগীর দেহে অনুরূপ বৈশিষ্ট্য (নিদর্শন) প্রকাশ পেলে সৃদশ নিয়মে আরোগ্য লাভ করবে। বিজ্ঞানীদের হিসাব মতে, আমাদের এ পৃথিবী সূর্যের অস্তিত্বের ওপর নির্ভরশীল। সূর্যের মধ্যে যে পরমাণু শক্তি রয়েছে, তা নিঃশেষ হতে আরো পাঁচশত কোটি বছর সময় লাগবে। অর্থাৎ সূর্যের অস্তিত্বের ওপর নির্ভর করে পৃথিবীর অস্তিত্ব।
সে পর্যন্ত মানুষ পৃথিবীতে থাকলে মহাবিশ্বের সব বস্তুর চূড়ান্ত জ্ঞান লাভ করতে পারবে কি না তা বলা কঠিন। অর্থাৎ পৃথিবীতে আমরা যা কিছু দেখি, তা আপেক্ষিক সত্য। চূড়ান্ত সত্য নয়। মহাবিশ^ সম্পর্কে মানুষের জ্ঞান অসম্পূর্ণ, তাই মহাজগতের স্র্রষ্টা সম্পর্কে জ্ঞান বা ধ্রুবজ্ঞান অর্জন করা অসম্ভব। তার সৃষ্টি সম্পর্কে জ্ঞানের প্রতি মনোযোগ আহ্বান করা হয়েছে। যাতে স্র্রষ্টার অসীম জ্ঞান ও সর্বব্যাপকতার নিদর্শন ও সাক্ষ্য প্রতিফলিত হয়েছে।
আল কুরআনে সূরা লোকমানে (২৭) আল্লাহ বলেনÑ পৃথিবীর সব গাছ যদি কলম হয়, আর সমুদ্র কালি হয়; আরো যত সমুদ্র যুক্ত হয় তবুও আল্লাহর বাণী (লিখা) নিঃশেষ হবে না। নিশ্চয়ই আল্লাহ মহাপ্রতাপশালী ও মহাপ্রজ্ঞাময়।
সদৃশ নীতি ও পরিচয়জ্ঞাপক মতবাদ মহাবিশ্ব সৃষ্টির সূচনালগ্ন থেকেই জন্ম লাভ করেছে। এর উৎপত্তিগত মূল আদর্শ নৈতিকতার ওপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত এবং এর মাধ্যমে আমরা জন্নাতকে ক্ষীণভাবে অনুধাবন করতে পারি। এটি আমাদের এক ধরনের আধ্যাত্মিক প্রজ্ঞা দান করে। যদিও এ প্রজ্ঞা আমাদের সব প্রকার চরিত্রের ব্যাখ্যা দিতে পারে না। আমাদের দেহের বস্তুসত্তার মধ্যে একটি নৈতিক সত্তাও বিদ্যমান। এ চেতনা আমাদের ভালো ও মন্দের মধ্যে পার্থক্য করতে শেখায়। অনুশীলনের মাধ্যমে আমাদের সব প্রকার আমিত্ব ও অহমিকা দূর করে, নৈতিক চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে সঠিক পথ বেছে নিয়ে পরম ও চরম সত্যের (সৃষ্টিকর্তার) সাথে আত্মসমর্পণের মাধ্যমে একীভূত হতে পারি। আর এটিই স্র্রষ্টার একমাত্র মহান উদ্দেশ্য। হ