ঘূর্ণিঝড় ফণীর প্রভাবে দেশের উপকূলীয় বাঁধগুলো জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছে। আগামী বর্ষা মওসুমের আগে জরুরি ভিত্তিতে সংস্কার করা না হলে কোটি কোটি টাকার সম্পদসহ বহু জনপদ নদীতে বিলীন হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ফণী গত ৩ মে ভারতের উড়িষ্যা রাজ্যে ২০০ কিলোমিটার বেগে আঘাত হানে। সেখানে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। আল্লাহর রহমত বাংলাদেশের ঢোকার সময় ঝড়ের গতিবেগ ছিল ৭০ থেকে ৮০ কিলোমিটার। ফলে এ দেশে জানমালের তেমন ক্ষয়ক্ষতি না হলেও উপকূলীয় বাঁধগুলো লণ্ডভণ্ড হয়ে গেছে। পাঁচজনের মৃত্যু হয়েছে। আর ঝড়ের দিন বজ্রপাতে মারা গেছে ১৪ জন। এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, উপকূলীয় পাঁচ হাজার কিলোমিটার বেড়িবাঁধের মধ্যে চার হাজার কিলোমিটার ঝুঁকিপূর্ণ। বাঁধগুলো এখন জরাজীর্ণ অবস্থায় টিকে আছে। এগুলো সংস্কার করা না হলে আগামী বর্ষা মওসুমে বিস্তীর্ণ জনপদ নদীতে বিলীন হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। অনেক সময় কোটি কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়া হলেও বাঁধের কাজে যৎসামান্য টাকা ব্যয় করা হয়। বিপুল অঙ্কের টাকা ভাগাভাগি হয়ে যায়। সরকারের পক্ষ থেকে যে টাকা ব্যয় করা হয়, তা কেন্দ্র থেকে সরাসরি মনিটরিং করা উচিত। বিদ্যমান বাঁধগুলো মজবুত করে গড়ে তুলতে হবে। বাঁধের দুর্বল পয়েন্টগুলো চিহ্নিত করে সংস্কার করতে হবে।
দেখা যাচ্ছে, পানি উন্নয়ন বোর্ড এ ব্যাপারে উদাসীন থেকে যাচ্ছে। প্রতি বছর বাঁধ নির্মাণ ও সংস্কারে হাজার হাজার কোটি কোটি টাকা ব্যয় করা হলেও পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারা বাঁধগুলোর উন্নয়ন করছে না। এসব বাঁধের বেশির ভাগই যে কত নাজুক অবস্থায় রয়েছে তা ঝড়-বৃষ্টি-বন্যা হলেই বোঝা যায়। তখন সংশ্লিষ্ট এলাকার মানুষই স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে বাঁধ রক্ষায় নেমে পড়ে।
ফণীর কারণে ধান, আলু, পেঁয়াজ, আম, লিচু, তরমুজ, সূর্যমুখী ফুল ক্ষেত, বাদাম, ভুট্টা, কাঁচামরিচ, পানের বরজ, কলাগাছ, শাকসবাজিসহ অন্যান্য মওসুমি ফসল নষ্ট হয়েছে। বাতাসে মাটির সাথে লেপ্টে গেছে ধান। তলিয়ে গেছে আধাপাকা বোরো ফসল। বৃষ্টির পানিতে ফসল ঘের ভেসে গেছে। কৃষি সম্প্রসারণ অফিসের হিসেব মতে, ৩৬ হাজার ৬০৩ হেক্টরের বোরো ধান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সাতক্ষীরা, বাগেরহাট, বরগুনাসহ কয়েক স্থানে বাঁধ ভেঙে প্লাবিত হয়েছে। দেশের ১৮ কোটি জনসংখ্যার মধ্যে প্রায় পাঁচ কোটি মানুষ দেশের নদীবেষ্ঠিত উপকূলীয় এলাকায় বসবাস করে। কিন্তু উপকূলীয় এলাকা এখন অরক্ষিত। বিশেষ করে টেকসই বাঁধ না থাকায় জানমালের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হচ্ছে। উপকূলীয় জেলাগুলোর মধ্যে সাতক্ষীরা, খুলনা, বাগেরহাট, বরিশাল, পটুয়াখালী, কক্সবাজার, ভোলা অন্যতম। প্রায় ডজন খানেক জেলার ভৌগোলিক অবস্থান উপকূলীয় এলাকায়। এসব উপকূলীয় এলাকায় জেলে, কৃষক, বাওয়ালি, কামার, কুমারসহ বিভিন্ন শ্রেণী পেশার লোক বসবাস করে। জাতীয় অর্থনীতিতে উপকূলীয় অধিবাসীরা গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে। বিশেষ করে মৎস্যসম্পদ আহরণ করে দেশের মৎস্যসম্পদের দুই-তৃতীয়াংশ চাহিদা পূরণ করে উপকূলীয় জেলেরা। সাগরসহ স্থানীয় নদ-নদী থেকে মৎস্যসম্পদ আহরণ করে স্থানীয় চাহিদা পূরণ করে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করে আসছে দীর্ঘ দিন থেকে। বিশেষ করে হিমায়িত চিংড়ি রফতানি করে বাংলাদেশ কোটি কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করছে। এ পেশার সাথে উপকূলীয় দুই কোটি মানুষ প্রত্যক্ষ-পরোক্ষভাবে জড়িত। মৎস্যসম্পদ উৎপাদনের পাশাপাশি প্রচুর পরিমাণ বিভিন্ন প্রজাতির ফসল উৎপাদন হয়। যা দেশের খাদ্য ঘাটতি পূরণে বিশেষ ভূমিকা রাখে। কিন্তু উপকূলীয় বাঁধগুলো এত জরাজীর্ণ যে, এসব এলাকার কোটি কোটি মানুষ চরম আতঙ্ক, উদ্বেগ, উৎকণ্ঠার মধ্যে দিনাতিপাত করছে।
তবে উপকূলীয় অধিবাসীদের আগলে রেখেছে সুন্দরবন। বিশ্বব্যাংকের গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশে আঘাত হানা ঘূর্ণিঝড়গুলোর গতি কমানোর ক্ষেত্রে সুন্দরবন ভূমিকা রেখেছে। হ
লেখক : সাংবাদিক
ঘূর্ণিঝড় ফণীর প্রভাবে দেশের উপকূলীয় বাঁধগুলো জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছে। আগামী বর্ষা মওসুমের আগে জরুরি ভিত্তিতে সংস্কার করা না হলে কোটি কোটি টাকার সম্পদসহ বহু জনপদ...
