বর্তমান বিশ্বে যে দেশের শিক্ষাব্যবস্থা যত বেশি বাস্তবসম্মত এবং যুগোপযোগী, সেই দেশ তত দ্রুত লক্ষ্যে পৌঁছতে পারে। আধুনিক বিশ্বে অন্যান্য দেশের সাথে অর্থনীতিসহ সব বিষয়ে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে টেকসই শিক্ষার বিকল্প নেই। শিক্ষার মাধ্যমেই প্রতিটি দেশ জনশক্তিকে জনসম্পদে রূপান্তরিত করে থাকে। অথচ আমাদের দেশে চার দিকে শিক্ষাব্যবস্থা প্রচলিত। যেকোনো সচেতন নাগরিক বহুধাবিভক্ত শিক্ষাব্যবস্থার সমর্থক হতে পারেন না। বৈষম্যের মধ্য দিয়ে দেশের কোমলমতি শিশুর জীবন শুরু হোক, এটি কারো চাওয়া হতে পারে না। অথচ দেশের বহুধারার শিক্ষাব্যবস্থার মাধ্যমে তাই করা হচ্ছে।
আমরা এত বছর পরও স্বাধীন দেশের উপযোগী একটি শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারিনি। জাতি হিসেবে এটি আমাদের ব্যর্থতা। মোটাদাগে দেশে তিন ধরনের শিক্ষাব্যবস্থা বিদ্যমান। ইংরেজি মাধ্যম, বাংলা মাধ্যম, আবার বাংলার মধ্যে ইংরেজি ভার্সন এবং ধর্মীয় আলোকে মাদরাসা শিক্ষাব্যবস্থার প্রচলন রয়েছে। মাদরাসা শিক্ষাব্যবস্থা আবার দুই ভাগে বিভক্ত। একটি আধুনিকতার মিশেলে আলিয়া এবং অন্যটি কওমি শিক্ষাব্যবস্থা, যা নিরেট ধর্মীয়।
১৯৪৭ সালে ইংরেজরা ভারতবর্ষ ছেড়ে গেলেও ব্রিটিশদের চালু করা শিক্ষাব্যবস্থার কিছু ছায়া রয়ে গেছে, যা এখনো আমাদের স্বাধীন দেশে বিদ্যমান। যেটি ইংরেজি মাধ্যম হিসেবে সমাজে টিকে আছে। এই মাধ্যমে যারা লেখাপড়া করে, তারা সমাজের উচ্চবিত্ত শ্রেণীর প্রতিনিধিত্ব করে। ইংরেজি মাধ্যমে পড়ালেখা করাতে বিপুল অর্থের প্রয়োজন। এ সুযোগে শিক্ষাব্যবসায়ীরা অর্থোপার্জনে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন। রকমারি বিজ্ঞাপনে আকর্ষিত হচ্ছেন অনেক অভিভাবক। জাতীয় শিক্ষার সাথে সম্পর্কহীন, জাতীয়তা অর্জনে সামঞ্জস্যহীন ইংরেজি মাধ্যমে শিক্ষা নিয়ে ইতিবাচকের চেয়ে নেতিবাচক দিক বেশি প্রতীয়মান হচ্ছে বলে মনে করেন অনেকে।
আমরা সন্তাদের দেশের সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে চাই। ভিনদেশী তোতা পাখি বানাতে চাই না। লক্ষ করলে দেখা যাবে, দেশে প্রচলিত ইংরেজি মাধ্যম শিক্ষাব্যবস্থায় দেশীয় সংস্কৃতি উপেক্ষিত। আর যে শিক্ষা মানুষের নৈতিক ভিত শক্ত পাঠাতনে দাঁড় করায়, সেই ধর্মীয় শিক্ষা থাকে উপেক্ষিত। ফলে ইংরেজি মাধ্যমে যারা শিক্ষা গ্রহণ করছে, তাদের অনেকে কর্মজীবনে নৈতিকতা, সততা বজায় রাখতে পারছে না। বলা চলে, তাদের অনেকের জীবনেই নৈতিকতার কোনো বালাই থাকে না। ফলে হৃদয়ের বিশুদ্ধতা তাদের কাছে আশা করা বাতুলতা ছাড়া কিছু নয়।
শিক্ষার মাধ্যমে মানুষের অন্তর্হিত পূর্ণতার প্রকাশ ঘটে। কিন্তু বর্তমানে দেখা যাচ্ছে, আমাদের দেশে বাংলা মাধ্যম নামে যে শিক্ষাব্যবস্থার প্রচলন রয়েছে, তাতে শিক্ষার উদ্দেশ্য পূর্ণভাবে বিকশিত হচ্ছে কি না, তা নিয়ে রয়েছে অনেকের প্রশ্ন। সবাই যেন জিপিএ ৫-এর দৌড় প্রতিযোগিতায় ব্যস্ত। সার্টিফিকেট নামের একটি পৃষ্ঠা অর্জনে ব্যতিব্যস্ত। এখানেও যথাযথভাবে নেই ধর্মীয় শিক্ষা। বাংলা মাধ্যমের ইংরেজি ভার্সনে শিশু-কিশোররা যে চাপে পড়ছে; তাতে এ কথা বলা অত্যুক্তি হবে না যে, এ মাধ্যমের শিক্ষার্থীদের মনোজগৎ গড়ে উঠছে জগাখিচুড়ি মনমানসে।
দেশের এসব শিক্ষাব্যবস্থায় কোমলমতি শিশুরা ভিন্ন ভিন্ন মানসিকতায় বেড়ে উঠছে। অথচ রাষ্ট্র এক, বসবাসের ভূখণ্ড এক, ওঠাবসা এক, খেলাধুলা এক। কিন্তু তারা একে অন্যের সাথে সহজভাবে মিশতে পারছে না। মন খুলে কথা বলতে পারছে না। একে অন্যের সাথে নিজেকে মানিয়ে নিতে পারছে না।
পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, তিন ধরনের মানসিক বৈষম্যের শিকার হচ্ছে শিক্ষার্থীরা। হাঁটা-চলা, কথা-বার্তা, পোশাক-আশাকে সমন্বয় ঘটাতে পারছে না তারা। এ বৈষম্যের ছায়া, প্রভাব তাদের সারাজীবন বয়ে বেড়াতে হচ্ছে। এ দুর্ভেদ্য প্রাচীর একই ভূখণ্ডের সন্তানদের এক হতে দিচ্ছে না। কিন্তু আমরা বক্তৃতায় ঐক্যের, সাম্যের, বৈষম্যহীন সমাজের কথা বলি। একই দেশের কোনো শিক্ষার্থী ইংরেজি জাহাজে, কেউ বাংলার নৌকায়, আবার কেউ উটের পিঠে চড়বে, তা হলে অবধারিতভাবে সমাজে সৃষ্টি হবে বিভাজন, দৈন্যতা, সামঞ্জস্যহীনতা। ক্ষতিগ্রস্ত হবে জাতীয় ঐক্যের চেতনা। হচ্ছেও তাই। কারণ, সব বোধের জন্মই হয় শিক্ষা থেকে। এই শিক্ষা বিভাজিত থাকলে তাকে ‘ত্রুটিপূর্ণ শিক্ষাব্যবস্থা’ ছাড়া কী বলা যেতে পারে।
ফাউন্ডেশনে ত্রুটি রেখে যেমন টেকসই ভবন আশা করা যায় না, ঠিক তেমনি বিভাজিত শিক্ষাব্যবস্থায় আমরা কার্যত বৈষম্য, মানুষের মানুষে ভেদাভেদ আর বৈরিতা শিক্ষা দিচ্ছি। এতে একপক্ষ ইংরেজি শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলছে। বাংলা মাধ্যমের শিক্ষার্থীরা মনে করছে আমরা সঠিক। আর মাদরাসার শিক্ষার্থীরা বাস্তবতা এবং জাগতিক জ্ঞান থেকে দূরে। ত্রিধা বিভক্ত শিক্ষাব্যবস্থার কারণে সমাজে এর প্রভাব পড়ছে তীব্রভাবে। কোথায় শিক্ষার মাধ্যমে বৈষম্যহীন রাষ্ট্র গড়ে ওঠার কথা, সেখানে উল্টো ফল বয়ে আনছে রাষ্ট্রীয় জীবনে। তাই বৈষম্যহীন, শান্তিপূর্ণ সমাজ এবং সার্বিকভাবে দক্ষ, পূর্ণাঙ্গ নাগরিক গড়ে তুলতে হলে শিক্ষাব্যবস্থার সব মাধ্যমকে একীভূত করা একান্ত প্রয়োজন। বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থা ঢেলে সাজানো জরুরি।
একটি দেহে যেমন সব রকমের খাদ্যের উপাদানই প্রয়োজন, তেমনি একটি শিশুর জাগতিক ও ধর্মীয় শিক্ষা সমান প্রয়োজন। আমরা শুধু সার্টিফিকেটধারী শিক্ষিত নাগরিক চাই না। চাই মানবসম্পদ, সার্বিকভাবে স্বয়ংসম্পূর্ণ একেকজন নাগরিক। কেবল ‘একমুখী শিক্ষাই’ গোড়ে তুলতে পারে সমমনা নাগরিক। বাংলা, মাদরাসা এবং ইংরেজি মাধ্যম এই ত্রিমুখী শিক্ষাব্যবস্থার সমন্বয়ে আধুনিক বিশ্বের উপযোগী নাগরিক গড়তে অতি দ্রুত একমুখী শিক্ষা প্রণয়ন করা সময়ে দাবি। ভিন্ন ভিন্ন শিক্ষাব্যবস্থা জাতীয়ভাবে তদারকি করা একটি কঠিন কাজ। তাই একমুখী শিক্ষা চালু হলে শুধু সাম্য-শান্তিপূর্ণ সমাজ গঠন হবে তাই নয়, প্রাতিষ্ঠানিক ও শিক্ষার মান এবং সার্বিকভাবে দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলার পথও সুগম হবে বলে আমরা মনে করি। হ
