ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন একজন মহৎপ্রাণ সমাজসেবী। কুমিল্লার দাউদকান্দি, মেঘনা, তিতাস ও হোমনা উপজেলাবাসীর উন্নয়নের বাতিঘর। দেশবরেণ্য রাজনীতিক, সাবেক মন্ত্রী, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সিনিয়র সদস্য, মহান মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক, প্রথিতযশা ভূবিজ্ঞানী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ও চেয়ারম্যান। তিনি কুমিল্লা-২ আসন থেকে বিপুল ভোটে চারবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। তিন মেয়াদে মন্ত্রী হিসেবে সফল দায়িত্ব পালন করেছেন। এই সময়ে তিনি দাউদকান্দি, মেঘনা ও তিতাস উপজেলায় প্রায় হাজার কোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছেন।
ড. মোশাররফ ১৯৭৯ সালে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের আহ্বানে সাড়া দিয়ে রাজনীতিতে সম্পৃক্ত হন। তাকে বিএনপির প্রথম নির্বাহী কমিটির ছাত্রবিষয়ক সম্পাদকের দায়িত্ব দেয়া হয়। এ পদে ১৯৮৬ সাল পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। তার বলিষ্ঠ নেতৃত্বে ছাত্রদল বাংলাদেশে অন্যতম প্রধান ছাত্র সংগঠনে রূপ নেয়। ১৯৭৯ থেকে ’৯১ সাল পর্যন্ত ড. মোশাররফ কুমিল্লা উত্তর জেলা বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ছিলেন। ১৯৮৬ সাল থেকে ’৯৪ পর্যন্ত বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব এবং ’৯৪ সাল থেকে আজ পর্যন্ত স্থায়ী কমিটির সদস্য পদে অধিষ্ঠিত রয়েছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালে এই মেধাবী ছাত্রনেতা ১৯৬৪-৬৫ সালে সলিমুল্লাহ মুসলিম হল ছাত্র সংসদের এজিএস এবং ১৯৬৭-৬৯ সালে হাজী মুহম্মদ মুহসীন হল ছাত্র সংসদের ভিপি ছিলেন। তিনি ’৯১ সালে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী, ’৯৬ সালে স্বল্পমেয়াদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবং ২০০১ সালে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী থাকাকালে প্রায় হাজার কোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছেন।
১৯৯৪ সালে দাউদকান্দি সদর ইউনিয়নকে পৌরসভায় উন্নীত করেন। স্বাস্থ্যমন্ত্রী থাকাকালে তিনি দাউদকান্দির অবহেলিত উত্তর জনপদের ৯টি ইউনিয়ন নিয়ে ‘তিতাস নামে’ উপজেলা প্রতিষ্ঠা করেন। একই সময়ে নবগঠিত মেঘনা উপজেলা বাস্তবায়ন করেছেন।
শিক্ষার প্রসার, স্বাস্থ্যসেবা ও দারিদ্র্য বিমোচনের মহান ব্রত নিয়ে ২০০২ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি প্রতিষ্ঠা করেছেন ‘ড. মোশাররফ ফাউন্ডেশন লিমিটেড’। নিজ উদ্যোগ ও অর্থায়নে প্রতিষ্ঠা করেছেনÑ দাউদকান্দি পৌর সদরে এবং ইলিয়টগঞ্জে দু’টি কলেজ, গৌরীপুরে বালিকা উচ্চবিদ্যালয়, নৈয়াইরে উচ্চবিদ্যালয়, সোনাকান্দায় রহমানিয়া দাখিল মাদরাসা ও এতিমখানা এবং তিতাস উপজেলার গোপালপুরে উচ্চবিদ্যালয়। এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছাত্রছাত্রীরা এইচএসসি, এসএসসি, জেএসসি ও পিইসি পরীক্ষায় ভালো ফলাফল করে সব মহলের প্রশংসা অর্জন করেছে।
দাউদকান্দিতে গোমতী সেতু নির্মাণে ড. মোশাররফ অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন। তার নিরলস প্রচেষ্টায় কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। প্লাবন ভূমিতে মৎস্য চাষের নয়া প্রযুক্তি উদ্ভাবনের মাধ্যমে মৎস্য খাতকে সমৃদ্ধ করেছেন। ২০০৪ সালে জাতীয় মৎস্য সপ্তাহে সরকার তাকে স্বর্ণপদকে ভূষিত করেন।
তিনি ২০০৩ সালে জেনেভায় ৫৬তম বিশ্ব স্বাস্থ্য সম্মেলনের সভাপতি নির্বাচিত হন। তার সভাপতিত্বে জেনেভায় অনুষ্ঠিত স্বাস্থ্য সম্মেলনে কনভেনশন অন টোব্যাকো কন্ট্রোল (এফসিটিসি) গৃহীত হয়। বাংলাদেশে তামাক নিয়ন্ত্রণে আইন প্রণয়ন এবং বিশ্বব্যাপী তামাকবিরোধী আন্দোলনে অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা তাকে ‘ওয়ার্ল্ড নো-টোব্যাকো অ্যাওয়ার্ড-২০০৪’ পদকে ভূষিত করে। স্বাস্থ্য ক্ষেত্রে অনবদ্য সাফল্য ও যোগ্যতার স্বীকৃতিস্বরূপ ড. মোশাররফকে ২০০৬ পর্যন্ত মেয়াদে বিশ্বব্যাপী প্রতিরোধযোগ্য রোগ থেকে শিশুদের রক্ষার জন্য টিকাদানকারী সংস্থা গ্লোবাল অ্যালায়েন্স ফর ভ্যাকসিন্স ইমুনাইজেশনের (গ্যাভি) উন্নয়নশীল দেশের সদস্য নির্বাচিত করা হয়। ভূবিজ্ঞানের ক্ষেত্রে মৌলিক গবেষণা ও অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে তার জীবনবৃত্তান্ত ‘হু ইজ হু ইন দ্য ওয়ার্ল্ড’ ক্যামব্রিজ বায়োগ্রাফি জার্নাল এবং আমেরিকান বায়োগ্রাফিক্যাল ইনস্টিটিউশনের প্রকাশিত পুস্তকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। ভূতত্ত্ব বিষয়ে স্ট্রাকচারাল অ্যানালাইসিসে তার নতুন উদ্ভাবন হোসাইন’স মেথড অব এক্সটেনশন আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি লাভ করেছে। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সাময়িকীতে তার একুশটির অধিক বৈজ্ঞানিক প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে।
’৭১-এ মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় খন্দকার মোশাররফ হোসেন লন্ডনে পিএইচডি করছিলেন। তখন বাংলাদেশের পক্ষে বিশ্বজনমত সৃষ্টির জন্য তিনি বীরোচিত ভূমিকায় অবতীর্ণ হন। ওই সময় বিলেতে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক হিসেবে বলিষ্ঠ নেতৃত্ব দেন। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর তৎকালীন রাষ্ট্রপতি বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ মোশাররফ হোসেনকে অভিনন্দনপত্র দিয়েছেন (৩০ ফাল্গুন, ১৩৭৮ বঙ্গাব্দ)।
গণতন্ত্র ও জাতীয় স্বার্থরক্ষার আন্দোলনে ড. মোশাররফ কখনো পিছপা হননি। তিনি বিভিন্ন সরকারের প্রতিহিংসার শিকার হয়ে প্রায় পাঁচ বছর কারাবরণ করেন। এক-এগারোর সময় অসাংবিধানিক সরকার বরেণ্য রাজনীতিকদের হেয়প্রতিপন্ন করে দেশকে বিরাজনীতিকরণের গভীর ষড়যন্ত্রে লিপ্ত ছিল। সেই ষড়যন্ত্র ও হীন পরিকল্পনার অন্যতম শিকার হয়েছেন ক্লিন ইমেজের খন্দকার মোশাররফ হোসেন। এক-এগারো সরকার কোনো কারণ ছাড়াই ড. মোশাররফকে গ্রেফতার করে ৬১৬ দিন কারান্তরীণ করে রেখেছিল। ২০১৪ সালে সরকার একটি মিথ্যা মামলায় তাকে গ্রেফতার করে ২২ মাস কারাগারে আটক রেখেছিল। স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে অগ্রণী ভূমিকা রাখায় ’৮৬ সালে তিনি কারাবরণ করেন। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার কথিত বিদ্যুতের টাওয়ার ভাঙার রাষ্ট্রদ্রোহ মামলায় ড. মোশাররফকে গ্রেফতার করে কারাগারে পাঠায়। আওয়ামী লীগ আবার ক্ষমতাসীন হয়ে ২০১২ সালে তাকে গ্রেফতার করে কারান্তরীণ করে রাখে। সরকারবিরোধী আন্দোলনে বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখায় সরকার তার বিরুদ্ধে গাড়ি পোড়ানো এবং সচিবালয়ে বোমা নিক্ষেপের অভিযোগসহ ১২টি ভুয়া মামলা দায়ের করে। এই প্রবীণ নেতা দিনের পর দিন এসব মামলা মোকাবেলা করতে প্রায়ই আদালতে আসা-যাওয়া করতে হচ্ছে আজো।
ড. মোশাররফ জাতীয় দৈনিকগুলোয় নিয়মিত কলাম লিখে থাকেন। তার রচিত প্রকাশিত গ্রন্থের মধ্যে রাজনৈতিক বিশ্লেষণ ও গবেষণাধর্মী গ্রন্থÑ ‘ফখরুদ্দীন-মইন উদ্দিনের কারাগারে ৬১৬ দিন’ ব্যাপকভাবে সমাদৃত। অন্য গ্রন্থগুলো হচ্ছেÑ ‘মুক্তিযুদ্ধে বিলেত প্রবাসীদের অবদান’, ‘প্লাবন ভূমিতে মৎস্য চাষ : দাউদকান্দি মডেল’, ‘সংসদে কথা বলা যায়’, ‘এই সময়ের কিছু কথা’, ‘সময়ের ভাবনা’, ‘রাজনীতির হালচাল’ এবং ‘জরুরি আইনের সরকারের দুই বছর (২০০৭-২০০৮)’। ‘প্রফেসর টু পলিটিক্স’সহ আরো তিনটি গ্রন্থ প্রকাশের অপেক্ষায় রয়েছে। নানা প্রতিকূলতা উপেক্ষা করে ড. মোশাররফ দেশ ও জনগণের পক্ষে সোচ্চার ভূমিকা রাখছেন। মহান আল্লাহ তায়ালা সুযোগ দিলে কীর্তিমান মানুষটি দেশ ও জনগণের কল্যাণে আগামী দিনেও অগ্রণী ভূমিকা রাখবেন বলে আমরা আশাবাদী। হ
লেখক : সাংবাদিক
ঊ-সধরষ: ংযধযধশঃধৎুুঁধসধহ@মসধরষ.পড়স
ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন একজন মহৎপ্রাণ সমাজসেবী। কুমিল্লার দাউদকান্দি, মেঘনা, তিতাস ও হোমনা উপজেলাবাসীর উন্নয়নের বাতিঘর। দেশবরেণ্য রাজনীতিক, সাবেক মন্ত্রী, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সিনিয়র সদস্য,...
