১৭ মে নয়া দিগন্তে প্রকাশিত শাহ্ আব্দুল হান্নান ‘পাশ্চাত্যের অযৌক্তিক অনুকরণ পরিহার করা উচিত’ শিরোনামে লেখা কলামে খেলাধুলা, পোশাক, বিজ্ঞাপন ইত্যাদি বিষয় নিয়ে আলোচনা করেছেন। কলামটির এক জায়গায় তিনি লিখেছেনÑ “টাইয়ের প্রচলন শুরু হয়েছিল কয়েক শ’ বছর আগে ইউরোপের ক্রোয়েশিয়ায় ক্যাথলিকদের দিয়ে। তারা ‘যিশুর ক্রুশে মৃত্যুবরণ’কে স্মরণ করতে টাইয়ের প্রচলন করে। এটা তাদের বিশ্বাস, এটা মুসলিমদের বিশ্বাস নয়। দুই শ’ বছর আগে টাইয়ের প্রচলন যুক্তরাষ্ট্রে শুরু হয় এবং ইংরেজ উপনিবেশগুলো বিস্তার লাভ করার পর ওই সব দেশেও টাইয়ের ব্যবহার শুরু হয়। টাই একটি কাপড়ের সরু লম্বা অংশ, যা গলায় বেঁধে রাখা হয়। সত্যিকার অর্থে, এর কোনো কাজ নেই।” টাই নিয়ে লেখক সংক্ষিপ্তভাবে সবার বোধগম্য করে লিখেছেন।
ব্যক্তিগতভাবে টাই খুব অপছন্দ করি। টাই নিয়ে আমাদের সমাজে রয়েছে নানা ধরনের কুসংস্কার। গ্রামের অনেকেই বলেন, বিএ পাস না করলে নাকি টাই ব্যবহার করা যায় না! এখানে প্রশ্ন আসছেÑ অনেক স্কুলের ছোট শিশু শিক্ষার্থীরাও টাই ব্যবহার করে থাকে। তারা কি বিএ পাস করেছে? অনেক জায়গায় নিরাপত্তাকর্মীরা টাই ব্যবহার করেন, যাদের অনেকেই বিএ পাস করেননি। ব্রিটিশরা প্রায় দুই শ’ বছর আমাদের এ অঞ্চল শাসন করে তাদের এমন কিছু অদ্ভুত সংস্কৃতি শিখিয়ে দিয়ে গেছে; যা আমাদের দেশের উচ্চ ডিগ্রিধারী অনেক মুসলিমও পরিহার করতে পারছেন না। দেশের সবপর্যায়ের আমলা টাই ব্যবহার করে থাকেন। মন্ত্রীরাও টাই ব্যবহার করেন। তবে এ ক্ষেত্রে কিছু ব্যতিক্রম রয়েছে। গত বছর একটি টিভি টকশোতে একজন সাবেক মন্ত্রী বলেছিলেনÑ আমি আশির দশকে ৩৬ বছর বয়সে মন্ত্রী ছিলাম। তখন গলায় ঠিকমতো টাই বাঁধতে পারতাম না। স্যার আমাকে টাই বাঁধা শিখিয়েছেন। স্যার মানে, ওই সময়কার সামরিক জান্তা (১৯৮২-১৯৯০)। আমাদের দেশে অনেক দাড়ি-টুপিওয়ালা উচ্চশিক্ষিত ব্যক্তি আছেন, যারা বড় পদে কাজ করছেন। তাদের অনেকে বড় কোনো অনুষ্ঠানে গেলে টাই ব্যবহার করেন। রেস্টুরেন্ট আর আবাসিক হোটেলের ছোট বড় প্রায় সব কর্মী গলায় টাই ব্যবহার করেন। সরকারি দফতরগুলোতেও টাইয়ের ব্যবহার লক্ষণীয়। করপোরেট জগতেও টাইয়ের দাপট।
দেশে টাইয়ের কোটি কোটি টাকার মার্কেট রয়েছে। টাইয়ের দামও বেশ। এখন অনেক টেইলার্সেও টাই রাখা হয়। বড় বড় শপিংমলে টাইয়ের আলাদা জায়গা রয়েছে। টেইলার্সে শার্ট বানাতে গেলে জিজ্ঞেস করা হয়, কলার কেমন হবে ‘টাই’, না অন্য সিস্টেমের। রাস্তাঘাটে এখানে-সেখানে টাই ব্যবহার করে অনেক তরুণ শপিং করছেন। টাই এখন নারীরাও ব্যবহার করেন। একবার এক টাই ব্যবহারকারী তরুণ বাসার দরজায় এলেন রেস্টুরেন্টের পক্ষে মার্কেটিং করতে। তিনি আমাকে কতগুলো কার্ড দেখালেন, যাতে অদ্ভুত সব নামের খাদ্যতালিকা দেখলাম। তাকে বললাম, দেশের মানুষের বড় একটা অংশ এখনো দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করেন। আপনি আপনার মালিককে বলেনÑ ডাল, ভাত, ভর্তা, মাছ ইত্যাদি সহজ খাবারগুলো নিয়ে কাজ করতে। তাতে বেশি সফলতা আসতে পারে।
এ দিকে কে কত দ্রুত টাই বাঁধতে পারেন, সে ব্যাপারে রয়েছে অনেকের কসরত। কেউ যদি ঠিকমতো টাই গলায় বাঁধতে না পারেন, তাকে গেঁয়ো বলা হয়। আমাদের সমাজে শুধু টাই নয়, ব্রিটিশদের শেখানো অদ্ভুত কিসিমের বহু রেওয়াজ রয়ে গেছে। যেমন ‘স্যালুট’ প্রথা। রয়েছে ‘স্যার’, ‘ম্যাডাম’ ডাকার প্রথা। বিশেষ করে ‘স্যার’ সম্বোধন সব জায়গায়। ‘স্যার’ শব্দের বাংলা অর্থ ভদ্র মহোদয়। ‘ম্যাডাম’ হলো ভদ্র মহোদয়া। এখন উচ্চপর্যায়ের অনেক নারী কর্মকর্তা ‘স্যার’ সম্বোধন শুনতে চান। ম্যাডাম শব্দটি তাদের কাছে জেন্ডর বায়াস বলে মনে হয়। এখানে তারা লিঙ্গ মানতে নারাজ। যেমন আগে অধ্যাপিকা ছিল, এখন আর অধ্যাপিকা, নেত্রী এসব স্ত্রীলিঙ্গের শব্দের ব্যবহার নেই। আগে বলা হতো সংসদ নেত্রী। এখন নারীকেই বলা হচ্ছে সংসদ নেতা। যা হোক, আমাদের সমাজে স্যারের এতটা প্রভাব-প্রতিপত্তি বেড়েছে যে, স্যার না সম্বোধন করলে কারো চাকরিও চলে যেতে পারে। হ
লেখক : প্রাবন্ধিক
১৭ মে নয়া দিগন্তে প্রকাশিত শাহ্ আব্দুল হান্নান ‘পাশ্চাত্যের অযৌক্তিক অনুকরণ পরিহার করা উচিত’ শিরোনামে লেখা কলামে খেলাধুলা, পোশাক, বিজ্ঞাপন ইত্যাদি বিষয় নিয়ে আলোচনা করেছেন।...
