‘জাগছে ভূমি, বাড়ছে সম্ভাবনা’ শিরোনামের একটা লেখা ছিল ১৬ এপ্রিল ২০১৯ তারিখের নয়া দিগন্ত পত্রিকায়। আশা জাগানো এ লেখাটার জন্য অনেক ধন্যবাদ সাধন সরকারের প্রাপ্য।
নিকট ভবিষ্যতে কোনো একদিন আমরা হয়তো হাজারো দ্বীপ নিয়ে গড়া ইন্দোনেশিয়াকেও আয়তনে পরাভূত করব! ইন্দোনেশিয়ার ধারে কাছে কোনো হিমালয় পর্বত নেই, তবে আমাদের নিকটেই আছে। হিমালয়ের মাটি পদ্মা যমুনা দিয়ে আসছে, আর বাংলাদেশের নিম্নাঞ্চল ভরাট করে তারপর বঙ্গোপসাগরে গিয়ে এদেশের জন্য একেকটা দ্বীপ সৃষ্টি করছে। যত দিন না হিমালয় সমতল হয়ে যায়, তত দিন সেই ভেসে আসা মাটিতে গড়া দ্বীপগুলো নিয়ে বাংলাদেশ একটা বৃহত্তর আয়তনের দেশ হতে থাকবে।
প্রায় আড়াইশ’ বছর আগে বাংলাদেশের ভূভাগ কেমন ছিল তার একটা ঐতিহাসিক তথ্য আমরা পাই সিলেটে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি আমলের দ্বিতীয় ইংরেজ প্রশাসক রবার্ট লিন্ডসের আত্মজীবনী মূলক গ্রন্থ Anecdotes of an Indian Life এর আংশিক বাংলা অনুবাদ ‘সিলেটে আমার বারো বছর’ (প্রকাশক : কেন্দ্রীয় মুসলিম সাহিত্য সংসদ, সিলেট) বইটি থেকে। লিন্ডসে লিখেছেন, ঢাকা থেকে সিলেটে বদলি হয়ে তিনি নৌকাযোগে সিলেট গিয়েছিলেন। তার বর্ণনা মতে, নৌপথে সিলেট যেতে তাদের দিন দশেক লেগেছিল। লিখেছেন, ‘তাতার, আসাম ও তিব্বতের পাহাড়ে বরফ গলা পানি ছোট ছোট নদী দিয়ে নেমে আসে। বেঙ্গল প্রদেশের নিম্নাঞ্চল এতে ডুবে যায়। ... বছরে প্রায় তিন মাস এভাবে পানিতে ডুবে থাকে সমগ্র অঞ্চল। ... এই অথই জলরাশির মধ্যে আমি সমুদ্রে চলার মতোই কম্পাস ব্যবহার করে সিলেট যাওয়ার পথ ঠিক করলাম।... এভাবে প্রায় এক শ’ মাইল বিস্তৃত হাওর পাড়ি দিতে হলো আমাকে।’ (তাতার বলতে তিনি কি হিমালয়কে উদ্দেশ করেছেন, নাকি শব্দটা অনুবাদকের কোনো ভুল?)। এ ছাড়াও কলকাতার ফোর্ট উইলিয়াম কর্তৃপক্ষের কাছে লিখিত, ৩ সেপ্টেম্বর ১৭৮৪ তারিখের চিঠিতে তিনি লিখেছেন, ‘সিলেট যাওয়ার পথে ব্রহ্মপুত্র তীর হইতে সিলেট পর্যন্ত প্রায় ১০০ মাইল দূরত্বের পথ আমি অতিক্রম করিয়াছি। সমগ্র অঞ্চলটি আমার নিকট একটা অন্তহীন সমুদ্রের মতো মনে হইয়াছে।’ এই ছিল আমাদের এই বাংলার ভূতলের তখনকার অবস্থা। আর এখন? ‘ঠাঁই নেই ঠাঁই নেই গ্রামের পর গ্রাম, চলছে সতেরো কোটির বসতির সংগ্রাম।’
বছর তিরিশেক আগে, ২১ জুন ১৯৮৯ অধুনালুপ্ত The Bangladesh Observer পত্রিকায় ' Siltation problem-a possible solution শিরোনামে প্রকাশিত, আমার একটা লেখায় উল্লেখ করেছিলাম ' 'The rivers continue to carry silt and will do so till the mountains in the neighbouring Himalayas are flattened some day in the remote future.'
আমার লেখাটা কিন্তু সমুদ্রের পেটটা মাটি দিয়ে ভরে দেশের আয়তন বৃদ্ধির জন্য ছিল না। ছিল হিমালয় থেকে ভেসে আসা মাটিটা নদীগুলোর পেট থেকে উদ্ধার করে নদ-নদীর নাব্য বৃদ্ধি করা এবং উদ্ধার করা মাটি দিয়ে নদীগুলোর বুকের পাটা কমিয়ে জমি উদ্ধার করা আর অতিরিক্ত মাটি দিয়ে পাশের নিচু জমি ভরাট করে কৃষিজমি বৃদ্ধি করা।
লেখাটা হয়তো কোনো গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির নজরে পড়েনি। আর পড়লেও আমার মতো একজন অখ্যাত ও আনাড়ি লোকের বক্তব্য হয়তো দিবাস্বপ্ন মনে হয়েছে। এখন আমাদের দেশের নদীগুলোর পলিমাটিতে ভরে যাওয়া তলদেশ খোদাই করতে যে ড্রেজিং করা হয়, তাতে কোনো উপকার হচ্ছে না। শুধু উজানের খুঁড়ে তোলা পলি একটু দূরে ভাটির দিকে পতিত হয়ে সেখানে নদীর তলদেশে জমা হচ্ছে। আমার পরিকল্পিত ড্রেজিং হলে নদীগুলোর তলদেশ আরো নেমে গিয়ে বর্ষার ঢল ধারণ করতে পারত, এখনকার মতো তীর ডুবিয়ে চতুর্দিকে বন্যার সৃষ্টি করত না।
‘এই দেশেতে জন্ম যেন এই দেশেতে মরি’ ভাবনার একজন লোক আমি। দেশাত্মবোধক এ ভাবনাটা নেহায়েত কল্পনাতেই রয়ে গেল। হ