‘কাক কাকের মাংস খায় না’ বলা হলেও কথাটা উষ্ণ রক্তবাহী সব জীব ও পশুপাখির ক্ষেত্রেই সাধারণভাবে সত্য। এটা স্বজাতির প্রতি সহজাত শ্রদ্ধাবোধের প্রকাশ, যা সব পশুপাখির মধ্যেই দৃশ্যমান। এ কারণেই কোনো প্রাণীকে সাধারণত দেখা যায় না নিজ সহচরের মরদেহ ভক্ষণ করতে। বাঘ-সিংহের মতো ভয়ানক হিংস্র প্রাণীও নিজেদের ছিঁড়েখুঁড়ে খায় না। তেমন ঘটনা কদাচিত ঘটলে তাকে বিরল ব্যতিক্রম হিসেবেই বিবেচনা করা হয়। বরং জীবনের মতো মৃত্যুতেও দেখা মেলে এদের ঐকান্তিক একতার। ক্ষেত্রবিশেষে মৃত্যু এদের একাত্ম করে আরো গভীরভাবে। একটা কাকের মৃত্যু তার পুরো সমাজকে একত্র করে ফেলে চোখের পলকে। এক শিয়ালের মরণ তার সহচরদের উন্মত্ত করে তোলে শোক ও বেদনায়। বানরদের অভিব্যক্তিও একই রকম মর্মস্পর্শী।
নিজ জাতি ও সমাজের প্রতি পশুপাখিদের এমন দায় ও দায়িত্ববোধ রীতিমতো অবিশ্বাস্য। এদেরও রয়েছে নিজস্ব ভাব, ভাষা ও সমাজ। রয়েছে নিজস্ব সামাজিক রীতিনীতি। তারা কঠোরভাবে মেনে চলে এসব নিয়মনীতি। তেমন নীতি মেনেই পাখির ঝাঁক উড়ে চলে তাদের নেতাকে সামনে রেখে। হাজারো পাখি যখন আকাশজুড়ে মনের আনন্দে চোখ ধাঁধানো অ্যাক্রোবেটিক ফরমেশন তৈরি করে উড়তে থাকে, তখন তাদের কঠোর নিয়মানুবর্তিতা প্রকাশ পায় আরো স্পষ্টভাবে। নেতৃত্বের প্রতি পরম আস্থা না থাকলে আর নিজেদের আইনকানুনের প্রতি নিবেদিতপ্রাণ না হলে এমন জটিল কারুকাজ এত নিপুণভাবে উপস্থাপন করা সম্ভব হতো না। নিজেদের মধ্যে দ্বন্দ্ব-সঙ্ঘাত যতই থাকুক না কেন, স্বজাতিভুক্ত যে কারো বিপদ এদের এক করে ফেলে মুহূর্তের মধ্যে। সমাজের সবাই মিলে সমবেতভাবে যথাসাধ্য চেষ্টা করে বিপদগ্রস্তকে সাহায্য করতে। মরণোত্তর প্রতিক্রিয়াতেও ঘটে তারই বহিঃপ্রকাশ। তবে দুর্ভাগ্যবশত এদের ক্ষমতা নেই মৃতদেহ সৎকার করার; যদি থাকত তাহলে সতীর্থদের মরদেহগুলো যে অপার সম্মান ও শ্রদ্ধার সাথে সমাহিত করা হতো, তা বুঝতে অসুবিধা হয় না।
মানুষের রয়েছে মরদেহ সৎকার করার সামর্থ্য। সমাজবদ্ধ মানুষের জন্য এটা একটা বিশেষ সামাজিক দায়বদ্ধতাও বটে। এই দায় না মানার স্বাধীনতাও রয়েছে মানুষের। দুনিয়ার যেকোনো বিষয়েই নিজের মতো করে সিদ্ধান্ত নেয়ার সক্ষমতা রয়েছে মানুষের। বস্তুত সিদ্ধান্ত নেয়ার এই অপার স্বাধীনতাই মানুষকে করেছে সৃষ্টির সেরা। তবে ‘সৃষ্টির সেরা’ হওয়ার এই সৌভাগ্য একেবারে চাহিদাবিহীন নয়। মানবশ্রেষ্ঠত্বের প্রধান চাহিদা হলো, স্বাধীনভাবে চিন্তা করে মানুষ যে সিদ্ধান্ত নেবে, যে কাজ করবে, সেটা হতে হবে প্রাণিকুলের অন্য সবার নিয়ম-কানুন ও কাজকর্মের চেয়ে ভিন্নমাত্রার ও উন্নতমানের। তা না হলে মানুষের মর্যাদা পশুর নিচে নেমে যেতে বাধ্য।
অতীব বেদনার হলেও সত্য, সে রকম অমর্যাদাকর অপকর্মে ছেয়ে গেছে আজকের মানবসমাজ। মানুষ এখন খুন হচ্ছে যত্রতত্র। খুন করা যেন কোনো অপরাধ নয়, বরং এক ধরনের উৎসব। এমন নির্বিচার হত্যাযজ্ঞ বন-জঙ্গলে পশুদের মধ্যেও কখনো, কোনো কালে ঘটেছে বলে জানা যায় না। মহামারী আকারে ছড়িয়ে পড়া মানুষের এই জিঘাংসা থেকে রক্ষা পাচ্ছে না দুধের শিশুও। একটা সময় ছিল, যখন সুযোগ পেলে দুধের শিশু তুলে নিয়ে যেত ওঁৎ পেতে থাকা শিয়ালের দল। কিন্তু এখন আর শিয়াল নয়, মানুষই তুলে নিয়ে অবলীলায় হত্যা করছে ওদের। ঘরের মধ্যে, নিজের বিছানায়, এমনকি মায়ের কোলে পর্যন্ত শিশুরা এখন আর নিরাপদ নয়। তারা শুধু খুনই হচ্ছে না, তাদের নিষ্পাপ দেহগুলোকে বিকৃতও করা হচ্ছে নৃশংসভাবে, ছুড়ে ফেলা হচ্ছে ডাস্টবিনে-নর্দমায়। সৎকারের চিন্তা তো দূরের কথা। এ এক ভয়াবহ ও পাশবিক বীভৎসতা।
আমরা যেন এতে মোটেও চিন্তিত নই। ভাবটা এমন, যেন এসব কিছুই নয়। সতীর্থের মৃত্যু আমাদের আর নাড়া দেয় না। নিজের দেহমন রক্তাক্ত না হওয়া পর্যন্ত আমাদের চেতনা এখন আর কাজ করে না। আমাদেরই মতো শত শত মানুষ বোমার আগুনে ঝলসে অঙ্গার হচ্ছে প্রতিদিন। তবুও আমরা উদাসীন। যেভাবে মানুষের রক্তে প্রতিক্ষণে প্লাবিত হচ্ছে বিশ্ব, তাতে দুনিয়াজুড়ে সব আনন্দ আয়োজন বন্ধ হয়ে যাওয়ার কথা অনেক আগেই। আমাদের মুখের হাসি শুকিয়ে যাওয়ারও কথা। আরামের ঘুম হারাম হয়ে যেত এত দিনে। কিন্তু হচ্ছে তার উল্টো। এই মানুষ শ্রেষ্ঠত্বের দাবি করতে পারে কি? পৃথিবী চলেছে আরো ভয়াবহতার দিকে। মানুষের নিষ্ঠুরতা এখন গ্রাস করতে উদ্যত তার স্বজাতি ও সতীর্থদের লাশ বা মরদেহগুলোকেও। প্রতিনিয়ত দেহত্যাগ করে মহালোকের পথে দুনিয়া ছেড়ে যাচ্ছে আমাদের যেসব সতীর্থজন, তাদের প্রাণহীন দেহগুলোকে আমরা অনেক আয়োজন করে পুড়িয়ে ছাই করছি। এটা আসলে নির্মম, বড়ই অমানবিক। জীবদ্দশায় যিনি সর্বগ্রাসী আগুন থেকে নিজেকে রক্ষা করতে সচেষ্ট ছিলেন সব সময়, এমনকি সামান্য রোদে বের হতেও চিন্তা করেছেন বারবার। তাকেই প্রাণশক্তি হারানোর সাথে সাথে গনগনে আগুনে পুড়িয়ে করা হচ্ছে ছাই। এ বড় মর্মান্তিক স্ববিরোধিতা। কোনো জীবের জন্যই এই পরিণতি মেনে নেয়া যায় না। মৃতের প্রিয়জনকে দিয়ে বর্বরতার সূচনা করা আরো মর্মন্তুদ।
অনেকের মতে, মরদেহ পোড়ানো সতীদাহের চেয়ে কোনো অংশেই কম নয়। এক সময় রাজা রামমোহন রায়ের মতো বিশিষ্টজনেরা তাদের ধর্মে সতীদাহের কোনো বিধান খুঁজে পেতে ব্যর্থ হয়েছিলেন। তাই তারা একাত্ম হয়ে পাশবিক সেই অধর্মাচার রুখে দিয়েছিলেন বিবেকের তাড়নায়। পূর্বসূরিদের দেখানো পথে বর্তমান পণ্ডিতদেরও সিদ্ধান্ত নিতে হবে সৎকার বিষয়ে। বিচার-বিশ্লেষণ করে নিশ্চিত হতে হবে যে, নি®প্রাণ মানবদেহ পুড়িয়ে ছাই করার সাথে ধর্মের সম্পর্ক আছে কি না। তেমন কিছু না থাকলে নতুন করে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। বোঝাতে হবে, জীবকে দয়া করলে ঈশ্বরকে সেবা করা হয়। বলা হয়ে থাকে, সেই জীব বলতে শুধু নিঃশ্বাস নিতে সক্ষম প্রাণকেই বুঝায় না; বরং প্রাণহীন জীবের ক্ষেত্রেও কথাটা প্রযোজ্য। এমন সঙ্কটের দ্রুত সমাধান ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে যেকোনো সমাজেরই একটি প্রধান বিবেচ্য হওয়া আবশ্যক। হ
লেখকের বই পেতে : Search 'Mainul Ahsan' at 'mazon.com'
লেখক : লস এঞ্জেলেস, ইউএস প্রবাসী
‘কাক কাকের মাংস খায় না’ বলা হলেও কথাটা উষ্ণ রক্তবাহী সব জীব ও পশুপাখির ক্ষেত্রেই সাধারণভাবে সত্য। এটা স্বজাতির প্রতি সহজাত শ্রদ্ধাবোধের প্রকাশ, যা সব...
