কঙ্কাল বিক্রির ঘটনা নিয়ে শিক্ষার্থীদের দুইপক্ষের সংঘর্ষে রাজশাহী ইনস্টিটিউট অব হেলথ টেকনোলজি (আইএইচটি) বন্ধ ঘোষণার কথা নিশ্চয়ই সবার মনে আছে। রুচিতে বাধলেও বলতে হয়, কঙ্কাল ও হাড্ডি নিয়ে কুকুরের কামড়াকামড়ি স্বাভাবিক! অথচ আইএইচটির ঘটনায় লজ্জায়, অপমানে, গোটা জাতি ‘নতশির’ হয়ে পড়েছিল। শেষ পর্যন্ত মেধাবীরা কঙ্কালও ছাড় দিলো না! অর্থাৎ কঙ্কাল আর হাড় নিয়েও ‘কামড়াকামড়ি’। এ ঘটনায় ১১ জন আহত হয়েছিল। এসব শিক্ষার্থী বাণিজ্য করতে গিয়ে পড়ালেখা লাটে উঠিয়ে, দলীয় শক্তি ও ঘুষ বাণিজ্যে চাকরি লাভের পর গজ, ব্যান্ডেজ, কাঁচি পেটে রেখে অপারেশন শেষে সেলাই করলে তাতে আশ্চর্য হওয়ার কী আছে?
দেশের বড়রা যখন ইট, বালু, পাথর, কয়লা, সোনা, ব্যাংক, রিজার্ভ, শেয়ার মার্কেট নিয়ে অবৈধ বাণিজ্য করতে পারেন; যে দেশে সংযোগ সড়ক, রাস্তা ও প্রয়োজন ছাড়া কথিত ‘ভূতের সেতু’ তৈরি হয়; যারা রডের বদলে বাঁশ, ঘুষের টাকা গুনে গুনে নিতে পারেন; যারা গ্যাসের সাথে বাতাসের ভেজাল করতে পারেন; তাদের উত্তরসূরিরা কঙ্কাল বাণিজ্য কেন; পুরো দেশও বিক্রি করতে পারবে বৈকি!
একটি প্রবাদ আছেÑ ‘শেষ পিরানের (কাফনের) পকেট নেই’। মানুষের সাধ মিটবে না সেই পর্যন্ত, যে পর্যন্ত না তার মুখে মাটি পড়বে। অর্থাৎ মৃত্যু হয়ে কবরে না পৌঁছা পর্যন্ত মানুষের সম্পদের আকাক্সক্ষা মেটার নয়। তলস্তয়ের লেখা বিখ্যাত গল্প ‘হাউ মাচ ল্যান্ড ডাজ অ্যা ম্যান রিকয়ার’। গল্পটিতে দেখা যায়, একজন মানুষ লোভের তাড়নায় অঢেল জমির দখল পেতে চায় এবং কোদাল হাতে বিশাল বেড় দিয়ে জমির দখল নিতে সে প্রাণান্ত ছুটে চলছে। অতি মাত্রায় ছোটাছুটি করে ক্লান্ত ঘর্মাক্ত মানুষটি অবশেষে তার সদ্য অবৈধ দখলে নেয়া জমির কিনারে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। লোকজন জমি লোভী মৃত মানুষটিকে তার জমিতে কবর দেয়। লোভী মানুষটি বিশাল বেড় দিয়ে সহস্র হেক্টর জমি দখল করেছিল; কিন্তু মরার পরে লোকটি নিজের কবরের জন্য সাড়ে তিন হাত জমির বেশি দখল করতে পারেনি!
আজ যারা উচ্চশিক্ষা করতে এসে কঙ্কালের ব্যবসা করছেন, তারাই যে একদিন জীবন্ত মানুষের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ চুরির বাণিজ্য করবেন না সেই নিশ্চয়তা কোথায়! রক্ত পিপাসায় হায়েনা যেমন লোভাতুর থাকে, কোনো শিক্ষার্থীও যদি সে রকম টাকার পিপাসায় অস্থির থাকেন, তাহলে তাকে শিক্ষাঙ্গন থেকে বহিষ্কার করা জরুরি। শিক্ষাঙ্গন বন্ধ হতে পারে না। এটিই যেকোনো সুস্থ ও বিবেকবান মানুষের কথা। রাজশাহীর আইএইচটি কর্তৃপক্ষের নোটিশে বলা হয়েছিল, ‘আইএইচটির অ্যাকাডেমিক কাউন্সিলের এক জরুরি সভায় গৃহীত সিদ্ধান্ত মোতাবেক প্রতিষ্ঠানের ছাত্রদের মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে গুরুতর আহত অবস্থায় ১১ জন শিক্ষার্থীকে রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। পরবর্তী অবস্থা আরো অবনতি এবং রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের আশঙ্কায় ছাত্রাবাস ও ছাত্রীনিবাস বন্ধ ঘোষণা করা হলো। সেই সাথে ডিপ্লোমা কোর্স জানুয়ারি ২০১৯-এর অবশিষ্ট মৌখিক পরীক্ষাগুলো এবং বিএসসিসহ ডিপ্লোমা কোর্সের সব বর্ষের ক্লাস স্থগিত ঘোষণা করা হয়েছে।’
ওই দিনকার ঘটনা বর্ণনায় আইএইচটির শিক্ষার্থীরা গণমাধ্যমকে জানিয়েছিলেন, ‘তৃতীয় বর্ষের তিন শিক্ষার্থী প্রতিষ্ঠানের দুই নম্বর গ্যালারিতে কঙ্কাল বিক্রির জন্য প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীদের সাথে কথা বলতে যান। এ তিন শিক্ষার্থী ছাত্রলীগের আইএইচটি শাখার সাধারণ সম্পাদক ওহিদুজ্জামানের অনুসারী। সেখানে সভাপতির অনুসারী প্রথম বর্ষের ছাত্র সাইফুল ইসলামের সাথে ওই তিন শিক্ষার্থীর কথাকাটাকাটি হয়। তিন শিক্ষার্থী চলে আসেন। তারা সভাপতির কাছে মীমাংসার জন্য যান। সেখানেই দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ শুরু হয়। সংঘর্ষে আহত ছাত্রলীগের ১১ নেতাকর্মীকে রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। ছাত্রলীগের আহত কর্মীদের মধ্যে তাৎক্ষণিকভাবে ছয়জনের পরিচয় পাওয়া গিয়েছিল। তাদের মধ্যে সাধারণ সম্পাদকের পক্ষের পাঁচজন ও সভাপতির পক্ষের একজন ছিলেন। তারা সবাই ছাত্রলীগের আইএইচটি শাখার সাধারণ সম্পাদকের সমর্থক। সভাপতির পক্ষের আহত হয়েছিলেন ছাত্রলীগ কর্মী ল্যাবরেটরি মেডিসিন বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী মাসুদ রানা।’
এর আগে ছাত্রলীগের মারামারির কারণে ২০১৭ সালের ৬ ডিসেম্বর একইভাবে প্রতিষ্ঠানটি বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছিল। সে সময় ছাত্রলীগের ওই কমিটি বাতিল করা হয়েছিল এবং ছাত্রলীগের চার নেতাকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়। দেশে শিক্ষাঙ্গন ও শিক্ষার হার বেড়েছে। কিন্তু সৎ, সুশিক্ষিত ও বিবেকবান মানুষের সংখ্যা বাড়েনি। যার কারণে তুচ্ছ ঘটনা নিয়ে আজ মানুষ একে অপরকে হত্যা করছেন। এত দিন শুনতাম ‘চায়ের কাপে ঝড়’! এখন দেখা গেল ‘চায়ের দোকানের বেঞ্চে বসা নিয়ে ঝড়’! প্রথমে ঝগড়া, পরে সংঘর্ষ। একজন প্রাণ দিলে এর পরিসমাপ্তি ঘটে। ঘটনাস্থল হবিগঞ্জের বাহুবল উপজেলার বশিনা বাসস্ট্যান্ড এলাকা। গ্রামের মাইকে ঘোষণা দিয়ে বশিনা ও দ্বিমুড়া গ্রামের লোকজন সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। এ সময় উভয়পক্ষ লাঠিসোঁটা, বল্লম, টেঁটা, ধারালো অস্ত্র ও ইটপাটকেল ব্যবহার করে। সংঘর্ষের ঘটনায় গুরুতর আহত জহুর আলী (৬০) নামে একজন প্রাণ হারান।
লাভ রিঅ্যাক্ট নিয়ে যেখানে দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে মারামারি হয়, কঙ্কাল নিয়ে মারামারি হয়, সেখানে চায়ের দোকানের বেঞ্চে বসা নিয়ে মারামারি হলে অবাক হওয়ার কিছু নেই। চায়ের দোকানে বসে আড্ডা দেয়ার মতো এত সময় পৃথিবীর আর কোনো দেশের মানুষের আছে বলে মনে হয় না। হ
abunoman1972@gmail.com