১.
ছোট ছোট পা ফেলে সিঁড়ি ভেঙে তিন তলার ছাদে ওঠে রিয়াজ। মামীর সকালের ভেজা কাপড়চোপড় মেলে দিতে হবে। ভারী ভেজা কাপড় কাঁধে নেয়ায় কাঁধ ভিজে ওঠে তার। বড় বড় কাপড় উঁচু তারে লাফিয়ে, পা ডিঙি দিয়ে মেলতে মেলতে পাশের মাঠে চোখ চলে যায় রিয়াজের।
বিস্ময়ে তার চোখের পলক পড়ে না। আকাশে ঘুড়ি উড়ছে। কতদিন পরে ঘুড়ি দেখছে সে। ঢাকা শহরে এসে অবধি নানা জিনিস চোখে পড়লেও এই জিনিসটা এতদিনে চোখে পড়েনি তার। এই জিনিসটার ওপরে আশৈশব দুর্বলতা রিয়াজের। যদিও দশ বছরের ছোট্ট জীবনে তার শৈশব পেরিয়ে গেছে এ কথা পাগলেও বলবে না। কিন্তু সে জানে অনেক কিছুর সাথে সাথে সে তার শৈশব হারিয়েছে। ঢাকার এই অল্প ক’দিনেই বয়সের তুলনায় অনেক বড় হয়ে গেছে সে।
জাহাজের মতো ইয়াবড় দু-তিনতলা লঞ্চে (যদিও জাহাজ দেখেনি সে কখনো, মানুষের মুখে শুনেছে), মাঠের মতো বিস্তৃত ডেকে শুয়ে বসে, বড় কালার টিভিতে নায়ক মান্নার ছবি দেখতে দেখতে রাত কাবার করে, তার গ্রাম সম্পর্কীয় এক চাচার সাথে যখনই লঞ্চ ঘাটের প্লাটফরমে তার ছোট ছোট পা ফেলেছে তখনই শৈশবের সাথে সব সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে গেছে তার। ঢাকা শহরে শুরু হয়েছে তার কর্মজীবন।
কাপড় মেলা শেষে সে হা করে দাঁড়িয়ে ঘুুড়ি উড়ানো দেখতে থাকে। ঘুড়িগুলো তাদের ছাদ ছাড়িয়ে সামান্যই উঁচুতে উঠছে। তার চেয়ে বড় কথা ঘুড়িগুলোর মাঝে কোনো বৈচিত্র্য নেই। তবুও তার দেখতে ভালো লাগে। চৌকোনা ছোট ছোট ঘুড়িগুলোর সাথে তার ছোট্ট মনটাও উড়– উড়– হয়ে যায়। মুহূর্তেই মনটা উড়ে চলে যায় সাত সমুদ্দুর তেরো নদী পেরিয়ে তাদের গ্রামের হাই স্কুলের বিশাল মাঠে।
বসন্তের এ রকম বাতাসওয়ালা দিনে, হোক না সে সকাল বেলা, মাঠে ঘুড়ি উড়াতে আসত হরেক রকম মানুষ। হরেক বয়সের। তাদের ঘুড়িও ছিল হরেক রকমের। সাপ ঘুড়ি, তারা ঘুড়ি, বাকসো ঘুড়ি, মানুষ ঘুড়ি। ঢাউস সাইজের সব বিচিত্র ঘুড়ি। বয়স অনুপাতে ঘুড়ির সাইজ ছোট বড় হতো। বড় বড় বয়স্ক মানুষেরাই ঢাউস ঢাউস সব ঘুড়ি উড়াত বিকাল বেলা। কাজ ফেরতা গ্রামের লোক জড়ো হয়ে যেত মাঠে। (চলবে)
