জানো, বাঁশের তৈরি দরমার অন্য নাম চাঁচড়ি বা চাঁচ। বাঁশের চাঁচড়ি এ দেশের গ্রামীণ গৃহ নির্মাণের এক অন্যতম প্রধান উপকরণ। পল্লীর কুঁড়েঘর বা কাঁচা ঘরের বেড়া দেয়ার জন্য চাঁচারি ব্যবহৃত হয়। অঞ্চলভেদে চাঁচরিকে চাঁচ, দরমা, চাঁচই ইত্যাদি নামে ডাকা হয়। আদিকাল থেকেই এ দেশে চাঁচরি ব্যবহৃত হয়ে আসছে। প্রচীন চর্যাপদেও চাঁচরির উল্লেখ আছে। শবরীপাদের চর্যাগীতির একটি পংক্তিতে লেখা আছে ‘চারিধারে ছাইলারে দিয়া চাঞ্চালী।’ চাঞ্চালী বা চাঞ্চারিকাই হল আমাদের বাঁশের চাঁচরি। প্রাচীনকালে বরেন্দ্রভূমিকে ভালো বাঁশের ঝাড় ছিল বলে বিভিন্ন প্রাচীন সাহিত্যে উল্লেখ পাওয়া যায়। চর্যাপদের উক্ত পংক্তির অর্থ দাঁড়ায় চারদিকে বাঁশের চাঁচরি দিয়ে বেড়া দিলো। সাধারণ মানুষ ঘর-বাড়ি তৈরিতে বেড়া নির্মাণে যে বাঁশের চাঁচরি ব্যবহার করত এ সম্পর্কে কোনো সন্দেহ নেই। চাঁচড়ি তৈরির জন্য ফাঁপা বাঁশের চেয়ে ভরাট বাঁশ ভালো। তবে নকশি দরমার জন্য শিল্পীরা বৈরা বাঁশ, মাখলা বাঁশ, তল্লা বাঁশ ইত্যাদি ব্যবহার করে থাকেন। বাঁশের চাঁচ বা বেতি তুলে আড়াআড়ি জোড় দিয়ে বোনা হয়। চাঁচরি হয় চৌকাকার বা আয়তাকার। বিভিন্ন মাপের চাঁচরি আছে। তবে সাধারণত ৪ ফুটী৬ ফুট মাপে চাঁচরি বেশি তৈরি করা হয়। ঘরের বেড়া ছাড়াও ডোল, পাটাতন/সিলিং তৈরিতে দরমা ব্যবহার করা হয়। নকশি দরমার স্থায়িত্ব বাড়ানোর জন্য কেউ কেউ তাতে বার্নিশ পলিশ বা রঙ দিয়ে থাকেন। তাতে সৌন্দর্য বাড়লেও প্রাকৃতিক ঐতিহ্যেও আবেদন নষ্ট হয়।
দরমা চৌকোনাকৃতি, এতে বর্ডার থাকে। বাঁশের কারুকাজ করা নানা মোটিফের নকশা করা দরমা দেখা যায়। পাকা অথবা কাঁচা বাঁশ বাঁক বা মোচড় দিয়ে ফুল, লতা-পাতা ও পশু পাখির ডিজাইন করা হয়। মানিকগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, রংপুর, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম ইত্যাদি স্থানে এখনও নকশি দরমা ব্যবহারের প্রচলন দেখা যায়। বসত ঘর এমনকি হোটেলের সিলিংয়েও নকশি দরমা ব্যবহার লক্ষ্য করা যায়। সোনারগাঁ লোকশিল্প জাদুঘরেও নকশি দরমা ও বেড়ার নমুনা সংরক্ষিত আছে। যেভাবে মানুষজন পাকা ঘরবাড়ি বানাচ্ছে তাতে শিগগিরই হয়তো আমরা আমাদের এ অনন্য লোকশিল্প তথা বাস্তু ঐতিহ্যকে হারিয়ে ফেলব। ছবি: লেখক
