বাইরের দিক অন্ধকার হয়ে আসায় জানালা দিয়ে বাইরে তাকালাম, দেখলাম আকাশের লাল সূর্য ডুবে যাচ্ছে। দুপুর-বিকেল পেরিয়ে কখন যে সন্ধ্যা হয়ে গেল বই পড়তে পড়তে বুঝতেই পারি নি। আমি বসে আছি বেঙ্গল বইয়ের তৃতীয় তলার কিডস জোনে। সামনে ৫ থেকে ১৫ বছর বয়সের প্রায় ২০ জন শিশু রয়েছে, যারা তাদের বাবা-মায়ের সাথে এসেছে। সামনে বসে থাকা ছয়-সাত বছরের মেয়েটিকে কয়েক দিন ধরে দেখছি, তার মা তার পাশে বসে বই পড়ছে। পড়ায় একটু বিরতি দিয়ে তাদের সাথে কথা বলি। জানতে পারলাম, মা ডক্টর পারভীন শত ব্যস্ততার মধ্যেও নিয়মিত তার মেয়ে তানিয়াকে নিয়ে বেঙ্গল বইয়ে আসেন বইয়ের জগতের সাথে তানিয়াকে পরিচয় করিয়ে দিতে। বেঙ্গলে বইয়ের বিশাল কালেকশন থাকায় ছোট তানিয়া বিভিন্ন শেলফ থেকে নিজের পছন্দ মতো বই খুঁজে নেয়ার সুবিধা পায় বলেই তার মায়ের বেঙ্গলের বই এত পছন্দ। আরো কথা হলো, আমাদের পাশে বসা ৫৭ বছর বয়সী আনিসুর রহমানের সাথে, যিনি প্রতি মাসে অন্তত দু’বার বেঙ্গল বইয়ে আসেন পুরো পরিবার নিয়ে। তার মতে, বই পড়ার স্থানটি নিরিবিলি এবং সব বয়সের জন্য বই থাকায় মূলত তিনি পরিবার নিয়ে আসেন।
ঢাকার লালমাটিয়ায় অবস্থিত ‘বেঙ্গল বই’ বইপ্রেমীদের স্বর্গরাজ্য। এটি মূলত একটি বই বিক্রয় কেন্দ্র হলেও যে কেউ চাইলে এখানে বসে বই পড়তে পারেন, আবার গরম চা বা কফিতে চুমুক দিতে দিতে আড্ডায় মেতে উঠতেও পারেন। বেঙ্গল বইয়ের ব্রান্ডিং অ্যান্ড কমিউনিকেশন ডেপুটি ম্যানেজার আখতার হোসেনের কাছে বেঙ্গল বই সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, বেঙ্গল বইয়ের মূল উদ্দেশ্যÑ নতুন প্রজন্মের মাঝে বইয়ের আলো ছড়িয়ে দেয়া এবং এমন একটি স্থান তৈরি করা, যেখানে তারা বই পড়তে পারবে এবং বই নিয়ে আড্ডায় মেতে উঠতে পারবে। এটি শুধু একটি বইয়ের দোকান নয়, বরং বইপ্রেমীদের পছন্দের স্থান। এখানে তিন বছর বয়সী ছোট শিশু থেকে ৭০ ঊর্ধ্ব সবাই আসেন। এমন কি এখানে শারীরিকভাবে অসামর্থ্য ব্যক্তির জন্য রয়েছে হুইল চেয়ারে পুরো বেঙ্গল বইয়ের গ্যালারি ঘুরে দেখার সুযোগ, রয়েছে দৃষ্টি-প্রতিবন্ধীদের জন্য ব্রেইল ভাষার বই। দেশী-বিদেশী মিলিয়ে প্রায় ৬০ হাজার বই রয়েছেÑ যার মধ্যে ২০ হাজার বই ইংরেজি ভাষায় রচিত। শুধু গল্প-উপন্যাসই নয়, বরং জীবনী, দর্শন, ফটোগ্রাফি, আর্ট, কবিতা, দেশ-বিদেশের রান্নাবিষয়ক বইসহ বিভিন্ন ম্যাগাজিন। শুধু বইয়ের দোকানের গণ্ডি থেকে বেরিয়ে বেঙ্গল কর্তৃপক্ষ শিশুদের জন্য আয়োজন করে বিভিন্ন কর্মশালা, গল্প বলার সেশন, পাপেট-শো ইত্যাদি। উৎসবের দিন বেঙ্গল বই সেজে উঠে উৎসবের সাজে। উৎসবটি পয়লা বৈশাখ হোক অথবা স্বাধীনতা দিবসÑ বিশেষ আয়োজন থাকেই এখানে। গত স্বাধীনতা দিবসে বিশেষ আয়োজনের মধ্যে অন্যতম ছিল বাক-প্রতিবন্ধীদের সাঙ্কেতিক ভাষায় পরিবেশিত জাতীয় সঙ্গীত।
বেঙ্গল বই চার তলাবিশিষ্ট একটি ভবনে অবস্থিত। ভবনের নিচ তলায় খোলা জায়গায় রয়েছে কেন্টিন, যেখানে চা-সিঙ্গারা বা চপ খেতে খেতে বই পড়া যায়। ভবনের দ্বিতীয় তলায় রয়েছে কফিশপ ও রিডিং জোন। এ ছাড়া বারান্দায় বসেও বই পড়া যায়। তৃতীয় তলা মূলত কিডস জোন, যেখানে ছোটরা শুয়ে অথবা বসে বই পড়তে পারে। চতুর্থ তলায় রয়েছে চিলেকোঠা, যেখানে বিভিন্ন ধরনের কাবাব খেতে খেতে বই পড়া যেতে পারে।
বেঙ্গল বইয়ের সিটিং ক্যাপাসিটি ৪০০ প্লাস হলেও বইপ্রেমীরা চাইলে সিঁড়িতে অথবা মেঝেতে বসেও বই পড়তে পারে। দিনে ভিজিটরের সংখ্যা ৫০০ প্লাস হলেও ছুটির দিনগুলোতে হাজারের বেশি ভিজিটর আসেন। চাইলে আপনিও ঘুরে আসতে পারেন বেঙ্গল বইয়ের গ্যালারি থেকে সপ্তাহের যেকোনো দিন।
