রাবেয়া বেগম হাঁটছিলেন আপন মনে। অনেকটা উদাসীনভাবে। এলোমেলোভাবে হাঁটছিলেন আর জীবন নিয়ে ভাবছিলেন। আচমকা তার জীবনের ওপর দিয়ে বয়ে গেল প্রাণঘাতী সুনামি। লণ্ডভণ্ড করে দিলো তার গুছানো জীবন, সুখের সংসার ।
সেদিন বিকেলে। তার একমাত্র ছেলে বাবার সাথে গিয়েছিল মামার বাড়ি বেড়াতে। ফিরছিল সন্ধ্যায়। অটোরিকশায় করে। পথে রাক্ষুসী এক ট্রাক দ্রুত গতিতে ছুটতে গিয়ে অটোরিকশার ওপর উঠিয়ে দিলো। চাকায় পিষ্ট হয়ে গেল অটোরিকশা। সাথে সাথে ঘটনাস্থলেই মারা গেলেন রাবেয়া বেগমের স্বামী ও তার একমাত্র ছেলে। ক্ষুদ্র একটি বিভীষিকা মুহূর্তই তছনছ করে দিলো রাবেয়ার ১২ বছরের গোছানো সোনালি সংসার। স্বামী-সন্তান হারিয়ে সে বাকরুদ্ধ, পাগলপ্রায়। ভুলে গেল সে স্বাভাবিক জীবন। বাউণ্ডুলের মতো ঘুরে বেড়ায়। সবাই তাকে বুঝালেন, সান্ত্বনা দিলেন । তুমি এভাবে না খেয়ে পাগলের মতো ঘুরে বেড়ালে তারা তো আর ফিরে আসবে না। তোমার একটা আলাদা জীবন আছে। তোমাকে বাঁচতে হবে। জীবন বাঁচানোর জন্য তোমাকে খেতে হবে। খাওয়ার জন্য তোমাকে চাকরিটা করতে হবে। যাও, তুমি আবার চাকরিতে যোগদান করো। সবার অনুরোধে তিনি রাজি হলেন। আজ বাড়ি থেকে বের হলেন। হেঁটে অফিসে যাচ্ছেন। অনেকটা অগোছালোভাবে। শ্রীহীনভাবে। হাঁটছেন আর ভাবছেন জীবন নিয়ে। কী নির্মম , নির্দয় আর নিষ্ঠুরভাবেই না ভাগ্য তাকে নিয়ে খেলা করল। একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন তিনি। তখনই চোখ পড়ল রাস্তার ওপাশে। একটা ছোট ছেলে কাঁধে স্কুলব্যাগ নিয়ে রাস্তা পার হচ্ছে। সামনের দিক থেকে দ্রুত গতিতে ছুটে আসছে একটা ঘাতক ট্রাক। রাবেয়া দেখলেন, সেটা ট্রাক নয় যেন মৃত্যুদূত। তিনি দৌড়ে গিয়ে ছেলেটাকে কোলে তুলে নিলেন। রাস্তা পার হলেন। তখনই চারপাশে শুরু হলো চেঁচা মেচি, চিৎকার, হইচই। রাবেয়া বেগম কিছু বুঝে ওঠার আগেই তাকে গিরে ধরল আশপাশের লোকজন। একজন বলল, এই শালীই ছেলেধরা, দেখলেন না চিলের মতো কেমন ছোঁ মেরে ছেলেটাকে কোলে তুলে নিলো।
রাবেয়া হতভম্ব। এ কী বলছেন আপনারা? আমি ছেলেধরা হতে যাব কেন? আমি কোনো ছেলেধরা নই। সামনের দিক থেকে ট্রাকটা আসতে দেখে ছেলেটাকা রাস্তা পার করে দিচ্ছিলাম।
একজন বলল, দেখো, মাসির দরদ।
তোমরা বিশ্বাস করো আমাকে। হাত জোর করে বললেন রাবেয়া। আমি কোনে ছেলেধরা নই। কয়েক দিন আগে এর বয়সী আমার এক ছেলে ট্রাকের নিচে চাপা পড়ে মারা গেছে। তাই একে দেখেই আমার ছেলের কথা মনে পড়ল।
একজন খ্যাকখ্যাক করে হেসে বলল, শোনো মাগীর রূপকথার গল্প। এমনভাবে গল্প বানিয়ে রেখেছে যেন রূপকথার গল্পকেও হার মানাবে।
পেছন থেকে একজন চিৎকার করে বলে উঠল, চোর কী ধর্মের কথা শোনে রে ভাই। ওর সাথে এত কথা কিসের? পাছায় দুই চার ঘা লাগান, দেখবেন কলের গানের মতো কলকল করে সব স্বীকার করছে।
তাকে আর কোনো কথা বলার সুযোগ দিলো না কেউ। শুরু হলো তার ওপর এলোপাতাড়ি কিল-ঘুষি ,লাথি। মাটিয়ে লুটিয়ে পড়লেন রাবেয়া বেগম। জ্ঞান হারালেন। বাতাসের সাথে দ্রুত গতিতে চারপাশে ছড়িয়ে পড়ল রাবেয়ার ছেলেধরার কথা। যা ছিল আসলে গুজব।
সেতাবগঞ্জ , দিনাজপুর
রাবেয়া বেগম হাঁটছিলেন আপন মনে। অনেকটা উদাসীনভাবে। এলোমেলোভাবে হাঁটছিলেন আর জীবন নিয়ে ভাবছিলেন। আচমকা তার জীবনের ওপর দিয়ে বয়ে গেল প্রাণঘাতী সুনামি। লণ্ডভণ্ড করে দিলো...
