বর্ষা বাংলা বছরের দ্বিতীয় ঋতু, যেখানে আষাঢ় ও শ্রাবণ এই দুই মাসজুড়ে বর্ষাকাল ব্যাপৃত থাকে। বর্ষার আগমনে খালবিল জলমগ্ন হয়ে যায়। জল মানেই জলজ ও স্থল ফুলের বাড়াবাড়ি। বর্ষার পূর্বে যে প্রকৃতি ঢাকা ছিল ধূসর বালুর আড়ালে, বর্ষার পরশেই সেই সবুজ প্রকৃতি ফিরে পায় তার আপন রূপ-জৌলুশ। বর্ষায় স্নান করে নতুন সাজে আপন লাবণ্যে লাবণ্যময়ী হয়ে ওঠে ধরা দেয় আমাদের মাঝে। সবুজ পাতার আড়াল থেকে মুচকি হেসে উঁকি দিচ্ছে সুগন্ধি বর্ষার নানান ফুল। বর্ষা ঋতু যেন ফুলের জননী। বর্ষা আমাদের চার পাশ সুবাসে মুখরিত করে রাখে এমন কিছু ফুল হলোÑ কদম, বকুল, কেয়া, কামিনী, বেলি, শাপলা, কেয়া, কলাবতী, পদ্ম, দোলনচাঁপা, চন্দ্রপ্রভা, ঘাসফুল, পানাফুল, কলমি ফুল প্রভৃতি।
বর্ষায় ফোটা ফুলগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য কিছু ফুলের বন্দনা জেনে নেবোÑ
কদম : বর্ষার নাম নিতেই প্রথমে চলে আসে কদম ফুলের নাম। বর্ষার দূত বলা হয় কদম ফুলকে। কদমের সৌরভ চারদিক ম ম করে। বর্ষার বৃষ্টিতে যেন কদম ফুল বেয়ে অশ্রু ঝরে। গ্রামে গাছে গাছে ফুটে থাকা কদম ফুল বর্ষার প্রকৃতিতে এনে দেয় নজরকাড়া সৌন্দর্য। গ্রামাঞ্চলে নদীর তীরে, খোলা প্রান্তরে প্রচুর কদম গাছ চোখে পড়ে। শহরে দেখা মেলে পার্কে ও উদ্যানে। কদম ফুলের রঙ সাদা-হলুদে মেশানো। আমরা যাকে ‘কদম ফুল’ বলি তা আসলে বহু ফুলের সমষ্টি। মাঝখানে থাকে গোলাকার পুষ্পাধার এবং এর গায়ে ফুলগুলো লেগে থাকে। কদম বহু নামে পরিচিতÑ বৃত্তপুষ্প, মেঘাগমপ্রিয়, কর্ণপূরক, ভৃঙ্গবল্লভ, মঞ্জুকেশিনী, পুলকি, সর্ষপ, প্রাবৃষ্য, ললনাপ্রিয়, সুরভি, সিন্ধুপুষ্প। আমাদের ঐতিহ্যে ও সাহিত্যে কদম ফুল আদি প্রাচীন।
চালতা : বর্ষার বৃষ্টিতে চিরসবুজ চালতা গাছের রূপ ফুটে ওঠে তার ফুলের সৌন্দর্যে। পাতার খাঁজকাটা আকৃতির কারণে চালতাকে বলা হয় রূপসী গাছ। বাহ্যিক সৌন্দর্যের দিক থেকে চালতা ফুল দৃষ্টিনন্দন এবং গড়নের দিক থেকে রাজসিক। তাই দীর্ঘ সবুজ পাতার মাঝে শুভ্র ও সুন্দর ফুল দেখতে খুবই মনোহারী ও সুগন্ধযুক্ত। সিঙ্গেল হয়ে চালতা ফুল ফোটে গাছের উপরিভাগে শাখায় নিচের দিকে মুখ করে। দুধ সাদা পাঁপড়ির এই ফুল ভোর বেলাতে ফোটে। ফুলের প্রকৃত রূপ হৃদয়ঙ্গম করতে হয় দুপুর হওয়ার আগেই। কেননা বেলা বাড়ার সাথে সাথে এর সাদা রঙ ঘিয়ে পরিণত হয় এবং ফোটার দিনই ঝরে পড়ে। বৃতির সবুজ, দলের শুভ্রতা, পরাগের হলুদ এবং তারকাবৃতির গর্ভমুণ্ড এ ফুলকে বেশ আকর্ষণীয় করে তুলেছে।
ঘাসফুল : এটি বর্ষাকালের চমৎকার একটি ফুল। ছোট শিশুদের ফেলে দেয়া বাথটবেই তার জন্ম! অনেকটা অযতœ-অবহেলায় বেড়ে ওঠে ফুলটি। এর আরেকটি নাম জেফির লিলি। এর পাতাগুলো চিকন, লম্বা আকৃতির। সাদা, গোলাপি, হলুদ, লাল রঙের ঘাসফুল সমতল ভূমিতে ফোটে বর্ষাকালে। প্রায় সব জায়গায় এ ফুল লাগানো সম্ভব। এই প্রজাতিটি বাগানে বাহারি উদ্ভিদ হিসেবে লাগানো হয়। সব লিলিই ভূঁইফোড় শ্রেণীর কারণ এ ধরনের ফুল গাছের ডাল থেকে হয় না, মাটি ফুঁড়ে ফুলের স্টিক বেরোয়। এদের ফুল সাদা, হলুদ ও গোলাপি রঙের হতে পারে। সুদর্শন হওয়ায় আলঙ্কারিক হিসেবে ফুলটি সারা পৃথিবীতেই ব্যাপক ছড়িয়েছে। এদের অজস্র রকমফের পুষ্পপ্রেমীদের জন্য বাড়তি পাওনা। আকারে ছোট হলেও বড়দের ভিড়ে মাথা উঁচিয়ে আপন সৌন্দর্য তুলে ধরে সে-ই তো ঘাসফুল।
কামিনী : বর্ষার সুবাসিত ফুল কামিনী। ঘন সবুজ পাতার ফাঁকে প্রতি গুচ্ছে অসংখ্য ফুল নিয়ে দাড়িয়ে থাকে কামিনী। কামিনীর একটি আশ্চর্য বিষয় হলো সারাদেশের সব গাছে একই দিন ফোটে! এ এক অবাক করা যোগাযোগ। বৃষ্টিস্নাত দিনে কিংবা অবাধ্য বাতাসের ঝাপটায় কামিনী গাছ থেকে দল বেঁধে ঝরে পড়ে। গাছের তলাটি দেখে তখন মনে হবে কেউ যেন মায়াবি সাদা চাদর বিছিয়েছে। গাছের দিকে তাকালে দেখা যায় তখনো পাতার ফাঁকে স্নিগ্ধ হাসছে গুচ্ছ গুচ্ছ ফুল। ফুলে পরিপূর্ণ কামিনী যেন চার পাশে মিষ্টি লেবুর সুগন্ধ ছড়ায়। বর্ষার ফুল হলেও বছরে বেশ কয়েকবারই কামিনী ফোটে। ঘন বিন্যস্ত ছোট চিরসবুজ পাতাগুলো বেশ দৃষ্টিনন্দন। তাই এর বাণিজ্যিক ব্যবহারও লক্ষণীয়। পুষ্পস্তবক তৈরি ও বিয়ের সজ্জায় কামিনীর পাতার ব্যবহার বেশ কদরপূর্ণ।
দোলনচাঁপা : বাংলার অতি পরিচিত একটি ফুল হলো দোলনচাঁপা। একে দুলালচাঁপা বা গুলবাকাওলী বলেও ডাকা হয়। এটি সাদা রঙের ফুল। বড় বড় দু’টি পাপড়ি। গুচ্ছধরা গাঢ় সবুজ পাতার মাঝে তুষারশুভ্র দোলনচাঁপাকে গর্বিত রানির মতোই দেখায়! বর্ষাকালের বিকেলে এবং সন্ধ্যার দিকে দোলনচাঁপা ফোটে। ফুল ফোটার সময় হলে প্রতিটি শাখার মাথায় থোকা থোকা ফুল বের হয়, যা দেখতে অনেকটা প্রজাপতির মতো। এজন্য একে ইংরেজিতে বাটারফ্লাই লিলি নামে ডাকা হয়। হালকা মিষ্টি সুবাস সমৃদ্ধ ফুলটি দেখতে পাবেন গ্রীষ্ম থেকে শরত পর্যন্ত। একটা টবে লাগালেই পুরো বাড়ি ঘ্রাণে ছেয়ে যাবে। দোলনচাঁপার গাছ দেখতে হলুদ গাছের মতো। কন্দজ উদ্ভিদ। এর আয়ু খুব কম সময়ের জন্য হলেও এর মনোলোভা সুগন্ধের কারণে অনেকেরই খুব পছন্দের।
চন্দ্রপ্রভা : হলুদ রঙের অসম্ভব সুন্দর এই ফুলটির নাম চন্দ্রপ্রভা ফুল। ঘণ্টা আকৃতির স্বর্ণাভ হলুদ রঙা গন্ধহীন এ ফুলকে কেউ কেউ একে সোনাপাতি নামেও ডাকে। আবার ফুলটি বড় হলে কিছুটা মাইকসদৃশ মনে হয় বলে এটি অনেকের কাছে মাইক ফুল নামেও পরিচিত। গ্রীষ্ম বা বর্ষায় ডালের আগায় বড় বড় থোকায় দেখা যায় হলুদ রঙের ফুলটি। চন্দ্রপ্রভা ফুলের গাছ চিরসবুজ। মাথা কিছুটা ছড়ানো। দেখতে ঝোপালো আকৃতির। শুধু সৌন্দর্যপ্রেমীদের চোখ নয়, পথে চলতে সাধারণ পথিকেরও নজর কাড়ে চন্দ্রপ্রভা। ফুল বড় বড় থোকায় ঘনসন্নিবিষ্ট হয়ে থাকে। এই ফুলের মৌমাছি ও কীটপতঙ্গ আকর্ষণ করার ক্ষমতা প্রচুর। বাংলাদেশে চন্দ্রপ্রভা গ্রীষ্ম-বর্ষা ও শরৎ-হেমন্তে ফুটলেও কিছু কিছু গাছে বছরের অন্যান্য সময়েও ফুল ফুটতে দেখা যায়।
রেইন লিলি : নাম শুনে বুঝতে দ্বিধা হয় না রেইন লিলি বর্ষার ফুল। নামের সাথে রেইন থাকলেও এটি কিন্তু ভূমিসংলগ্ন ফুল। বর্ষায় ফোটে বলে রেইন লিলি নামে নামকরণ। রেইন লিলি ইংরেজি শব্দ হলে এর বাংলা নাম হল ঘাসফুল। অর্থাৎ এটি ঘাসফুলেরই একটি জাত। এ ফুল ফোটার ব্যাপ্তি বর্ষা থেকে শরৎকাল অবধি। সাদা, হলুদ ও গোলাপি রঙের ফুল ফোটতে দেখা যায়, তবে গোলাপি রঙের ফুল বেশি চোখে পড়ে। পাতাগুলো গাঢ় সবুজ। ফুলগুলো আরো বেশি নজরকাড়া। বাহারি রূপে ফোটে বর্ষায়। তবে রেইন লিলি গন্ধহীন। রৌদ্রোজ্জ্বল উঁচু ভূমি ও পানি নিকাশের সুবিধাযুক্ত স্থানে ভালো জন্মে। মজার ব্যাপার হলো, ফুলটি সন্ধ্যায় নিজেকে কিছুটা গুটিয়ে নেয়। দিনের আলোয় স্বরূপে ফেরে। এ ফুল সাদা, হলুদ, গোলাপিÑ এই তিন রঙের হয়। আমাদের দেশে বেশি দেখা যায় গোলাপি রঙের ফুলটি। শ্রাবণে সবচেয়ে বেশি ফুটতে দেখা যাবে। এই বর্ষায় ঘরে বসে না থেকে প্রকৃতিতে ঘুরে ঘুরে উপভোগ করুন বর্ষা ফুলের কানন।
